
মো. কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের মানুষ বহু ঘটনা দেখেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখেছে, অপরাধের উত্থান-পতন দেখেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্যও দেখেছে। কিন্তু এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা শুধু একটি সংবাদ হয়ে থাকে না; বরং মানুষের মনে জমে থাকা বহু প্রশ্নকে একসঙ্গে সামনে নিয়ে আসে। জাতীয় ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি তেমনই একটি ঘটনা।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার, যিনি দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তিনি যদি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন যে ডিবি পরিচয়ে তাকে আটক করা হয়েছে, শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, নিজের পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তাকে অপমানের শিকার হতে হয়েছে, তাহলে বিষয়টি নিছক একটি ভুল বোঝাবুঝি বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই ঘটনা আজ একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে— চট্টগ্রামের মানুষ কতটা নিরাপদ? নাঈম হাসানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ঢাকা থেকে খেলা শেষে চট্টগ্রামে ফিরে বাসায় যাচ্ছিলেন। পথে তাকে থামানো হয়। তিনি সহযোগিতা করার কথা বলেন, ব্যাগ তল্লাশিরও অনুমতি দেন। কিন্তু এরপরও তিনি যে অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন, তা উদ্বেগজনক। একজন নাগরিককে আইন অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে, কিন্তু অপমান, ভয়ভীতি কিংবা অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ কোনো সভ্য রাষ্ট্রের পুলিশিংয়ের অংশ হতে পারে না। ঘটনার পর মানুষের মনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে, তা হলো— একজন জাতীয় ক্রিকেটারের সঙ্গে যদি এমন আচরণের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই খুলশী থানার সামগ্রিক কার্যক্রম এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিভিন্ন মহলে অভিযোগ রয়েছে যে খুলশী থানা এলাকার কিছু অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। টাইগারপাস রেলওয়ে কলোনি এবং আশপাশের এলাকাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় নাগরিক সমাজ, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন মহলের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে— এসব অভিযোগের কতটুকু তদন্ত হয়েছে, কতটুকু সমাধান হয়েছে এবং জনগণের কাছে সেই অগ্রগতির বার্তা কতটুকু পৌঁছেছে? একটি থানার সফলতা শুধু মামলা নেওয়ার মধ্যে নয়; বরং মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করার মধ্যেও নিহিত। যদি জনগণের বড় একটি অংশ মনে করে যে তাদের অভিযোগ যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না, তাহলে সেটি প্রশাসনের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কোনো সাংবাদিকের প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে তার পরিবার হুমকি, হামলা বা হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠলে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কারণ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিক নিরাপত্তা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তির অংশ।
আজকের বিতর্কের কেন্দ্রে শুধু নাঈম হাসানের ঘটনা নয়; বরং একটি বড় প্রশ্ন— খুলশী থানার নেতৃত্ব জনগণের আস্থা অর্জনে কতটা সফল? একজন ওসির দায়িত্ব কেবল আইন প্রয়োগ নয়। তাকে হতে হয় প্রশাসনিক নেতা, মানবিক অভিভাবক এবং জনগণের আস্থার প্রতীক। তার থানার অধীনস্থ কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে যদি বারবার বিতর্ক তৈরি হয়, তাহলে সেই দায়ও নেতৃত্বকে বহন করতে হয়। এ কারণেই আজ অনেকেই বলছেন, নাঈম হাসানের ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি থানার সামগ্রিক কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা উচিত। প্রশ্ন উঠছে— থানার সদস্যরা কি যথাযথ প্রশিক্ষণ ও তদারকির মধ্যে আছেন? তারা কি নাগরিকের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে পেশাদার মানদণ্ড অনুসরণ করছেন? তারা কি মানবাধিকার ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন সময়ের দাবি।
চট্টগ্রামের মানুষ কোনো ব্যক্তি বিশেষের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা চায় না। তারা চায় জবাবদিহিতা। তারা চায় অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত। তারা চায় সত্য উদঘাটন। যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, সেটিও প্রকাশ্যে আসুক। আর যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কারণ পুলিশের ইউনিফর্ম রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রতীক। সেই মর্যাদা তখনই অটুট থাকে, যখন পুলিশ জনগণের শ্রদ্ধা অর্জন করে; ভয় নয়। নাঈম হাসানের ঘটনা আজ চট্টগ্রামের মানুষের বহুদিনের জমে থাকা প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। এখন প্রশাসনের দায়িত্ব সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়া। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এবং প্রমাণ করা যে আইনের চোখে সবাই সমান— জাতীয় দলের ক্রিকেটার হোক কিংবা একজন সাধারণ নাগরিক। আজকের চট্টগ্রাম একটি বিষয় স্পষ্টভাবে জানতে চায়— অভিযোগের সত্যতা যাই হোক না কেন, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে কি না, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে প্রশাসন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে কি না। কারণ বিচারহীনতা কখনও কোনো প্রতিষ্ঠানের শক্তি নয়; জবাবদিহিতাই একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি।

