
– মো. কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা রাজনীতি, সমাজসেবা ও সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন—নুরুল আবসার চৌধুরী তেমনই একজন আলোকিত মানুষ। আজ তাঁর ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি। তাঁর জীবন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার জীবন নয়; বরং তা ছিল সংগ্রাম, আদর্শ ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে শিক্ষা আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির বৃহৎ পরিসরে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে যুগের চেতনাসম্পন্ন, জনমানুষের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত করে তোলে। শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রসেনানী-নুরুল আবসার চৌধুরীর রাজনৈতিক সচেতনতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা গড়ে ওঠে ষাটের দশকের শুরুতেই, যা ছিল আমাদের জাতির ইতিহাসে এক উত্তাল সময়। ১৯৬১ সালে শিক্ষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং পরবর্তী বছর, ১৯৬২ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া কুখ্যাত শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজ যখন রাস্তায় নামে, তখন তিনি ছিলেন এই আন্দোলনের প্রথম সারির নেতাদের একজন। সেই সময় তিনি জাতীয় ছাত্র ফ্রন্ট (NSF)–এর চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এই পদের গুরুত্ব ছিল গভীর। এনএসএফ-এর ব্যানারে তিনি সর্বদলীয় ছাত্র ফেডারেশন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং সেই ফেডারেশনের মাধ্যমে ৬২-র শিক্ষা আন্দোলনকে গণমুখী রূপ দিয়ে গণদাবিতে পরিণত করতে সক্ষম হন। রাজপথে তাঁর নেতৃত্ব ও যুক্তি-নির্ভর ভাষণ ছাত্রসমাজকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। সেসময় চট্টগ্রাম শহরে আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে আরও শাণিত করে।
আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতি ও আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত
তাঁর রাজনৈতিক জীবন সবসময় ছিল মূলধারার বাইরে একটি সততার ধারা। ১৯৯১ সালে যখন তিনি নিজেই একজন সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন, তখন দলের বৃহত্তর স্বার্থে প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়িয়ে তিনি জননেতা আব্দুল্লাহ আল নোমানকে সমর্থন দিয়ে ভোটযুদ্ধে জয়ী করতে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন। এ এক বিরল রাজনৈতিক উদারতা ও আত্মত্যাগের উদাহরণ। পরে বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ছিলেন সংগঠনশীলতায় দক্ষ এবং আদর্শনিষ্ঠ কর্মী গড়ার কারিগর।
নগর উন্নয়ন ও সমাজসেবায় অবদান-চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন তাঁকে উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। এই দায়িত্ব পালনের সময় তিনি নগরের নাগরিক সেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সংস্কৃতি ও তরুণ সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি মানে জনকল্যাণে অঙ্গীকার। তাই নগরের মসজিদ, স্কুল, সংগঠন, ক্রীড়াঙ্গন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন বিনা প্রচারে। তাঁর এমন নিঃস্বার্থ কর্মই তাঁকে সবার হৃদয়ে স্থান করে দিয়েছিল। চট্টগ্রামের গর্ব—একজন চিন্তাশীল বক্তা ও দিকনির্দেশক
নুরুল আবসার চৌধুরী ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান বক্তা। তাঁর চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক মূল্যবোধের অবনমন, শিক্ষার মান ও রাজনৈতিক সচেতনতা নিয়ে তাঁর বক্তব্য সবসময় তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করত। তিনি ছিলেন সময়ের এক সতর্ক কণ্ঠ, যিনি সমাজকে শুধু দেখতেন না, বিশ্লেষণ করে দিকনির্দেশনাও দিতেন।
সড়ক নামকরণ: এক ন্যায্য ও জরুরি দাবি-তাঁর মৃত্যুতে চট্টগ্রামের রাজনীতি, সংগঠন এবং সমাজ উন্নয়নে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা আজও অনুভূত হয়। তাঁর স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আমরা আজ জোরালোভাবে দাবি জানাই—চট্টগ্রাম নগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাম “নুরুল আবসার চৌধুরী সড়ক” হিসেবে নামকরণ করা হোক। এটি হবে তাঁর প্রতি প্রাপ্য সম্মান প্রদর্শনের একটি দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। পাশাপাশি এটি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে তাঁর নীতিবোধ, দেশপ্রেম ও সমাজচেতনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। নুরুল আবসার চৌধুরীর মতো মানুষ হারিয়ে গেলে কেবল একটি ব্যক্তি নয়, হারিয়ে যায় একটি যুগের মূল্যবোধ, একটি ভাবনার ধারা। কিন্তু যদি তাঁর মতাদর্শ ও কর্মকে ধরে রাখি স্মৃতিতে ও স্থাপনায়, তবে তিনি জীবিত থাকবেন প্রতিটি প্রজন্মের মননে ও চেতনায়। তাঁর আদর্শ আমাদের অনুপ্রেরণা, তাঁর স্মৃতি আমাদের অহঙ্কার।
নুরুল আবসার চৌধুরী চট্টগ্রামের বাতিঘর হয়ে চিরকাল আলো জ্বালিয়ে যাক।

