
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক মহল স্বাগত জানালেও এর প্রশ্নমালা ও ভোট–প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা করেছেন—গণভোটে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কার–সংক্রান্ত প্রশ্ন আলাদা করে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার সুযোগ থাকবে না; বরং সব প্রশ্ন মিলিয়ে একটি মাত্র ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে ভোটারদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে, বিশেষ করে নিরক্ষর ভোটারদের জন্য বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বেশি। আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই সনদের আওতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন (পিআর পদ্ধতি), নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দলের ডেপুটি স্পিকার, সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণের মতো নানা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতগুলো জটিল বিষয় এক প্রশ্নে তোলা নিয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে নতুন সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধনী বাস্তবায়ন করবে। আর ‘না’ জিতলে জুলাই সনদ কার্যত বাতিল হয়ে যাবে, ফলে বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোই বহাল থাকবে। প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ও ভোট–পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছেন—চারটি বিষয়ে পৃথকভাবে ‘না’ বলার সুযোগ না রেখে জনগণের মতামতকে সংকুচিত করা হয়েছে। তার দাবি, সাধারণ মানুষ প্রশ্নগুলো বুঝতে না পারলে এই গণভোট উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়বে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃবৃন্দও সমালোচনা করে বলছেন, চারটি আলাদা বিষয়কে এক প্রশ্নে তোলায় নির্বাচনী ফোকাস নষ্ট হবে এবং সংস্কারপ্রক্রিয়া গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, জনগণের চূড়ান্ত মতামত জানতে হলে প্রশ্নগুলো হতে হবে সহজ ও স্পষ্ট। ভিন্ন ভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে একই প্রশ্নে গেঁথে দেওয়া গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে দুর্বল করতে পারে। তাদের মত, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া এমন গুরুত্বপূর্ণ গণভোট কার্যকর হওয়া কঠিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা, নেতাদের গণসংযোগ এবং সরকারের ব্যাখ্যাদান—এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, প্রশ্নগুলো আরও সহজ ভাষায় হলে ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়ত। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল আলীমের মতে, চারটি বড় সংস্কার একসঙ্গে ভোটে তোলায় নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জনগণকে সচেতন করা। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান—সব জায়গায় বড় আকারে প্রচার চালাতে হবে। বিশেষ করে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর কাছে প্রশ্নগুলো ব্যাখ্যা করে বোঝানোর ব্যবস্থা জরুরি।
—

