—মো. কামাল উদ্দিন
সময়ের স্রোতে কিছু মানুষ নিজেকে শুধু গড়ে তোলেন না, তাঁরা হয়ে ওঠেন এক একটি জীবন্ত দর্শন। তাঁদের জীবনচর্চা, চিন্তা, কর্ম—সবকিছু মিলিয়ে তারা সমাজের সামনে এক আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়ান। রাশেদা আকতার মুন্নী তেমনই এক অনন্য ব্যক্তিত্ব—যিনি নিঃশব্দে, নিরলসভাবে, নিজের মতো করে গড়ে তুলেছেন এক বহুমাত্রিক জীবনগাথা। এই সাক্ষাৎকারভিত্তিক উপস্থাপনায় তাঁর জীবনের ভেতরের আলো-অন্ধকার, সংগ্রাম-সাফল্য, পরিবার-সমাজ—সবকিছুর এক গভীর প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। প্রশ্ন: আপনার শৈশব ও বেড়ে ওঠার গল্পটা জানতে চাই। কোথা থেকে শুরু এই পথচলা?
রাশেদা আকতার মুন্নী: আমার জন্ম মিরসরাইয়ে—একটি শান্ত, সবুজে ঘেরা জনপদে। সেখানেই আমার শৈশব কেটেছে। ছোটবেলা থেকেই পরিবারে শৃঙ্খলা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ শেখানো হতো। হয়তো সেখান থেকেই আমার ভিতটা তৈরি হয়েছে। শৈশবের সেই দিনগুলো আমাকে শিখিয়েছে—জীবনে যত বড়ই হও না কেন, শেকড়কে ভুলে গেলে চলবে না। প্রশ্ন: আপনি এখন শহরের ফয়েজ লেক আবাসিক এলাকায় বসবাস করছেন—এই দুই ভিন্ন জীবনের অভিজ্ঞতা কেমন? রাশেদা: গ্রাম আর শহর—দুটোই আমার জীবনের অংশ। গ্রাম আমাকে দিয়েছে সরলতা, আর শহর দিয়েছে সুযোগ। ফয়েজ লেক এলাকায় নিজের বাড়িতে থাকি, কিন্তু মনটা অনেক সময় মিরসরাইয়ের সেই মাটিতেই পড়ে থাকে।
আমি চেষ্টা করি, এই দুই অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে ধারণ করতে—যেন আধুনিকতার ভেতরেও শেকড়ের গন্ধ থাকে।
প্রশ্ন: একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার যাত্রা কিভাবে শুরু হলো? রাশেদা: আসলে শুরুটা খুব সহজ ছিল না। সমাজে তখনও নারীদের ব্যবসায়িক অংশগ্রহণ খুব বেশি স্বাভাবিক ছিল না। অনেকেই প্রশ্ন তুলত, সন্দেহ করত। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম—নিজের ওপর আস্থা থাকলে কোনো বাধাই স্থায়ী নয়। ধীরে ধীরে আমি তিনটি তেলের পাম্প পরিচালনার দায়িত্ব নেই। পাশাপাশি কৃষি খামারেও যুক্ত হই। এই পথচলায় আমি শিখেছি—সাফল্য মানে শুধু লাভ নয়, বরং দায়িত্বের সঠিক বাস্তবায়ন।
প্রশ্ন: এত বড় পরিসরের ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন? রাশেদা:
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানসিকতা। একজন নারী হিসেবে আমাকে বারবার প্রমাণ করতে হয়েছে—আমি পারি। অনেক সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে আমি কখনো আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সততা আর পরিশ্রম—এই দুই জিনিস আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। প্রশ্ন: আপনার পারিবারিক জীবন নিয়ে কিছু বলুন। একজন গৃহিণী হিসেবে আপনার দর্শন কী? রাশেদা: সংসার আমার কাছে শুধু দায়িত্ব নয়—এটা আমার ভালোবাসার জায়গা। আমি বিশ্বাস করি, একজন নারীর শক্তি তার পরিবার থেকেই আসে। আমার ছেলে উচ্চশিক্ষা অর্জন করছে—এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি, তাকে শুধু শিক্ষিত নয়, একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে।
প্রশ্ন: আপনি সমাজসেবার সাথেও গভীরভাবে জড়িত—এই প্রেরণা কোথা থেকে আসে? রাশেদা: মানুষের কষ্ট আমাকে সবসময় নাড়া দেয়। আমি যখন দেখি কেউ অভাবে আছে, তখন মনে হয়—আমার কিছু করা উচিত। আমি নিয়মিত গরীব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। আত্মীয়-স্বজনদের মাঝেও আমি খুব কাছের একজন মানুষ হতে চাই—যে শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের জন্যও বাঁচে। প্রশ্ন: আপনি বিভিন্ন সংগঠন, বিশেষ করে লায়ন্স ক্লাবের সাথে যুক্ত—এই অভিজ্ঞতা আপনার জীবনে কী পরিবর্তন এনেছে? রাশেদা: এই সংগঠনগুলো আমাকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছে। এখানে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি—সমাজ পরিবর্তন একা সম্ভব নয়, এটি সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। লায়ন্স ক্লাবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি গর্বিত। এটি আমার দায়িত্ববোধকে আরও গভীর করেছে। প্রশ্ন: আপনি একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবেও পরিচিত—এই দিকটি নিয়ে কিছু বলুন। রাশেদা: শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি এগোতে পারে না। আমি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলাম এবং এখনও সুযোগ পেলেই শিক্ষামূলক কাজে অংশ নিই। আমি চাই, আমাদের নতুন প্রজন্ম শুধু ডিগ্রি অর্জন না করে—মানবিক মূল্যবোধেও সমৃদ্ধ হোক। প্রশ্ন: আপনার ব্যক্তিত্বের একটি বড় দিক হলো সরলতা ও মানবিকতা—এটা কীভাবে ধরে রাখেন?
রাশেদা: আমি কখনো নিজেকে বড় কিছু ভাবি না। আমি বিশ্বাস করি, মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে থাকাটাই সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমার আচার-আচরণ, কথাবার্তা—সবকিছুতেই আমি চেষ্টা করি সাধারণ থাকতে। কারণ, সাধারণের মাঝেই অসাধারণত্ব লুকিয়ে থাকে। প্রশ্ন: আপনার পোশাক ও জীবনধারায় একটি রক্ষণশীলতা ও আধুনিকতার সমন্বয় দেখা যায়—এটি কীভাবে সম্ভব হয়েছে? রাশেদা: আমি মনে করি, আধুনিক হওয়া মানে নিজের সংস্কৃতি ত্যাগ করা নয়। আমি আমার ধর্মীয় মূল্যবোধকে সম্মান করি, এবং সেই অনুযায়ী জীবনযাপন করার চেষ্টা করি। একই সঙ্গে আমি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতেও বিশ্বাস করি। এই দুইয়ের সমন্বয়ই আমার জীবনের দর্শন। প্রশ্ন: একজন নারী হিসেবে সমাজের অন্য নারীদের জন্য আপনার বার্তা কী?
রাশেদা: আমি শুধু একটাই কথা বলতে চাই—নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন। আপনি যদি সত্যিই কিছু করতে চান, তাহলে কোনো বাধাই আপনাকে থামাতে পারবে না। নারীরা দুর্বল নয়—তারা শুধু নিজেদের শক্তিকে অনেক সময় চিনতে পারে না।
শেষকথা: এক অনন্য আলোর নাম রাশেদা আকতার মুন্নীর জীবন যেন এক নিঃশব্দ বিপ্লব। তিনি উচ্চকণ্ঠ নন, কিন্তু তাঁর কাজ কথা বলে। তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে চান না, কিন্তু তাঁর অবদান তাঁকে আলোকিত করে রাখে।
একজন নারী—যিনি একই সঙ্গে সংসারের মমতা, ব্যবসার দৃঢ়তা, সমাজসেবার মানবিকতা এবং শিক্ষার আলোকবর্তিকা বহন করেন—তিনি নিঃসন্দেহে আমাদের সময়ের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। তার জীবন আমাদের শেখায়— সাফল্য মানে শুধু নিজের জন্য বাঁচা নয়, বরং অন্যদের জীবনেও আলো ছড়িয়ে দেওয়া। রাশেদা আকতার মুন্নী—একটি নাম নয়, একটি অনুপ্রেরণা।