
তিন মাসব্যাপী শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার গভীর সাধনায় বর্ষাবাস শেষে বৌদ্ধ সমাজে আসে প্রমত্ত আনন্দ ও চৈতন্যের রঙে রাঙানো প্রবারণা পূর্ণিমা। এই দিনটি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ষাবাসের সমাপন এবং আত্মসমালোচনা ও পরিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে পালিত হয়। প্রবারণা পূর্ণিমার পর শুরু হয় মাসব্যাপী দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দানোৎসব, যা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দানোৎসব। প্রতি বছরের মতো এবারও, ২৫৬৯ বুদ্ধবর্ষের ১লা নভেম্বর (শনিবার) করাইয়ানগর সদ্ধর্মোদয় বিহারে অনুষ্ঠিত হয়েছে দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দানোৎসব। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে মহতী দান সভার সভাপতি আসন অলংকৃত করেন সাতকানিয়া-লোহাগাড়া ভিক্ষু সমিতির সভাপতি ভদন্ত শীলানন্দ মহাথেরো। আশীর্বাদক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভদন্ত শীলজ্যোতি মহাথেরো, মঙ্গলাচরণ পাঠ করেন ভদন্ত প্রজ্ঞানিধি ভিক্ষু। উদ্বোধনী ভাষণ দেন শিক্ষক তাপস বড়ুয়া এবং স্বাগত ভাষণ দেন করাইয়ানগর সদ্ধর্মোদয় বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু। প্রধান জ্ঞাতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদর্শনাচার্য ভদন্ত সত্যপাল মহাথেরো, অধ্যক্ষ, অঙ্কুরঘোনা জেতবনারাম বিহার। সংবর্ধিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রীলঙ্কার ভদন্ত শান্তিপ্রিয় থেরো, আনন্দপ্রিয় থেরো, রতনজ্যোতি ভিক্ষু। বিশেষ জ্ঞাতিবৃন্দের মধ্যে ছিলেন ভদন্ত শুদ্ধানন্দ মহাথেরো, রতনানন্দ মহাথেরো, সুমঙ্গল মহাথেরো। বিশেষ সদ্ধর্মদেশক হিসেবে ধর্মদেশনা দেন ভদন্ত জ্যোতিপ্রিয় থেরো, প্রজ্ঞাবোধি থেরো, তিষ্যানন্দ ভিক্ষু, সত্যানন্দ ভিক্ষু এবং আর্যসম্ভার ভিক্ষু। সন্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ট্রাস্টি রুবেল বড়ুয়া। তিনি বলেন, “সরকার আমাকে আপনাদের সেবার জন্য নিয়োগ দিয়েছে। এই সুন্দর নান্দনিক বিহারের মাঠটি পাকাকরণের জন্য কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে। আপনাদের সহযোগিতা পেলে এই পবিত্র স্থানের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পাবে।” অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ ঐক্য ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সচিব ও ব্যাংকার প্রতিম বড়ুয়া ডালিম, দক্ষিণ জেলা সহ-সভাপতি প্রকৌশলী রনি চৌধুরী, বিশেষ অতিথি প্রেমানন্দ বড়ুয়া নয়ন, শুভেচ্ছা বক্তা মৃদুল বড়ুয়া, রুনা কান্তি বড়ুয়া, শৈবাল বড়ুয়া ও বিপ্লব বড়ুয়া। এছাড়া ভূমিদাতা সম্মাননা প্রদান করা হয় সুমলা বড়ুয়া, চিত্তরঞ্জন বড়ুয়া এবং প্রয়াত মিনতি বড়ুয়া (মরণোত্তর)-কে। কৃতি শিক্ষার্থী সম্মাননা ও স্মৃতি বৃত্তি প্রদান করা হয় প্রয়াত শিক্ষক অসংখ্য কুমার বড়ুয়া স্মৃতি বৃত্তি, প্রয়াত মনীন্দ্র লাল বড়ুয়া এবং প্রয়াত নিয়তি রানী বড়ুয়া স্মৃতি বৃত্তির মাধ্যমে। পঞ্চশীল প্রার্থনা পাঠ করেন সমীরন বড়ুয়া। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রাসেল ও সোহেল দীপ্ত বড়ুয়া। পুরো আয়োজনটি সফলভাবে সম্পন্ন হয় করাইয়ানগর সদ্ধর্মোদয় বিহার পরিচালনা কমিটি এবং দায়ক-দায়িকা সম্প্রদায়ের সার্বিক সহযোগিতায়। অনুষ্ঠান শেষে দানকারীরা তাদের পরম ধর্মীয় তৃপ্তি প্রকাশ করেন, আর উপস্থিত বৌদ্ধভক্তগণ একত্রে ‘সদ্ধর্ম জয় হোক’ উচ্চারণে প্রকম্পিত করে তোলেন বিহারের প্রাঙ্গণ। প্রজ্ঞা, দান ও মৈত্রীর বার্তা ছড়িয়ে দেয় এই কঠিন চীবর দানোৎসব—যা বৌদ্ধ সমাজে শান্তি, ঐক্য ও আধ্যাত্মিক উন্নতির এক অনন্য প্রতীক।


