
মো. কামাল উদ্দিন
আজ ১২ জানুয়ারি। ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে এটি একটি তারিখ মাত্র নয়—এটি একটি ক্ষত, একটি শপথ, একটি অমর চেতনার দিন। আজ সেই দিন, যেদিন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভেবেছিল তারা একজন মানুষকে নিঃশেষ করে দিয়েছে; অথচ বাস্তবে তারা জন্ম দিয়েছিল একটি অবিনাশী আগুনের—মাস্টারদা সূর্য সেন। ১৯৩৪ সালের এই গভীর মধ্যরাতে, নীরব আঁধারের আড়ালে, ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল এক বিপ্লবীকে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল—সূর্য সেন কোনো একক দেহ নন, তিনি একটি যুগ, একটি দর্শন, একটি প্রতিবাদী আত্মার নাম। তাঁকে হত্যা করা গেলেও তাঁর আদর্শকে হত্যা করা যায়নি—আজ ৯২ বছর পরও তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ইতিহাসের মেরুদণ্ড হয়ে। সূর্যকুমার সেন—যাঁকে আমরা ভালোবাসা ও গৌরবে ডাকি মাস্টারদা—জন্মেছিলেন ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ, চট্টগ্রামের রাউজানের নোয়াপাড়া গ্রামে। দারিদ্র্য, অনটন ও অকাল পিতামাতার মৃত্যুর কঠিন বাস্তবতায় বড় হওয়া এই মানুষটির বুকের ভেতর জন্ম নিয়েছিল স্বাধীনতার অদম্য স্বপ্ন। কাকা গৌরমনি সেনের আশ্রয়ে মানুষ হলেও তাঁর মন গড়ে উঠেছিল অন্য এক বিদ্যালয়ে—পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বিদ্যালয়ে।শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন মেধাবী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নীরব নেতৃত্বের প্রতীক। দয়াময়ী উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে চট্টগ্রাম কলেজ—প্রতিটি ধাপে তাঁর প্রতিভা উজ্জ্বল ছিল। ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতির কারণে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হলেও তিনি থেমে যাননি; বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.এ সম্পন্ন করে প্রমাণ করেছিলেন—স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা যায় না। পেশায় তিনি ছিলেন শিক্ষক। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালেই তাঁর শিক্ষা সীমাবদ্ধ ছিল না। গণিত শেখানোর পাশাপাশি তিনি শেখাতেন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সূত্র, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অঙ্ক। তাই সহযোদ্ধারা তাঁকে ডাকতেন “মাস্টারদা”—এই নামই একদিন হয়ে ওঠে উপমহাদেশের বিপ্লবী ইতিহাসের সবচেয়ে দীপ্ত অধ্যায়। বিপ্লবী জীবনে সূর্য সেন ছিলেন আপসহীন। ব্যক্তিগত সুখ তাঁর কাছে ছিল গৌণ। বিবাহ করেছিলেন পারিবারিক চাপে, কিন্তু তিন দিনের মাথায় ফিরে এসেছিলেন আন্দোলনের ময়দানে। ১৯২৬ সালে স্ত্রীর অকালমৃত্যু তাঁকে ভেঙে দেয়নি—বরং আরও দৃঢ়, আরও নির্ভীক করে তুলেছিল। চট্টগ্রামের মাটি তাঁর নেতৃত্বে সাক্ষী হয়েছিল ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের। যুগান্তর দলের সংস্পর্শে এসে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সুসংগঠিত বিপ্লবী কাঠামো। ১৯২৩ সালের টাইগার পাস ও নাগরখানা পাহাড়ের সংঘর্ষ, ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, চার দিনের ইংরেজশাসনমুক্ত চট্টগ্রাম—এসব কেবল ঘটনা নয়, এগুলো ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালির আত্মমর্যাদার ঘোষণা। জালালাবাদ পাহাড়ে দুই ঘণ্টার অসম যুদ্ধে, আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটিশ বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়েছিল বিপ্লবীরা। ১২ জন শহীদের আত্মত্যাগ আর শত্রুপক্ষের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি প্রমাণ করে দিয়েছিল—পরাধীন মানুষের হাতেও ইতিহাস বদলে দেওয়ার শক্তি থাকে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে পটিয়ার দলঘাট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন মাস্টারদা। নির্যাতনের পর নির্যাতন সহ্য করেও তিনি নত হননি। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি, কোনো রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই, কোনো শেষ বক্তব্যের সুযোগ না দিয়ে, মধ্যরাতের নীরবতায় তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন একটাই ফাঁসি কি সূর্য সেনকে শেষ করতে পেরেছিল? না। কারণ সূর্য সেন আজও বেঁচে আছেন চট্টগ্রামের বাতাসে, প্রতিবাদী যুবকদের চোখে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসে। তিনি আছেন প্রতিটি স্বাধীনচেতা মানুষের বিবেকে। আমি একজন সূর্য সেন ভক্ত, আন্দোলন প্রেমী সংগঠক ও লেখক হিসেবে—চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম ও বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের পক্ষ থেকে—আজ তাঁর ৯২তম ফাঁসির দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নত করছি। মাস্টারদা, আপনি নেই—কিন্তু আপনার স্বপ্ন এখনো অসমাপ্ত। আর সেই স্বপ্ন পূরণের দায়—আজ আমাদেরই।

