
কিছু অপেক্ষার কোনো শেষ নেই।
কিছু প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।
আর কিছু শোক মানুষকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়ায়।
আজ বিশ্ব গুম প্রতিরোধ দিবস।
এই দিনটি পৃথিবীর অসংখ্য নিখোঁজ মানুষের স্বজনদের বেদনা নতুন করে জাগিয়ে তোলে। এ দিনে আমারও মনে পড়ে আমার ছোট ভাই আকতার উদ্দিনের কথা।
১৯৯৭ সালের ১১ আগস্ট চট্টগ্রামের কালুরঘাট কামাল বাজার এলাকা থেকে আমার ভাই আকতারকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সেদিনের সেই ভাইটি আজ কোথায়?
সে কি বেঁচে আছে?
নাকি তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে তার মরদেহ গুম করা হয়েছে?
২৯ বছর পেরিয়ে গেছে।
ক্যালেন্ডারের অসংখ্য পাতা বদলেছে, বহু সরকার এসেছে ও বিদায় নিয়েছে, পৃথিবী থেকে বহু মানুষ হারিয়ে গেছে—কিন্তু আমাদের অপেক্ষার অবসান হয়নি।
আমি তখন চান্দগাঁও ও বোয়ালখালী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলাম। পুলিশ সদর দপ্তরেও একাধিকবার অভিযোগ জানিয়েছি। বছরের পর বছর প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেছি, লিখেছি, প্রতিবাদ জানিয়েছি এবং জবাব চেয়েছি। কিন্তু আজও আমার ভাই জীবিত না মৃত—সে বিষয়ে আমরা কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাইনি।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তৎকালীন প্রশাসনের রহস্যজনক ভূমিকার কারণে আমার ভাইকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সন্দেহ, তাকে হত্যা করে তার মরদেহ গুম করা হয়ে থাকতে পারে। আমি চাই, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হোক এবং প্রকৃত ঘটনা জাতির সামনে প্রকাশ করা হোক।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—
আমার মা এই অপেক্ষা সহ্য করতে পারেননি।
নিখোঁজ সন্তানের শোকে তিনি ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। প্রতিটি দরজায়, প্রতিটি পরিচিত মুখে এবং প্রতিটি অচেনা ফোনকলে তিনি হয়তো তাঁর আকতারকে খুঁজে বেড়াতেন।
“আমার আকতার কি ফিরবে?”
এই প্রশ্নটি যেন প্রতিদিন তাঁর হৃদয়ে নতুন করে বেদনা জাগিয়ে তুলত।
শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালের ২ আগস্ট আমার মা আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নেন।
নিখোঁজ সন্তানের মরদেহটুকুও তিনি দেখতে পাননি।
তাকে দাফন করতে পারেননি।
শেষবারের মতো ছেলের মুখে হাত রেখে বলতে পারেননি—
“বাবা, তুই আমাকে ছেড়ে কোথায় গেলি?”
একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় বেদনা আর কী হতে পারে?
মা চলে গেছেন।
কিন্তু তাঁর সেই প্রশ্ন আজও আমাদের ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়।
আকতার কোথায়?
আজ আমি কোনো প্রতিশোধ চাই না।
আমি কারও বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগও করতে চাই না।
আমি শুধু সত্য জানতে চাই।
আমার ভাই যদি বেঁচে থাকে, তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
আর যদি সে আর পৃথিবীতে না থাকে, তবে তার পরিণতির সত্য আমাদের জানানো হোক এবং তার মরদেহের সন্ধান দেওয়া হোক। যারা দায়ী, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।
আমরা জানি, এত বছর পর হয়তো আকতার আর আমাদের দরজায় এসে দাঁড়াবে না।
তবুও একজন ভাই হিসেবে আমার হৃদয়ে যে প্রশ্নটি এত বছর ধরে অনুত্তরিত রয়েছে, তার উত্তর পাওয়ার অধিকার আমার আছে।
একজন স্বজনের দীর্ঘ অপেক্ষারও ন্যায়বিচার প্রাপ্য।
২৯ বছর ধরে আমি অপেক্ষা করছি।
২৯ বছর ধরে লিখছি।
২৯ বছর ধরে প্রশ্ন করে চলেছি।
আজ বিশ্ব গুম প্রতিরোধ দিবসে সেই প্রশ্নই আবার রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং বিবেকবান মানুষের কাছে তুলে ধরতে চাই—
আমার ভাই আকতার উদ্দিন কোথায়?
আমি আমার ভাইকে ফিরে পেতে চাই—
জীবিত হলে জীবিত, মৃত হলে অন্তত সত্যসহ।
এই সত্য উদঘাটন ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় আমি আমার ভাইয়ের গুম হওয়ার ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ।
কারণ, সময় অনেক কিছু মুছে দিতে পারে—
কিন্তু একজন মায়ের কান্না, একজন ভাইয়ের অপেক্ষা এবং সত্যের দাবি কখনো মুছে দিতে পারে না।
আজও আমার হৃদয়ের গভীর থেকে একটি কথাই উচ্চারিত হয়—
“আকতার, তুই যেখানে থাকিস—তোর ভাই তোকে আজও খুঁজছে।”
আর আমার প্রয়াত মায়ের আত্মার কাছে আমার একটাই অঙ্গীকার—
“মা, তোমার আকতারের সত্য আমি খুঁজে বের করব। যতদিন বেঁচে আছি, এই লড়াই থামবে না।”
আল্লাহ আমার ভাইকে রহম করুন, সত্য প্রকাশ করুন এবং আমাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।


