
রিয়া চৌধুরীঃ
“ওসি প্রদীপের ভাই সদীপ কোথায়?”—এই প্রশ্ন আজও জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রদীপ কুমার দাশের নাম উচ্চারণ করলেই মানুষের চোখে ভেসে ওঠে এক বিভীষিকাময় অধ্যায়—হত্যা, লুটপাট, ভয় ও নির্যাতনের ইতিহাস। কিন্তু প্রদীপের ভাই ওসি সদীপ কুমার দাস? তিনি কি কেবল ভাইয়ের ছায়ায় ঢাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা, নাকি তাকেও ঘিরে আছে কোনো অজানা ইতিহাস? প্রদীপ : এক রক্তাক্ত ইতিহাসের প্রতীক-প্রদীপ কুমার দাস ছিলেন টেকনাফ থানার সাবেক ওসি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই—শত শত মানুষকে বিনা কারণে হত্যা, কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, সীমাহীন দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার। মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ হত্যা মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, আর তিনি এখন ফাঁসির আসামি। এতসব অপরাধের কারণে কেবল প্রদীপ নয়, তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্যই সন্দেহের ঘেরাটোপে পড়ে যায়।সদীপ : ভাই হওয়ার দায় ও অভিশাপ-সদীপও পুলিশের কর্মকর্তা ছিলেন। কিন্তু প্রদীপের অপরাধ প্রকাশ্যে আসার পর সাধারণ মানুষ ধরে নেয়—দুই ভাইয়ের চরিত্র এক। এটাই ছিল সদীপের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে প্রদীপের মতো হত্যাকাণ্ড বা ইয়াবা সিন্ডিকেটে জড়িত থাকার সরাসরি প্রমাণ নেই, তবে জনমনে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কেউ তাঁকে আওয়ামী সরকারের দোসর বলেছেন, কেউ আবার ভারতের হয়ে কাজ করা এজেন্ট হিসেবে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। আন্দোলনের টার্গেটে সদীপ-২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর ছাত্র-জনতার আন্দোলন চরমে পৌঁছায়। যারা সরকারি দমন-পীড়নে যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে, তাদের তালিকায় প্রদীপের পাশাপাশি সদীপের নামও ঘুরতে থাকে। উত্তেজিত জনতা ও ছাত্রদের একটি অংশ মনে করে—দমন-পীড়নের যন্ত্রে সদীপও সক্রিয় ছিলেন। তাঁকে আইনের কাঠগড়ায় আনার পাশাপাশি মব জাস্টিসের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ারও দাবি ওঠে। একাধিকবার জনতা তাঁর বাসার সামনে যায়। ভাগ্যক্রমে তিনি সেসময় বাসায় ছিলেন না।নচিকিৎসা সফর, আমেরিকা ও পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা- বেঁচে থাকার জন্য সদীপ প্রথমে চিকিৎসার অজুহাতে ব্যাংকক যান, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। তবে এ সময় বিভিন্ন জামাতপন্থি ও উস্কানিমূলক সংবাদপত্রে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার শুরু হয়। কেউ তাঁকে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি পুলিশ কর্মকর্তা বলে আখ্যা দেয়, আবার কেউ ভারতীয় গুপ্তচর হিসেবে প্রচার চালায়। এর ফলে তাঁর স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে নানা হুমকির মুখে পড়ে। সদীপ অভিযোগ করেছেন—উত্তেজিত জনতা একবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের অপমান করেছে, ভয় দেখিয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমি পালিয়ে যাইনি আনন্দে, পরিস্থিতি আমাকে পালাতে বাধ্য করেছে। আমার পরিবারকে মব জাস্টিসের ভয়, প্রশাসনিক হয়রানি এবং মিথ্যা মামলার সম্ভাবনা আমাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেছে।” জঙ্গি ও ইয়াবা সিন্ডিকেটের হুমকি-বর্তমানে সদীপ কুমার দাস যুক্তরাষ্ট্রে আত্মগোপনে আছেন। কিন্তু বিপদ তাঁকে ছাড়েনি। বাংলাদেশের কিছু উগ্রপন্থি জঙ্গি সংগঠন তাঁকে খুঁজছে। আবার কক্সবাজারের ইয়াবা ব্যবসায়ী মাফিয়ারা প্রদীপের ভাই হওয়ায় তাঁকেও টার্গেট করেছে। প্রদীপের হাতে বহু মাফিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এখন তারা প্রতিশোধ নিতে সদীপকে শিকার বানাতে চাইছে। সব মিলিয়ে সদীপ ও তাঁর পরিবার বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে। আইন ও জনতার বিচারের ফাঁদে- যদি সদীপ দেশে ফেরেন, তবে তাঁকে দুটি আদালতের মুখোমুখি হতে হবে— আইনের আদালত: চাকরি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে।
জনতার আদালত: জনতার একাংশের বিশ্বাস—তিনি সরকারের দমননীতির সহযোগী ছিলেন। ফলে উত্তেজিত জনতা ও মব জাস্টিসের ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।শেষকথা : জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ওসি সদীপ-ওসি সদীপ এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। প্রদীপের অপরাধের ছায়া, জনতার অবিশ্বাস, উগ্রবাদী জঙ্গি ও ইয়াবা সিন্ডিকেটের হুমকি—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবন এক দুঃসহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সত্যিই কি তিনি শুধুই পরিস্থিতির শিকার? নাকি গোপনে তিনি কোনো ভূমিকা রেখেছেন—এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত—দেশে ফেরার যেকোনো সিদ্ধান্ত তাঁর ও তাঁর পরিবারের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।


