-মো.কামাল উদ্দিন
রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদই কেবল দায়িত্বের নয়, বরং জনআস্থার এক দৃঢ় প্রতীক। সেই আস্থারই এক নতুন বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশের র্যাব মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগের মধ্য দিয়ে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—বরং সময়ের দাবি, জাতির প্রত্যাশার প্রতিধ্বনি, যেখানে দক্ষতা, সততা ও মননশীলতার এক অনন্য সমন্বয় ঘটেছে। ‘দ্য টুরিস্ট’ ও চট্টলচিত্রের পত্রিকার পক্ষ থেকে আমরা তাঁকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিক অভিনন্দন এবং তাঁর নতুন দায়িত্ব পালনে অগ্রিম শুভকামনা। বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে র্যাব একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বাহিনী। এই বাহিনীর নেতৃত্ব মানে শুধু কঠোরতা নয়, বরং বিচক্ষণতা, মানবিকতা এবং দূরদর্শিতার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা। অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবীব পলাশ সেই ভারসাম্যেরই এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। সাবেক চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যে প্রজ্ঞা, দৃঢ়তা এবং মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা তাঁকে এই উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি উজ্জ্বল দিক হলো তাঁর গভীর বইপ্রেম। বর্তমান সময়ে, যখন প্রযুক্তির প্রভাবে মানুষ ক্রমশ বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা বইকে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন—এটি নিঃসন্দেহে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। গত বছরের এক সকালে চট্টগ্রাম রেঞ্জ কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল। আমি যখন তাঁকে আমার লেখা “সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা” বইটি উপহার দিই, তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তা গ্রহণ করেন। বই হাতে নিয়ে তিনি বলেন—“সবচেয়ে দামী উপহার হচ্ছে বই।” তাঁর এই একটি বাক্য আমার কাছে আজও একটি গভীর জীবনদর্শন হয়ে আছে। তিনি শুধু বই পড়েন না, তিনি বইকে ধারণ করেন। বই তাঁর কাছে জ্ঞানচর্চা, আত্মগঠন এবং চিন্তার প্রসারের এক অবিচ্ছেদ্য মাধ্যম। তিনি বর্তমান প্রজন্মের বইবিমুখতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও আশাবাদীও বটে। তাঁর বিশ্বাস—সঠিক উদ্যোগ, প্রাণবন্ত বইমেলা এবং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে তরুণদের আবার বইমুখী করা সম্ভব। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন আয়োজিত একুশে বইমেলায় তাঁর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বইমেলাকে কেবল কেনাবেচার স্থান হিসেবে নয়, বরং সংস্কৃতি, জ্ঞান ও চিন্তার মিলনমেলা হিসেবে দেখার আহ্বান জানান। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমাজে বইপড়ার সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে। তাঁর জীবনের আরেকটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো বিসিএস পরীক্ষার সময় নিজের নামের সঙ্গে প্রখ্যাত সাহিত্যিক আহসান হাবীবের মিল থাকার কারণে সাহিত্যচর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করা। এই প্রস্তুতি তাঁকে জ্ঞানের প্রতি আরও আগ্রহী করে তোলে এবং তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর কঠোরতা যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি একজন মানুষ হিসেবে তাঁর সংবেদনশীলতা ও কোমলতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লেখক ও পাঠকদের সম্মান করেন, জ্ঞানচর্চাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করেন। তাঁর সেই প্রশ্ন—“আপনি এত লেখা লিখেন কখন?”—শুধু কৌতূহল নয়, বরং একজন সত্যিকারের পাঠকের আন্তরিক আগ্রহের প্রকাশ। আজকের বাংলাদেশ এক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি মননশীলতার সংকটও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবীব পলাশের মতো একজন চিন্তাশীল, সংস্কৃতিমনা ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তার নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর নেতৃত্বে র্যাব শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার শক্তি হিসেবেই নয়, বরং মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও জ্ঞানের আলো ছড়ানো এক আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবেও আরও সমৃদ্ধ হবে। ‘দ্য টুরিস্ট’ পত্রিকার পক্ষ থেকে আমরা আবারও তাঁকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আমরা আশা করি, তাঁর মতো আলোকিত মানুষের নেতৃত্বে সমাজে বইপড়ার সংস্কৃতি আরও প্রসারিত হবে এবং নতুন প্রজন্ম জ্ঞানের পথে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাবে। কারণ, একটি বই শুধু পৃষ্ঠা নয়—এটি একটি দিগন্ত। আর সেই দিগন্তের আলোকবর্তিকা হিসেবে অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবীব পলাশ নিঃসন্দেহে আমাদের সময়ের এক উজ্জ্বল নাম।