
আজ ৫ মে, কার্ল মার্কসের ২০৫তম জন্মবার্ষিকী। এই দিনে পৃথিবীর সমস্ত নিপীড়িত, বঞ্চিত, অধিকারহীন মানুষের প্রতি জানাই শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা, যাদের মুখপাত্র হয়ে উঠেছিলেন এই মহান দার্শনিক।
ছোটবেলা থেকেই কার্ল মার্ক্সের প্রতি আমার এক গভীর দুর্বলতা ছিল। তাঁর রচনাগুলো প্রথম পড়ার সময় অনেক কিছুই বুঝিনি, কারণ বয়স তখনো উপযুক্ত ছিল না। তবুও তাঁর লেখার ভেতরে এক ধরনের আত্মপ্রতিবাদী সুর, দার্শনিক প্রতিবাদ এবং মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিত। ভাষাগত দিক থেকে অনেক কঠিন অনুবাদ হলেও ভাবগত শক্তি ছিল এমনই, যা ভাষার গণ্ডি পেরিয়ে আমার চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
আজ এই উপলক্ষে স্মরণ করি সেই মানুষটিকে, যিনি শুধুই এক দার্শনিক ছিলেন না, ছিলেন সময় ও সমাজের নির্মাতা, শ্রেণিসংগ্রামের পথপ্রদর্শক।
তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক শোষণের গঠনগত বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন, অথচ তাঁর নিজের তিনটি সন্তান অনাহারে মারা গেছে। কী নির্মম বাস্তবতা! ইতিহাস বড়ই পরিহাসপ্রিয়—কখনো তা ঘটে মর্মান্তিক রূপে, আবার কখনো এক নির্মম রসিকতায়।
কার্ল মার্ক্স বলেছিলেন, “শ্রমিকদের কাছে হারাবার কিছুই নেই, শুধু শৃঙ্খল ছাড়া। তাই, বিশ্বের শ্রমিকরা, এক হও!” পুঁজিবাদ কীভাবে উৎপাদনের প্রযুক্তি ও সামাজিক প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে শ্রমিককে শোষণ করে—সেই গভীর বিশ্লেষণ আমাদের দিয়েছে মার্ক্স। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, মানুষ আগে খাদ্য, পানি, বাসস্থান, বস্ত্র—এই মৌলিক চাহিদার কথা ভাববে, তার পরেই ধর্ম, রাষ্ট্র কিংবা শিল্পকলার মতো বিষয় সামনে আসবে।
১৮১৮ সালের ৫ মে প্রুশিয়ার ট্রিয়ের শহরে জন্ম নেয়া এই চিন্তাবিদের জীবন শুরু হয় এক বুদ্ধিজীবী পরিবারের ছায়ায়। আইনের ছাত্র হলেও তার ঝোঁক ছিল ইতিহাস ও দর্শনের দিকে। হেগেলীয় দর্শনের ‘বামপন্থী’ অনুসারী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ফয়েরবাখের বস্তুবাদ তাঁকে প্রভাবিত করে। পরে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হন এবং ‘রাইনিশে সাইটুং’-এর সম্পাদক হন। এই পত্রিকার লেখায় বিপ্লবী চেতনার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠলে, সরকার তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।
১৮৪৩ সালে তিনি স্ত্রী জেনিকে নিয়ে প্যারিসে যান। সেখানে পরিচয় হয় ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের সঙ্গে। জন্ম হয় এক অসাধারণ বন্ধুত্বের—যা ভবিষ্যতের মার্ক্সবাদী দর্শনের প্রাণ হয়ে ওঠে। দু’জন মিলে সমাজতন্ত্রের ভ্রান্ত ধারা ও ভুয়া মতবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভিত্তি রচনা করেন।
১৮৪৮ সালে ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশিত হয়, যা সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির ম্যানিফেস্টো হয়ে ওঠে। সেই বছরই ইউরোপজুড়ে বিপ্লব শুরু হলে তিনি বারবার নির্বাসিত হন—বেলজিয়াম, প্যারিস, জার্মানি, অবশেষে লন্ডন। জীবনের বাকি সময়টা তিনি লন্ডনেই কাটান, চরম দারিদ্র্য আর মানসিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে। তাঁর ‘ডাস ক্যাপিটাল’—পুঁজির শ্রেণিবিন্যাস ও শোষণের গভীর বিশ্লেষণ—বিশ্ব অর্থনীতিকে দেখার এক নতুন চোখ দিয়েছিল।
১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ, বেলা পৌনে তিনটায় তিনি চিরনিদ্রায় যান। এঙ্গেলস বলেছিলেন—“ডারউইন যেমন জৈব জীবনের বিকাশের নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন, মার্ক্স তেমনি মানবসমাজের বিকাশের নিয়ম উদঘাটন করেছিলেন।” মৃত্যুর তিন দিন পর হাইগেট কবরস্থানে দেওয়া তাঁর ভাষণ আজও ইতিহাসের এক স্মরণীয় দলিল।
কার্ল মার্ক্স শুধু একটি নাম নয়, একটি চিন্তাধারা, একটি আন্দোলন, একটি অবিরাম সংগ্রামের ভাষা। শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন যারা দেখে, তাঁদের কাছে তিনি এক মহামানব। আজ তাঁর জন্মদিনে তাকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা—একজন দার্শনিক, যিনি পৃথিবীর বুকে মানুষের মুক্তির ভাষ্য রচনা করে গেছেন।

