
-মো. কামাল উদ্দিনঃ
একটি শহর কেবল ইট-পাথর, সড়ক কিংবা আলোয় মোড়া স্থাপনার নাম নয়। শহর মানে মানুষের নিরাপত্তা, নির্ভয়ে চলাচল, রাতের নিশ্চিন্ত ঘুম এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাহীন থাকা। যখন এই মৌলিক নিশ্চয়তাগুলো ভেঙে পড়ে, তখন অন্ধকার নেমে আসে শুধু অলিগলিতে নয়—নেমে আসে মানুষের মনোজগতে, চিন্তায়, আচরণে। চট্টগ্রাম সেই অন্ধকার বহুবার দেখেছে।
দেখেছে চাঁদাবাজির দাপট, দেখেছে অস্ত্রের ঝনঝনানি, দেখেছে অপরাধীদের ঔদ্ধত্য—আর দেখেছে আইনের প্রতি অবজ্ঞা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলো একদিন আসবেই। প্রশ্ন শুধু, সেই আলো কে জ্বালায়।আজ চট্টগ্রামে সেই আলোর নাম—পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ। অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে বলা কথা আমি একজন সাংবাদিক হিসেবে প্রায় তিন দশক ধরে অপরাধ, আইনশৃঙ্খলা এবং পুলিশিং কাঠামো খুব কাছ থেকে দেখেছি। অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হিসেবে দেখেছি পুলিশের সীমাবদ্ধতা, আবার দেখেছি কিছু কর্মকর্তার সাহসিকতা কীভাবে একটি এলাকার চিত্র বদলে দেয়। টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে বহু কমিশনারের বক্তব্য শুনেছি—কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় তার প্রতিফলন সবসময় পাইনি। এই অভিজ্ঞতার জায়গা থেকেই আমি বলছি—হাসিব আজিজ কেবল দায়িত্ব পালন করেননি, তিনি একটি সময়কে রূপান্তরিত করেছেন। নেতৃত্ব, যা ফাইলে বন্দী নয়—রাস্তায় লেখা পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে সিদ্ধান্ত দেওয়া কর্মকর্তা নন। তিনি মাঠের মানুষ। পরিস্থিতির পাঠক। অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব বোঝেন চোখে চোখ রেখে। তার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ শুধু আইন প্রয়োগ করছে না একটি দর্শন বাস্তবায়ন করছে। সেই দর্শনের নাম ভয় নয়, আইন। প্রভাব নয়, প্রক্রিয়া। আপস নয়, ন্যায়। এই দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেছে গত দেড় বছরে পরিচালিত ধারাবাহিক অভিযানে। সিএমপি’র বিশেষ চৌকস টিম যে কাজগুলো করেছে, তা কোনো একদিনের সাফল্য নয়—এটি দীর্ঘ প্রস্তুতি, গোয়েন্দা বিশ্লেষণ, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফল। প্রকাশ্য অবস্থান: সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট বার্তা বাংলাদেশের বাস্তবতায় খুব কম পুলিশ প্রধানই প্রকাশ্যে বলেন “চিহ্নিত সন্ত্রাসী অস্ত্র প্রদর্শন করলে দেখামাত্র গুলি করা হবে। সেই গুলির দায় আমি নেব।” এই বক্তব্য নিছক হুমকি ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করার ঘোষণা। এই একটি ঘোষণাই সন্ত্রাসীদের মানসিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সাহস ফিরিয়েছে—কারণ তারা জানে, আইনের সীমার ভেতরে থাকলে নেতৃত্ব তাদের পেছনে দাঁড়াবে। বার্মা সাইফুল: এক ভয়ংকর অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি বায়েজিদ এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী বার্মা সাইফুল—এক সময় যার নাম শুনলেই দোকান বন্ধ হতো, মানুষ রাস্তা বদলাত। ৩৪টি মামলার ভারে জর্জরিত এই অপরাধী দীর্ঘদিন নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবত। ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ঢাকার গুলশান। গোপন সংবাদের নিখুঁত বিশ্লেষণ। মুহূর্তের সিদ্ধান্ত। আর তারপর—আইনের হাতে গ্রেফতার। তার সহযোগী শিহাব উদ্দিনসহ আটক হওয়া মানে কেবল দু’জন মানুষ ধরা পড়া নয়—এটি ছিল অপরাধী চক্রের অহংকারে এক নির্মম আঘাত। স্বর্ণের বার মামলা: উদ্ধার শুধু সম্পদ নয় পাঁচলাইশ থানার স্বর্ণের বার দস্যুতা মামলায় এ পর্যন্ত ১০ জন গ্রেফতার, ২৯টি স্বর্ণের বার উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়—এটি কেবল স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা নয়। এটি মানুষের আস্থা ফেরার গল্প। মানুষ আবার বিশ্বাস করতে শুরু করেছে—অপরাধ করলে পালানোর পথ নেই। সহযোগীদের গ্রেফতার: অপরাধচক্রের শিরদাঁড়া ভাঙা ১৩ জানুয়ারি হিলভিউ এলাকায় গ্রেফতার হয় রিয়াদ হোসেন ও মীর হোসেন ওরফে লিংকন। এরা ছিল অস্ত্র দেখিয়ে চাঁদাবাজির প্রতীক। তাদের গ্রেফতার মানে—অপরাধচক্রের রক্ত সঞ্চালনে ছেদ। অস্ত্র উদ্ধার ও জটিল মামলার রহস্য উদ্ঘাটন এই দেড় বছরে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অসংখ্য চিহ্নিত অপরাধী আটক এবং বহু কঠিন মামলার রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে। যেসব মামলা একসময় ‘অমীমাংসিত’ বলে বিবেচিত ছিল, সেগুলো আজ বিচারিক প্রক্রিয়ায়। কাগজের বাঘ নয়—বাস্তবের রয়েল বেঙ্গল টাইগার হাসিব আজিজ কাগজের বাঘ নন। তিনি বাস্তবের রয়েল বেঙ্গল টাইগার। তার গর্জন নয়—তার উপস্থিতিই অপরাধীদের আতঙ্ক। তিনি রাজনৈতিক ছায়ায় নয়, দাঁড়ান সংবিধানের পাশে। তিনি প্রয়াত আইজিপি আজিজুল হক সাহেবের সন্তান—যিনি ন্যায় ও শৃঙ্খলার প্রতীক ছিলেন। সেই উত্তরাধিকার আজ তার কাজে প্রতিফলিত। পদোন্নতির পরও চট্টগ্রামে থাকা: রাষ্ট্রের বার্তা এডিশনাল আইজিপি পদে পদোন্নতি পেয়েও তাকে জাতীয় নির্বাচনের সময় চট্টগ্রামে রাখা হয়েছে। এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি রাষ্ট্রের আস্থা এবং চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা কঠোর রাখার প্রতিশ্রুতি। ইতিহাসের বিচারে এই সময় একদিন ইতিহাস হবে। তখন লেখা থাকবে—একজন পুলিশ কমিশনার ছিলেন, যিনি পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে এনেছিলেন, অপরাধীদের চোখে ভয় ঢুকিয়েছিলেন, আর সাধারণ মানুষের মনে ভরসা ফিরিয়েছিলেন। সমালোচনা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু অপবাদ সভ্যতার লজ্জা। আজ প্রয়োজন—ভালো কাজের স্বীকৃতি। কারণ, যখন একজন পুলিশ কমিশনার অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়ান—তিনি একা নন। তার পাশে থাকে সমাজের বিবেক। আজ চট্টগ্রামে তাই স্পষ্ট অপরাধ পিছু হটছে, আর আইনের আলো ধীরে ধীরে শহরের প্রতিটি অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ছে।