শিরোনাম
“সন্ত্রাসের সামনে আপসহীন ওসি আবদুর রহিম—খুলশীতে আইনের শাসনের নতুন বার্তা”চরণদ্বীপে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভাচরনদ্বীপে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভাঢাকা–কক্সবাজার আকাশপথে ভাড়ার নৈরাজ্য বন্ধ করুন | “পর্যটন রাজধানীকে জিম্মি করে বিমানভাড়া বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া যায় না” | সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেডেরদূরের দেশ, কাছের মানুষ—মুনা উইলসনের সঙ্গে শারজাহ বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টার মায়াবী সাক্ষাৎ দূরের দেশ, কাছের মানুষ-দেশে সংকটের মাঝে মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে সারবন্যায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত, বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানি বন্ধরেলওয়ের তিন শীর্ষ পদে বড় রদবদলইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়নে আইডিবির সঙ্গে বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সইফটিকছড়িতে ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধুর রহস্যজনক মৃত্যুঃ স্বামী সহ ২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা

― Advertisement ―

“সন্ত্রাসের সামনে আপসহীন ওসি আবদুর রহিম—খুলশীতে আইনের শাসনের নতুন বার্তা”

চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী—আবাসিক এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের বসবাসের কারণে আইনশৃঙ্খলার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এই এলাকায় মাদক, সন্ত্রাস,...

“স্কুল নয়, জীবন ছিল তাদের শ্রেণিকক্ষ: পাঠ্যবই না পড়েও যারা হয়েছেন সাংবাদিকতার বাতিঘর”

HomeUncategorized"স্কুল নয়, জীবন ছিল তাদের শ্রেণিকক্ষ: পাঠ্যবই না পড়েও যারা হয়েছেন সাংবাদিকতার...

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
মাঝেমধ্যে না, খুব মাঝেমধ্যেই আমার ভীষণ হাসি পায়! যাদের হাতে আছে নামীদামী স্কুল-কলেজের সার্টিফিকেট, দেয়ালে ঝোলানো ফ্রেমে মোড়া সব ডিগ্রি, তারা দুই লাইন লিখতে গেলেই কলম ভেঙে ফেলে! কলমও বুঝি রাগে ফেটে পড়ে—“না ভাই, এমন লেখকের হাতে আর না!” ওদিকে আমি? হা হা হা!
না আছে বড় কোনো সার্টিফিকেট, না কোনো স্কুলের বেঞ্চে বসার স্মৃতি।
তবু লিখি—দিনভর লিখি, রাত জেগে লিখি। এমনকি যারা লেখার গুরুগম্ভীর আলোচনায় মুখ ভরে ফেনা তোলেন, তারাও আমার কলমের ধার এড়িয়ে চলেন।
চ্যালেঞ্জে এলে কে হারে কে জেতে, একবার কলমে কলম লাগুক না, দেখা যাবে! এই আমি, যে স্কুলের সিঁড়িও কোনোদিন মাড়ায়নি, সে-ই আজ লেখার ময়দানে—গর্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি।
কি বললেন? কেউ আসছে না চ্যালেঞ্জে?
তাহলে হা হা হা… থাক, আমার হাসিই থাকুক শেষ উত্তর! আজকের এই লেখাটি একটি আত্মপ্রকাশ, একটি প্রতিবাদ এবং এক অনন্য অভিজ্ঞতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা সাংবাদিকতা নিয়ে ভাবনা। আমি—যিনি কোনোদিন পাঠ্যপুস্তক খুলিনি, কোনো বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসিনি, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘অশিক্ষিত’ বলেই পরিচিত—আজ কলম হাতে নিয়েছি সেইসব তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ সাংবাদিকদের জন্য, যাদের মানুষ আড়ালে-আবডালে ‘জ্ঞানপাপী’ বলে সম্বোধন করে। আমি জানি, এই সমাজে যারা সার্টিফিকেটে শিক্ষিত, তাদের অনেকেই মনে করে—যিনি ইংরেজি অনর্গল বলতে পারেন না, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি দেখাতে পারেন না, তার যেন কিছু বলার অধিকার নেই। কিন্তু জীবনকে যারা চোখে চোখ রেখে পড়েছে, সমাজের প্রতিটি স্তরে ধাক্কা খেয়েছে, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কলম তুলেছে—তাদের চিনতে ভুল করলে চলবে না।
আমি নিজে কোনো দিন স্কুলে যাইনি, কিন্তু চলার পথে, সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে, মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতি—সবকিছু গভীরভাবে আত্মস্থ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা, সেই অন্তরজ উপলব্ধির ভিত্তিতেই আমি সাংবাদিকতা নিয়ে একটি গবেষণামূলক বই লিখেছি—“সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা”। বইটি আজ বাংলাদেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের রেফারেন্স বই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। বাতিঘরসহ বিভিন্ন লাইব্রেরিতে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। তবে আমার লেখা বইয়ের সংখ্যা বেশি নয়- মাত্র তিরিশটি- সাংবাদিকতা নিয়ে
এই লেখাটি আমি তাদের জন্যই লিখছি, যারা উচ্চশিক্ষা নিয়েও সত্য ও ন্যায়ের পথে কলম চালাতে ভয় পায়, অথবা সুবিধাবাদে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তারা নিজেদের সাংবাদিক বলে দাবি করলেও, আসলে তারা সাংবাদিকতার আদর্শ ও দায়িত্ব সম্পর্কে ন্যূনতম শ্রদ্ধাশীল নয়। সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ লেখা নয়—এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব, একটি আত্মিক সাধনা, যা মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার নাম।
তাই আলোচনা করুন, প্রশ্ন তুলুন, ভিন্নমত দিন—কিন্তু অন্ধ সমালোচনা নয়। কারণ সাংবাদিকতা মানেই বিবেকের সাক্ষাৎ। সেই বিবেক যদি মরে যায়, তাহলে সার্টিফিকেট দিয়ে আর যাই হোক, সাংবাদিক হওয়া যায় না।
চলুন, এখন আমরা কয়েকজন স্বনামধন্য সাংবাদিকের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিই—যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পিছিয়ে থাকলেও, জীবনের পাঠশালায় বড় মাপের সাংবাদিক হয়ে উঠেছেন। কিছু বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখকের কথা তুলে ধরা হলো—যাঁরা প্রথাগত বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে আসেননি, কিন্তু আত্মশিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও লেখার দক্ষতায় হয়ে উঠেছেন বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক। এঁরা প্রমাণ করেছেন—সাংবাদিকতার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো জিজ্ঞাসা, পর্যবেক্ষণশক্তি, সততা ও সত্য বলার সাহস; কাগুজে সনদ নয়।
পাঠ্যপুস্তকের বাইরে যাঁরা গড়েছেন ইতিহাস: অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক-মার্ক টোয়েন (Mark Twain– যুক্তরাষ্ট্র,আসল নাম: স্যামুয়েল ল্যাংহর্ণ ক্লেমেন্স,শিক্ষা: মাত্র অল্প কিছুদিন স্কুলে পড়েছেন। ১১ বছর বয়সে বাবার মৃত্যু হলে স্কুল ছেড়ে দেন। জীবনপথ: ছাপাখানায় কাজ করা, নদীতে নৌচালক হওয়া, শেষে সংবাদপত্রে লেখা শুরু। বিশেষত্ব: তাঁর লেখনীতে ছিল রস, বিদ্রুপ এবং সাধারণ মানুষের জীবন। ‘The Adventures of Tom Sawyer’ ও ‘Huckleberry Finn’ তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম।বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠেন তাঁর কলমের জোরে—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই। ২. হোরাস গ্রিলি Horace Greeley– যুক্তরাষ্ট্র,শিক্ষা: দারিদ্র্যের কারণে বিদ্যালয়ের পাঠ ছিল অত্যন্ত সীমিত।কর্মজীবন: মুদ্রণ কর্মী থেকে ধীরে ধীরে সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন। প্রতিষ্ঠান: প্রতিষ্ঠা করেন ‘The New York Tribune’। বিশেষত্ব: আমেরিকার গণতন্ত্র ও সমাজ সংস্কারে তাঁর লেখনী ছিল অপরিহার্য। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব থাকলেও যুক্তিবাদ, স্পষ্টভাষীতা এবং নীতির প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে মহান সাংবাদিকে পরিণত করে। এরিক আর্থার ব্লেয়ার George Orwell– যুক্তরাজ্য পরিচিতি: ছদ্মনামে ‘George Orwell’ শিক্ষা: স্কুলে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি। বরং চাকরির জীবন বেছে নেন। কর্মজীবন: প্রথমে ছিলেন রাজকীয় পুলিশ বাহিনীতে, পরে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন।বিশেষত্ব: ‘1984’, ‘Animal Farm’—রাজনৈতিক সাংবাদিকতা, রূপক কাহিনী এবং বিশ্লেষণে অতুলনীয় অবদান।
অভিজ্ঞতাই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।
আবদুল গফ্‌ফার চৌধুরী – বাংলাদেশ,শিক্ষা: কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু পড়াশোনা নিয়মিত হয়নি। পরে পাস করা হয়নি।
কর্মজীবন: একসময় শ্রমিক হিসেবে লন্ডনে জীবন শুরু, পরে লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় অনন্য হয়ে ওঠেন।
বিশেষত্ব: “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” গান এবং প্রবাসী সাংবাদিকতায় ইতিহাস গড়েন। প্রথাগত ডিগ্রি না থাকলেও তাঁর লেখনীতে ছিল আবেগ, সত্য, ইতিহাস।
এবিএম মূসা – বাংলাদেশ
শিক্ষা: স্কুলজীবনে পড়ালেখার ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করা হয়নি।
কর্মজীবন: ‘দৈনিক সংবাদ’ ও পরে বিটিভি’র মহাপরিচালক হন। বিশেষত্ব: রাজনীতি, যুদ্ধ, প্রশাসন—সব বিষয়ে দক্ষ বিশ্লেষক সাংবাদিক ছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তাঁকে শিক্ষার চেয়ে বেশি এগিয়ে দিয়েছিল।
বাল ঠাকরে – ভারত শিক্ষা: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অল্পদিনের।
কর্মজীবন: প্রথমে কার্টুনিস্ট ছিলেন। পরে গড়েন ‘Saamana’ পত্রিকা, যেখানে নিজের রাজনৈতিক মতামত লিখতেন।
বিশেষত্ব: লেখালেখির প্রভাবেই মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে বিশাল এক প্রভাবক হয়ে ওঠেন। নিজেকে সাংবাদিক বলতেই পছন্দ করতেন, লেখার শক্তিতেই নেতা হন। জুলিয়ান আসাঞ্জ – অস্ট্রেলিয়া
শিক্ষা: স্কুল-কলেজের নিয়মিত ছাত্র ছিলেন না। হোম-স্কুলিং এবং আত্মশিক্ষার মাধ্যমে বড় হন। কর্মজীবন: প্রযুক্তি থেকে সাংবাদিকতায় আসা। বিশেষত্ব: WikiLeaks প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বের বহু গোপন তথ্য ফাঁস করেন। অনেকেই বলেন, প্রথাগত শিক্ষা থাকলে হয়তো এত সাহসী ও ভিন্নধর্মী চিন্তা করতে পারতেন না।
কুলজিপ নায়ার (Kuldip Nayar – ভারত শিক্ষা: কিছু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলেও তাঁর সাংবাদিকতার দীক্ষা এসেছে মাঠের কাজ ও অভিজ্ঞতা থেকে। বিশেষত্ব: ভারতের স্বাধীনতা, জরুরি অবস্থা, দাঙ্গা—সবই তাঁর কলমে উঠে এসেছে স্পষ্ট ভাষায়।
নিজের লেখা ‘Between the Lines’ আজও পাঠযোগ্য ও শিক্ষণীয়।
উপসংহার: শিক্ষার চেয়ে বড় শক্তি—দৃষ্টিভঙ্গি ও সত্য বলার সাহস-এই সাংবাদিক ও লেখকদের জীবনী আমাদের শেখায়—শিক্ষার সার্টিফিকেট নয়, সাংবাদিকতার প্রাণ হলো অন্তর্জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ, সততা এবং দায়বদ্ধতা। যারা বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে পারেননি, তাঁরাও বিশ্বজয় করেছেন কলম হাতে। বাংলাদেশেও বহু স্থানীয় ও জাতীয় সাংবাদিক আছেন, যাঁরা হয়তো বিদ্যালয়ের শিক্ষা পাননি, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা, সংগ্রাম আর অভিজ্ঞতা দিয়ে সাংবাদিকতা করেছেন সাহসিকতার সঙ্গে। সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি হচ্ছে একান্ত সাধনার ক্ষেত্র। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়—বিশ্ব ও বাংলাদেশে বহু নামী-দামী সাংবাদিক ও লেখক এমন সব পেশা থেকে উঠে এসেছেন, যা হয়তো আমাদের ধারণার বাইরেই ছিল। কেউ ছিলেন ফেরিওয়ালা, কেউবা নৌকার মাঝি, কেউবা ব্যবসায়ী, শিক্ষক, চাকরিজীবী, এমনকি কুলি বা হকারও। এই সকল মানুষদের জীবনের মূল অনুপ্রেরণা ছিল একটিই—সত্য বলা এবং সমাজকে পরিবর্তনের পথ দেখানো।
এ লেখায় আমরা তুলে ধরছি সেইসব আলোকিত মানুষদের কথা, যারা নিজ নিজ শ্রেণি-পেশা থেকে উঠে এসে সাংবাদিকতার মাধ্যমে জাতি ও বিশ্বের বিবেক হয়ে উঠেছিলেন।
বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণা: অন্য পেশা থেকে সাংবাদিকতায় উত্থান- ওরিয়ানা ফালাচি Oriana Fallaci – ইতালি- ওরিয়ানা একজন নার্স হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। পরে সাংবাদিকতা পেশায় আসেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে আয়াতুল্লাহ খোমেনির সাক্ষাৎকার—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সাহসী সাংবাদিকতা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। উইলিয়াম র‍্যান্ডলফ হার্স্ট William R. Hearst– যুক্তরাষ্ট্র- তিনি প্রথমে একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। পরে সংবাদপত্রে বিনিয়োগ করে নিজেই সাংবাদিকতা শুরু করেন এবং হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র মালিক ও সম্পাদক। নেলি ব্লাই Nellie Bly – যুক্তরাষ্ট্র-কারখানার শ্রমিক ছিলেন। একদিন সাহস করে একটি প্রতিবাদী চিঠি লেখেন পত্রিকায়, সেখান থেকেই শুরু তাঁর সাংবাদিকতা। নেলি ছিলেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ।
৪. আর. কে. নারায়ণ R. K. Narayan– ভারত-তিনি শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন। পরে লেখালেখি শুরু করেন। সাংবাদিকতাও করেছেন মাদ্রাজ পত্রিকায়। তাঁর গল্প-উপন্যাসে সাধারণ মানুষের জীবন উঠে এসেছে গভীর সহানুভূতির সাথে।ওয়াল্টার ক্রঙ্কাইট Walter Cronkite – যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় টেলিভিশন সংবাদ উপস্থাপক ছিলেন। ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ট্রাক ড্রাইভার হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধ-সংবাদদাতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলাদেশে বিচিত্র পেশা থেকে উঠে আসা বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক-তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া-তিনি আইনজীবী হিসেবে পেশা শুরু করেন। পরে সাংবাদিকতায় এসে “ইত্তেফাক”-এর মাধ্যমে হয়ে ওঠেন ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কণ্ঠস্বর। আবদুল গফ্‌ফার চৌধুরী
লন্ডনে গিয়ে তিনি প্রথমে শ্রমিক হিসেবেই জীবন শুরু করেন। পরে সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে তাঁর উত্থান। তাঁর লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি আজ ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।
শওকত ওসমান-প্রথম জীবনে শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন গণমানুষের কণ্ঠস্বর। মাহবুব তালুকদার- প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করেছেন, পরবর্তীতে সরকারি চাকরিতে ছিলেন। তিনি একজন সফল সাংবাদিক ও লেখক হিসেবেও পরিচিত। তাঁর লেখনীতে প্রশাসনিক বাস্তবতা ও মানবিক চেতনা মিলেমিশে আছে। মতিউর রহমান, সম্পাদক, প্রথম আলো-তিনি কৃষি পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরে ধীরে ধীরে লেখালেখির প্রতি ঝোঁক বাড়ে এবং সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের মধ্য থেকেও উঠে আসা সংবাদযোদ্ধারা-অনেকেই রয়েছেন যাঁরা কুলি, হকার, ফেরিওয়ালা বা মাঝি পেশা থেকে উঠে এসে সাহসের সাথে সাংবাদিকতা করেছেন: আব্দুল হাকিম-চট্টগ্রামের একজন কুলি ছিলেন, যিনি শ্রমিক সংগঠনের মুখপত্র হিসেবে পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। পরবর্তীতে মূলধারার সাংবাদিকতায় যুক্ত হন এবং শ্রমজীবী মানুষের কথা তুলে ধরেন। আবু তাহের মিঠু- একসময় ছিলেন ফেরিওয়ালা। কিন্তু লেখার প্রতি ঝোঁক ছিল প্রবল। নিজ উদ্যোগে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করতেন। পরে সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে খ্যাতি অর্জন করেন।
৩. ফিরোজ খান-একজন মাঝি ছিলেন। যাত্রীদের গল্প শুনতে শুনতে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মে। পরে গ্রামীণ সাংবাদিকতার অগ্রদূত হিসেবে পরিচিতি পান। হাসান মাসুদ (অভিনেতা ও সাংবাদিক)-প্রথমে একটি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতেন, পরে গান ও অভিনয়ে জনপ্রিয় হন। তিনি জানান, “আমি সাংবাদিকতা থেকেই মানুষের জীবন বুঝতে শিখেছি।”
যারা সাংবাদিকতা থেকে নেতৃত্বে
মোহাম্মদ হোসেন (জার্মানি প্রবাসী) সাংবাদিকতা করতে করতে নিজের এলাকা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। প্রবাসে থেকেও নিজ গ্রামে পাঠাগার ও উন্নয়ন প্রকল্পে নেতৃত্ব দেন।
আবুল আসাদ (সম্পাদক, দৈনিক সংগ্রাম) সাংবাদিকতার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত থেকে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া সম্পর্কে বহু সাংবাদিক লেখক ছিলেন নেপথ্য উপদেষ্টা- অনেকে নীতিগত দিক নির্দেশনা দিয়েছেন কলাম, প্রবন্ধ ও রিপোর্টের মাধ্যমে—যা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।
সাংবাদিকতা একমাত্র পেশা নয় যা নির্দিষ্ট শিক্ষাগত ডিগ্রি বা সামাজিক শ্রেণি চায় না—এটি চায় সততা, দৃষ্টিভঙ্গি, সাহস এবং কলম চালানোর দক্ষতা। একজন কুলিও হতে পারেন সত্যের কণ্ঠস্বর, যেমনটি হতে পারেন একজন অধ্যাপক বা চিকিৎসকও।
বিচিত্র পেশা থেকে উঠে আসা এইসব মানুষদের গল্প আমাদের শিখিয়ে দেয়—যে কোনো জায়গা থেকেই আলোর দিকে যাত্রা সম্ভব। আজও সমাজে অগণিত মানুষ আছেন, যাঁরা হয়তো অন্য কোনো পেশায় যুক্ত আছেন, কিন্তু হৃদয়ের গহীনে একজন সাংবাদিক। তাদের জন্যই এই প্রবন্ধ। সাংবাদিকতা নিছক একটি পেশা নয়, এটি একাধারে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার, রাষ্ট্র গঠনের সহযাত্রী এবং জাতির বিবেকের প্রতিচ্ছবি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—বিশ্বজুড়ে অনেক খ্যাতিমান সাংবাদিক ও লেখক ছিলেন, যাঁরা অন্য পেশা থেকে এই জগতে এসে অসামান্য অবদান রেখেছেন। আবার অনেকে সাংবাদিকতা থেকে নেতৃত্বে পৌঁছে দেশ পরিচালনা করেছেন, সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য ইতিহাস। এ লেখা তাঁদেরই কৃতিত্বগাথা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: রাজনীতিক হলেও সাংবাদিকতায় সরব-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির পিতা হলেও সাংবাদিকতার সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তরুণ বয়সে তিনি ‘কৃষক’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেছেন। তাঁর ভাষণ, চিন্তা ও লেখনীর ভঙ্গি ছিল অত্যন্ত প্রাঞ্জল, স্পষ্ট ও চিন্তাশীল। রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও সংবাদমাধ্যমকে তিনি গণমানুষের কণ্ঠ হিসেবে ব্যবহার করতেন। সাংবাদিকদের মর্যাদা ও স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর অবস্থান ছিল সুদৃঢ়। হুমায়ূন আহমেদ: বিজ্ঞানী থেকে লেখক হয়ে উঠা এক বিস্ময়-হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সাহিত্যের এক প্রজ্বলিত নক্ষত্র। তিনি মূলত রসায়নের অধ্যাপক ছিলেন, পরে পেশা ছেড়ে পুরোদস্তুর লেখক হয়ে ওঠেন। সাংবাদিক ছিলেন না পেশাগতভাবে, কিন্তু তাঁর কলাম, ব্যক্তিগত গদ্য এবং লেখালেখির ধারা সংবাদ মাধ্যমের সীমানা পেরিয়ে সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর লেখা রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। তোফায়েল আহমেদ: সাংবাদিক থেকে মন্ত্রী-বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ ষাটের দশকে ‘খেলাফত’ ও অন্যান্য প্রকাশনায় সক্রিয়ভাবে লেখালেখি করেছেন। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা এবং ‘ছাত্রসংসদ’ সাময়িকীর সম্পাদক। সাংবাদিকতার হাত ধরে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। মাহফুজ আনাম: আমলাতন্ত্র থেকে সাংবাদিকতায় উত্তরণ-মাহফুজ আনাম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে কাজ করতেন। পরবর্তীতে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দিয়ে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক। তাঁর বিশ্লেষণধর্মী লেখা, নীতিনিষ্ঠ অবস্থান ও মুক্তচিন্তার পক্ষে অবস্থান দেশের গণমাধ্যম জগতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আনিসুল হক: টিভি উপস্থাপক থেকে মেয়র- আনিসুল হক তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও টেলিভিশন উপস্থাপনার মাধ্যমে। পরে ব্যবসায়ী হয়ে উঠলেও তিনি তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় ভুলে যাননি। জনপ্রিয় উপন্যাস, নাটক, কলাম—সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সফল। পরবর্তীতে ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র হয়ে জনসেবায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। জুলিয়ান আসাঞ্জ: প্রযুক্তিবিদ থেকে সাংবাদিকতা বিপ্লবী-জুলিয়ান আসাঞ্জ অস্ট্রেলিয়ার একজন প্রযুক্তিবিদ হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেন। পরে তিনি Wikileaks প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব রাজনীতির বহু গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়ে সাংবাদিকতা জগতে বিপ্লব ঘটান। সাংবাদিকতা এবং তথ্যের স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর সাহসী অবস্থান তাকে বিশ্ব ইতিহাসে স্থান দিয়েছে। ওন চার্চিল: সাংবাদিক, লেখক, তারপর রাষ্ট্রনায়ক-ইংল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সার উইনস্টন চার্চিল প্রথম জীবনে ছিলেন যুদ্ধ প্রতিবেদক ও সাংবাদিক। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা, কিউবা ও ভারতের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংবাদ পাঠিয়েছেন। তাঁর লেখালেখি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, পরে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে ব্রিটেন জয় পায়। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—কলম ও নেতৃত্বের শক্তি একসঙ্গে কতদূর যেতে পারে।
থিওডোর রুজভেল্ট: সাংবাদিকতার সঙ্গে রাজনীতির মেলবন্ধন-আমেরিকার ২৬তম প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট সংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠক ও লেখক ছিলেন। তাঁর রাজনীতিক ক্যারিয়ারে সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি ‘মাক্রাকার্স’ নামে পরিচিত অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের কাজকে রাষ্ট্র সংস্কারের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। এরনেস্ট হেমিংওয়ে: যুদ্ধ সাংবাদিক থেকে নোবেলজয়ী সাহিত্যিক-এরনেস্ট হেমিংওয়ে ছিলেন একজন যুদ্ধ সংবাদদাতা, যিনি স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাতে সংবাদ প্রতিবেদন করেছেন। পরবর্তীতে সাহিত্যের জগতে এসে তিনি পুলিৎজার ও নোবেল পুরস্কার জিতে নেন। তাঁর লেখায় বাস্তবতা, সাহস ও কষ্টের গাঢ় চিত্র ফুটে ওঠে—সাংবাদিকতারই প্রভাব।
মেরি কলভিন: এক চোখে বিশ্বদ্রষ্টা সাংবাদিকতা-মেরি কলভিন, ব্রিটিশ সাংবাদিক, ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রের নির্ভীক কণ্ঠ। তিনি শ্রীলঙ্কায় গ্রেনেড হামলায় একটি চোখ হারান, তবুও থেমে থাকেননি। সিরিয়ায় তাঁর শেষ প্রতিবেদন ছিল মানবতার জন্য এক জ্বলন্ত আবেদন। সাংবাদিকতা পেশাকে তিনি কেবল পেশা নয়, দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে সাংবাদিক থেকে নেতৃত্বের উত্থান: কিছু উজ্জ্বল নাম-এম. এ. করিম (ডেইলি আজাদ), তোয়াব খান – যাঁরা সাংবাদিকতার জগতে আভিজাত্য তৈরি করেছেন। তোয়াব খান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রেস সচিব। এসব নেতৃস্থানীয় সাংবাদিক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা রেখেছেন।
সাংবাদিকতা থেকে সাহিত্য, সাহিত্য থেকে নেতৃত্ব—একটি সেতুবন্ধন-এইসব মানুষদের জীবনের একটি সাধারণ ধারা রয়েছে—তাঁরা সবাই সমাজের প্রতিকূল বাস্তবতাকে কলমের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন, আর সেই অবস্থান থেকেই ধীরে ধীরে তাঁরা নেতৃত্বে উঠে এসেছেন। কেউ কেউ কলাম লিখে বদলে দিয়েছেন নীতি, কেউবা মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিপ্লবে। আবার কেউ কেউ প্রশাসনের চাকরি ছেড়ে কলম হাতে তুলে নিয়ে সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন—কী ভুল, কী ঠিক।
কলমই পারে ইতিহাস লিখতে ও নেতৃত্ব গড়তে-সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ পরিবেশনের কাজ নয়, এটি একটি সামাজিক বিপ্লবের সূচনা। যারা সত্যের পক্ষে কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁ-মো.কামাল উদ্দিনঃ
মাঝেমধ্যে না, খুব মাঝেমধ্যেই আমার ভীষণ হাসি পায়! যাদের হাতে আছে নামীদামী স্কুল-কলেজের সার্টিফিকেট, দেয়ালে ঝোলানো ফ্রেমে মোড়া সব ডিগ্রি, তারা দুই লাইন লিখতে গেলেই কলম ভেঙে ফেলে! কলমও বুঝি রাগে ফেটে পড়ে—“না ভাই, এমন লেখকের হাতে আর না!” ওদিকে আমি? হা হা হা!
না আছে বড় কোনো সার্টিফিকেট, না কোনো স্কুলের বেঞ্চে বসার স্মৃতি।
তবু লিখি—দিনভর লিখি, রাত জেগে লিখি। এমনকি যারা লেখার গুরুগম্ভীর আলোচনায় মুখ ভরে ফেনা তোলেন, তারাও আমার কলমের ধার এড়িয়ে চলেন।
চ্যালেঞ্জে এলে কে হারে কে জেতে, একবার কলমে কলম লাগুক না, দেখা যাবে! এই আমি, যে স্কুলের সিঁড়িও কোনোদিন মাড়ায়নি, সে-ই আজ লেখার ময়দানে—গর্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছি।
কি বললেন? কেউ আসছে না চ্যালেঞ্জে?
তাহলে হা হা হা… থাক, আমার হাসিই থাকুক শেষ উত্তর! আজকের এই লেখাটি একটি আত্মপ্রকাশ, একটি প্রতিবাদ এবং এক অনন্য অভিজ্ঞতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা সাংবাদিকতা নিয়ে ভাবনা। আমি—যিনি কোনোদিন পাঠ্যপুস্তক খুলিনি, কোনো বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসিনি, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘অশিক্ষিত’ বলেই পরিচিত—আজ কলম হাতে নিয়েছি সেইসব তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ সাংবাদিকদের জন্য, যাদের মানুষ আড়ালে-আবডালে ‘জ্ঞানপাপী’ বলে সম্বোধন করে। আমি জানি, এই সমাজে যারা সার্টিফিকেটে শিক্ষিত, তাদের অনেকেই মনে করে—যিনি ইংরেজি অনর্গল বলতে পারেন না, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি দেখাতে পারেন না, তার যেন কিছু বলার অধিকার নেই। কিন্তু জীবনকে যারা চোখে চোখ রেখে পড়েছে, সমাজের প্রতিটি স্তরে ধাক্কা খেয়েছে, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কলম তুলেছে—তাদের চিনতে ভুল করলে চলবে না।
আমি নিজে কোনো দিন স্কুলে যাইনি, কিন্তু চলার পথে, সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে, মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতি—সবকিছু গভীরভাবে আত্মস্থ করেছি। সেই অভিজ্ঞতা, সেই অন্তরজ উপলব্ধির ভিত্তিতেই আমি সাংবাদিকতা নিয়ে একটি গবেষণামূলক বই লিখেছি—“সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা”। বইটি আজ বাংলাদেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের রেফারেন্স বই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। বাতিঘরসহ বিভিন্ন লাইব্রেরিতে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। তবে আমার লেখা বইয়ের সংখ্যা বেশি নয়- মাত্র তিরিশটি- সাংবাদিকতা নিয়ে
এই লেখাটি আমি তাদের জন্যই লিখছি, যারা উচ্চশিক্ষা নিয়েও সত্য ও ন্যায়ের পথে কলম চালাতে ভয় পায়, অথবা সুবিধাবাদে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তারা নিজেদের সাংবাদিক বলে দাবি করলেও, আসলে তারা সাংবাদিকতার আদর্শ ও দায়িত্ব সম্পর্কে ন্যূনতম শ্রদ্ধাশীল নয়। সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ লেখা নয়—এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব, একটি আত্মিক সাধনা, যা মানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার নাম।
তাই আলোচনা করুন, প্রশ্ন তুলুন, ভিন্নমত দিন—কিন্তু অন্ধ সমালোচনা নয়। কারণ সাংবাদিকতা মানেই বিবেকের সাক্ষাৎ। সেই বিবেক যদি মরে যায়, তাহলে সার্টিফিকেট দিয়ে আর যাই হোক, সাংবাদিক হওয়া যায় না।
চলুন, এখন আমরা কয়েকজন স্বনামধন্য সাংবাদিকের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিই—যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পিছিয়ে থাকলেও, জীবনের পাঠশালায় বড় মাপের সাংবাদিক হয়ে উঠেছেন। কিছু বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখকের কথা তুলে ধরা হলো—যাঁরা প্রথাগত বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে আসেননি, কিন্তু আত্মশিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও লেখার দক্ষতায় হয়ে উঠেছেন বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক। এঁরা প্রমাণ করেছেন—সাংবাদিকতার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো জিজ্ঞাসা, পর্যবেক্ষণশক্তি, সততা ও সত্য বলার সাহস; কাগুজে সনদ নয়।
পাঠ্যপুস্তকের বাইরে যাঁরা গড়েছেন ইতিহাস: অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক-মার্ক টোয়েন (Mark Twain– যুক্তরাষ্ট্র,আসল নাম: স্যামুয়েল ল্যাংহর্ণ ক্লেমেন্স,শিক্ষা: মাত্র অল্প কিছুদিন স্কুলে পড়েছেন। ১১ বছর বয়সে বাবার মৃত্যু হলে স্কুল ছেড়ে দেন। জীবনপথ: ছাপাখানায় কাজ করা, নদীতে নৌচালক হওয়া, শেষে সংবাদপত্রে লেখা শুরু। বিশেষত্ব: তাঁর লেখনীতে ছিল রস, বিদ্রুপ এবং সাধারণ মানুষের জীবন। ‘The Adventures of Tom Sawyer’ ও ‘Huckleberry Finn’ তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম।বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠেন তাঁর কলমের জোরে—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই। ২. হোরাস গ্রিলি Horace Greeley– যুক্তরাষ্ট্র,শিক্ষা: দারিদ্র্যের কারণে বিদ্যালয়ের পাঠ ছিল অত্যন্ত সীমিত।কর্মজীবন: মুদ্রণ কর্মী থেকে ধীরে ধীরে সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন। প্রতিষ্ঠান: প্রতিষ্ঠা করেন ‘The New York Tribune’। বিশেষত্ব: আমেরিকার গণতন্ত্র ও সমাজ সংস্কারে তাঁর লেখনী ছিল অপরিহার্য। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব থাকলেও যুক্তিবাদ, স্পষ্টভাষীতা এবং নীতির প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে মহান সাংবাদিকে পরিণত করে। এরিক আর্থার ব্লেয়ার George Orwell– যুক্তরাজ্য পরিচিতি: ছদ্মনামে ‘George Orwell’ শিক্ষা: স্কুলে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি। বরং চাকরির জীবন বেছে নেন। কর্মজীবন: প্রথমে ছিলেন রাজকীয় পুলিশ বাহিনীতে, পরে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন।বিশেষত্ব: ‘1984’, ‘Animal Farm’—রাজনৈতিক সাংবাদিকতা, রূপক কাহিনী এবং বিশ্লেষণে অতুলনীয় অবদান।
অভিজ্ঞতাই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।
আবদুল গফ্‌ফার চৌধুরী – বাংলাদেশ,শিক্ষা: কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু পড়াশোনা নিয়মিত হয়নি। পরে পাস করা হয়নি।
কর্মজীবন: একসময় শ্রমিক হিসেবে লন্ডনে জীবন শুরু, পরে লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় অনন্য হয়ে ওঠেন।
বিশেষত্ব: “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” গান এবং প্রবাসী সাংবাদিকতায় ইতিহাস গড়েন। প্রথাগত ডিগ্রি না থাকলেও তাঁর লেখনীতে ছিল আবেগ, সত্য, ইতিহাস।
এবিএম মূসা – বাংলাদেশ
শিক্ষা: স্কুলজীবনে পড়ালেখার ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করা হয়নি।
কর্মজীবন: ‘দৈনিক সংবাদ’ ও পরে বিটিভি’র মহাপরিচালক হন। বিশেষত্ব: রাজনীতি, যুদ্ধ, প্রশাসন—সব বিষয়ে দক্ষ বিশ্লেষক সাংবাদিক ছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তাঁকে শিক্ষার চেয়ে বেশি এগিয়ে দিয়েছিল।
বাল ঠাকরে – ভারত শিক্ষা: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অল্পদিনের।
কর্মজীবন: প্রথমে কার্টুনিস্ট ছিলেন। পরে গড়েন ‘Saamana’ পত্রিকা, যেখানে নিজের রাজনৈতিক মতামত লিখতেন।
বিশেষত্ব: লেখালেখির প্রভাবেই মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে বিশাল এক প্রভাবক হয়ে ওঠেন। নিজেকে সাংবাদিক বলতেই পছন্দ করতেন, লেখার শক্তিতেই নেতা হন। জুলিয়ান আসাঞ্জ – অস্ট্রেলিয়া
শিক্ষা: স্কুল-কলেজের নিয়মিত ছাত্র ছিলেন না। হোম-স্কুলিং এবং আত্মশিক্ষার মাধ্যমে বড় হন। কর্মজীবন: প্রযুক্তি থেকে সাংবাদিকতায় আসা। বিশেষত্ব: WikiLeaks প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বের বহু গোপন তথ্য ফাঁস করেন। অনেকেই বলেন, প্রথাগত শিক্ষা থাকলে হয়তো এত সাহসী ও ভিন্নধর্মী চিন্তা করতে পারতেন না।
কুলজিপ নায়ার (Kuldip Nayar – ভারত শিক্ষা: কিছু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলেও তাঁর সাংবাদিকতার দীক্ষা এসেছে মাঠের কাজ ও অভিজ্ঞতা থেকে। বিশেষত্ব: ভারতের স্বাধীনতা, জরুরি অবস্থা, দাঙ্গা—সবই তাঁর কলমে উঠে এসেছে স্পষ্ট ভাষায়।
নিজের লেখা ‘Between the Lines’ আজও পাঠযোগ্য ও শিক্ষণীয়।
উপসংহার: শিক্ষার চেয়ে বড় শক্তি—দৃষ্টিভঙ্গি ও সত্য বলার সাহস-এই সাংবাদিক ও লেখকদের জীবনী আমাদের শেখায়—শিক্ষার সার্টিফিকেট নয়, সাংবাদিকতার প্রাণ হলো অন্তর্জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ, সততা এবং দায়বদ্ধতা। যারা বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে পারেননি, তাঁরাও বিশ্বজয় করেছেন কলম হাতে। বাংলাদেশেও বহু স্থানীয় ও জাতীয় সাংবাদিক আছেন, যাঁরা হয়তো বিদ্যালয়ের শিক্ষা পাননি, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা, সংগ্রাম আর অভিজ্ঞতা দিয়ে সাংবাদিকতা করেছেন সাহসিকতার সঙ্গে। সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি হচ্ছে একান্ত সাধনার ক্ষেত্র। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়—বিশ্ব ও বাংলাদেশে বহু নামী-দামী সাংবাদিক ও লেখক এমন সব পেশা থেকে উঠে এসেছেন, যা হয়তো আমাদের ধারণার বাইরেই ছিল। কেউ ছিলেন ফেরিওয়ালা, কেউবা নৌকার মাঝি, কেউবা ব্যবসায়ী, শিক্ষক, চাকরিজীবী, এমনকি কুলি বা হকারও। এই সকল মানুষদের জীবনের মূল অনুপ্রেরণা ছিল একটিই—সত্য বলা এবং সমাজকে পরিবর্তনের পথ দেখানো।
এ লেখায় আমরা তুলে ধরছি সেইসব আলোকিত মানুষদের কথা, যারা নিজ নিজ শ্রেণি-পেশা থেকে উঠে এসে সাংবাদিকতার মাধ্যমে জাতি ও বিশ্বের বিবেক হয়ে উঠেছিলেন।
বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণা: অন্য পেশা থেকে সাংবাদিকতায় উত্থান- ওরিয়ানা ফালাচি Oriana Fallaci – ইতালি- ওরিয়ানা একজন নার্স হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। পরে সাংবাদিকতা পেশায় আসেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে আয়াতুল্লাহ খোমেনির সাক্ষাৎকার—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সাহসী সাংবাদিকতা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। উইলিয়াম র‍্যান্ডলফ হার্স্ট William R. Hearst– যুক্তরাষ্ট্র- তিনি প্রথমে একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। পরে সংবাদপত্রে বিনিয়োগ করে নিজেই সাংবাদিকতা শুরু করেন এবং হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র মালিক ও সম্পাদক। নেলি ব্লাই Nellie Bly – যুক্তরাষ্ট্র-কারখানার শ্রমিক ছিলেন। একদিন সাহস করে একটি প্রতিবাদী চিঠি লেখেন পত্রিকায়, সেখান থেকেই শুরু তাঁর সাংবাদিকতা। নেলি ছিলেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ।
৪. আর. কে. নারায়ণ R. K. Narayan– ভারত-তিনি শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন। পরে লেখালেখি শুরু করেন। সাংবাদিকতাও করেছেন মাদ্রাজ পত্রিকায়। তাঁর গল্প-উপন্যাসে সাধারণ মানুষের জীবন উঠে এসেছে গভীর সহানুভূতির সাথে।ওয়াল্টার ক্রঙ্কাইট Walter Cronkite – যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় টেলিভিশন সংবাদ উপস্থাপক ছিলেন। ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ট্রাক ড্রাইভার হিসেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধ-সংবাদদাতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলাদেশে বিচিত্র পেশা থেকে উঠে আসা বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক-তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া-তিনি আইনজীবী হিসেবে পেশা শুরু করেন। পরে সাংবাদিকতায় এসে “ইত্তেফাক”-এর মাধ্যমে হয়ে ওঠেন ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম কণ্ঠস্বর। আবদুল গফ্‌ফার চৌধুরী
লন্ডনে গিয়ে তিনি প্রথমে শ্রমিক হিসেবেই জীবন শুরু করেন। পরে সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে তাঁর উত্থান। তাঁর লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি আজ ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।
শওকত ওসমান-প্রথম জীবনে শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন গণমানুষের কণ্ঠস্বর। মাহবুব তালুকদার- প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করেছেন, পরবর্তীতে সরকারি চাকরিতে ছিলেন। তিনি একজন সফল সাংবাদিক ও লেখক হিসেবেও পরিচিত। তাঁর লেখনীতে প্রশাসনিক বাস্তবতা ও মানবিক চেতনা মিলেমিশে আছে। মতিউর রহমান, সম্পাদক, প্রথম আলো-তিনি কৃষি পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরে ধীরে ধীরে লেখালেখির প্রতি ঝোঁক বাড়ে এবং সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের মধ্য থেকেও উঠে আসা সংবাদযোদ্ধারা-অনেকেই রয়েছেন যাঁরা কুলি, হকার, ফেরিওয়ালা বা মাঝি পেশা থেকে উঠে এসে সাহসের সাথে সাংবাদিকতা করেছেন: আব্দুল হাকিম-চট্টগ্রামের একজন কুলি ছিলেন, যিনি শ্রমিক সংগঠনের মুখপত্র হিসেবে পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। পরবর্তীতে মূলধারার সাংবাদিকতায় যুক্ত হন এবং শ্রমজীবী মানুষের কথা তুলে ধরেন। আবু তাহের মিঠু- একসময় ছিলেন ফেরিওয়ালা। কিন্তু লেখার প্রতি ঝোঁক ছিল প্রবল। নিজ উদ্যোগে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করতেন। পরে সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে খ্যাতি অর্জন করেন।
৩. ফিরোজ খান-একজন মাঝি ছিলেন। যাত্রীদের গল্প শুনতে শুনতে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ জন্মে। পরে গ্রামীণ সাংবাদিকতার অগ্রদূত হিসেবে পরিচিতি পান। হাসান মাসুদ (অভিনেতা ও সাংবাদিক)-প্রথমে একটি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতেন, পরে গান ও অভিনয়ে জনপ্রিয় হন। তিনি জানান, “আমি সাংবাদিকতা থেকেই মানুষের জীবন বুঝতে শিখেছি।”
যারা সাংবাদিকতা থেকে নেতৃত্বে
মোহাম্মদ হোসেন (জার্মানি প্রবাসী) সাংবাদিকতা করতে করতে নিজের এলাকা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। প্রবাসে থেকেও নিজ গ্রামে পাঠাগার ও উন্নয়ন প্রকল্পে নেতৃত্ব দেন।
আবুল আসাদ (সম্পাদক, দৈনিক সংগ্রাম) সাংবাদিকতার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত থেকে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া সম্পর্কে বহু সাংবাদিক লেখক ছিলেন নেপথ্য উপদেষ্টা- অনেকে নীতিগত দিক নির্দেশনা দিয়েছেন কলাম, প্রবন্ধ ও রিপোর্টের মাধ্যমে—যা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।
সাংবাদিকতা একমাত্র পেশা নয় যা নির্দিষ্ট শিক্ষাগত ডিগ্রি বা সামাজিক শ্রেণি চায় না—এটি চায় সততা, দৃষ্টিভঙ্গি, সাহস এবং কলম চালানোর দক্ষতা। একজন কুলিও হতে পারেন সত্যের কণ্ঠস্বর, যেমনটি হতে পারেন একজন অধ্যাপক বা চিকিৎসকও।
বিচিত্র পেশা থেকে উঠে আসা এইসব মানুষদের গল্প আমাদের শিখিয়ে দেয়—যে কোনো জায়গা থেকেই আলোর দিকে যাত্রা সম্ভব। আজও সমাজে অগণিত মানুষ আছেন, যাঁরা হয়তো অন্য কোনো পেশায় যুক্ত আছেন, কিন্তু হৃদয়ের গহীনে একজন সাংবাদিক। তাদের জন্যই এই প্রবন্ধ। সাংবাদিকতা নিছক একটি পেশা নয়, এটি একাধারে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার, রাষ্ট্র গঠনের সহযাত্রী এবং জাতির বিবেকের প্রতিচ্ছবি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—বিশ্বজুড়ে অনেক খ্যাতিমান সাংবাদিক ও লেখক ছিলেন, যাঁরা অন্য পেশা থেকে এই জগতে এসে অসামান্য অবদান রেখেছেন। আবার অনেকে সাংবাদিকতা থেকে নেতৃত্বে পৌঁছে দেশ পরিচালনা করেছেন, সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য ইতিহাস। এ লেখা তাঁদেরই কৃতিত্বগাথা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: রাজনীতিক হলেও সাংবাদিকতায় সরব-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির পিতা হলেও সাংবাদিকতার সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তরুণ বয়সে তিনি ‘কৃষক’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেছেন। তাঁর ভাষণ, চিন্তা ও লেখনীর ভঙ্গি ছিল অত্যন্ত প্রাঞ্জল, স্পষ্ট ও চিন্তাশীল। রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও সংবাদমাধ্যমকে তিনি গণমানুষের কণ্ঠ হিসেবে ব্যবহার করতেন। সাংবাদিকদের মর্যাদা ও স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর অবস্থান ছিল সুদৃঢ়। হুমায়ূন আহমেদ: বিজ্ঞানী থেকে লেখক হয়ে উঠা এক বিস্ময়-হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সাহিত্যের এক প্রজ্বলিত নক্ষত্র। তিনি মূলত রসায়নের অধ্যাপক ছিলেন, পরে পেশা ছেড়ে পুরোদস্তুর লেখক হয়ে ওঠেন। সাংবাদিক ছিলেন না পেশাগতভাবে, কিন্তু তাঁর কলাম, ব্যক্তিগত গদ্য এবং লেখালেখির ধারা সংবাদ মাধ্যমের সীমানা পেরিয়ে সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর লেখা রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। তোফায়েল আহমেদ: সাংবাদিক থেকে মন্ত্রী-বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ ষাটের দশকে ‘খেলাফত’ ও অন্যান্য প্রকাশনায় সক্রিয়ভাবে লেখালেখি করেছেন। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা এবং ‘ছাত্রসংসদ’ সাময়িকীর সম্পাদক। সাংবাদিকতার হাত ধরে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। মাহফুজ আনাম: আমলাতন্ত্র থেকে সাংবাদিকতায় উত্তরণ-মাহফুজ আনাম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে কাজ করতেন। পরবর্তীতে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দিয়ে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক। তাঁর বিশ্লেষণধর্মী লেখা, নীতিনিষ্ঠ অবস্থান ও মুক্তচিন্তার পক্ষে অবস্থান দেশের গণমাধ্যম জগতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আনিসুল হক: টিভি উপস্থাপক থেকে মেয়র- আনিসুল হক তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও টেলিভিশন উপস্থাপনার মাধ্যমে। পরে ব্যবসায়ী হয়ে উঠলেও তিনি তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় ভুলে যাননি। জনপ্রিয় উপন্যাস, নাটক, কলাম—সবক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সফল। পরবর্তীতে ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র হয়ে জনসেবায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। জুলিয়ান আসাঞ্জ: প্রযুক্তিবিদ থেকে সাংবাদিকতা বিপ্লবী-জুলিয়ান আসাঞ্জ অস্ট্রেলিয়ার একজন প্রযুক্তিবিদ হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেন। পরে তিনি Wikileaks প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব রাজনীতির বহু গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়ে সাংবাদিকতা জগতে বিপ্লব ঘটান। সাংবাদিকতা এবং তথ্যের স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর সাহসী অবস্থান তাকে বিশ্ব ইতিহাসে স্থান দিয়েছে। ওন চার্চিল: সাংবাদিক, লেখক, তারপর রাষ্ট্রনায়ক-ইংল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সার উইনস্টন চার্চিল প্রথম জীবনে ছিলেন যুদ্ধ প্রতিবেদক ও সাংবাদিক। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা, কিউবা ও ভারতের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংবাদ পাঠিয়েছেন। তাঁর লেখালেখি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, পরে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে ব্রিটেন জয় পায়। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—কলম ও নেতৃত্বের শক্তি একসঙ্গে কতদূর যেতে পারে।
থিওডোর রুজভেল্ট: সাংবাদিকতার সঙ্গে রাজনীতির মেলবন্ধন-আমেরিকার ২৬তম প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট সংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠক ও লেখক ছিলেন। তাঁর রাজনীতিক ক্যারিয়ারে সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি ‘মাক্রাকার্স’ নামে পরিচিত অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের কাজকে রাষ্ট্র সংস্কারের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। এরনেস্ট হেমিংওয়ে: যুদ্ধ সাংবাদিক থেকে নোবেলজয়ী সাহিত্যিক-এরনেস্ট হেমিংওয়ে ছিলেন একজন যুদ্ধ সংবাদদাতা, যিনি স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাতে সংবাদ প্রতিবেদন করেছেন। পরবর্তীতে সাহিত্যের জগতে এসে তিনি পুলিৎজার ও নোবেল পুরস্কার জিতে নেন। তাঁর লেখায় বাস্তবতা, সাহস ও কষ্টের গাঢ় চিত্র ফুটে ওঠে—সাংবাদিকতারই প্রভাব।
মেরি কলভিন: এক চোখে বিশ্বদ্রষ্টা সাংবাদিকতা-মেরি কলভিন, ব্রিটিশ সাংবাদিক, ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রের নির্ভীক কণ্ঠ। তিনি শ্রীলঙ্কায় গ্রেনেড হামলায় একটি চোখ হারান, তবুও থেমে থাকেননি। সিরিয়ায় তাঁর শেষ প্রতিবেদন ছিল মানবতার জন্য এক জ্বলন্ত আবেদন। সাংবাদিকতা পেশাকে তিনি কেবল পেশা নয়, দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে সাংবাদিক থেকে নেতৃত্বের উত্থান: কিছু উজ্জ্বল নাম-এম. এ. করিম (ডেইলি আজাদ), তোয়াব খান – যাঁরা সাংবাদিকতার জগতে আভিজাত্য তৈরি করেছেন। তোয়াব খান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রেস সচিব। এসব নেতৃস্থানীয় সাংবাদিক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা রেখেছেন।
সাংবাদিকতা থেকে সাহিত্য, সাহিত্য থেকে নেতৃত্ব—একটি সেতুবন্ধন-এইসব মানুষদের জীবনের একটি সাধারণ ধারা রয়েছে—তাঁরা সবাই সমাজের প্রতিকূল বাস্তবতাকে কলমের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন, আর সেই অবস্থান থেকেই ধীরে ধীরে তাঁরা নেতৃত্বে উঠে এসেছেন। কেউ কেউ কলাম লিখে বদলে দিয়েছেন নীতি, কেউবা মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিপ্লবে। আবার কেউ কেউ প্রশাসনের চাকরি ছেড়ে কলম হাতে তুলে নিয়ে সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন—কী ভুল, কী ঠিক।
কলমই পারে ইতিহাস লিখতে ও নেতৃত্ব গড়তে-সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ পরিবেশনের কাজ নয়, এটি একটি সামাজিক বিপ্লবের সূচনা। যারা সত্যের পক্ষে কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁ