
আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী ১৮ জনের সমস্যা শুনে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা; অসহায়দের আর্থিক সহায়তা, ২১ পরিবার পেল ত্রাণ চট্টগ্রাম: জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি কক্ষ। কেউ চোখের জল লুকোচ্ছেন, কেউ বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিজের জীবনের গল্প বলছেন। কারও স্বামী এক বছর ধরে সমুদ্রে নিখোঁজ, কারও ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে ভেসে গেছে, কেউ ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ছেন, কেউ কিডনি জটিলতায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। আবার কেউ অর্থাভাবে কলেজে ভর্তি হয়েও বই-ড্রেস কিনতে পারছেন না, কারও কাছে নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার ভাড়াটুকুও নেই। এমন অসংখ্য অসহায় মানুষের কান্না, আবেদন আর শেষ আশ্রয়ের জায়গা হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সাপ্তাহিক গণশুনানি। মানবিক জেলা প্রশাসক হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা একে একে সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, সান্ত্বনা দেন এবং অধিকাংশ সমস্যার ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। বুধবার (২২ জুলাই) অনুষ্ঠিত এই গণশুনানিতে চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ১৮ জন সেবাপ্রত্যাশী তাঁদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সংকট তুলে ধরেন। প্রতিটি আবেদন শুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। পাশাপাশি কয়েকটি অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করে আবেদনকারীদের ফলাফল জানাতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়। গণশুনানিতে সাতজন অসহায় ব্যক্তি ও একজন শিক্ষার্থীকে নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়া ২১টি পরিবারকে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, মরিচ, হলুদ ও ধনিয়াগুঁড়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
নিখোঁজ স্বামীর অপেক্ষায়, দুই সন্তান নিয়ে অসহায় এক মায়ের আর্তনাদ
মোসাম্মৎ মাইনা খাতুনের স্বামী আজাদ প্রায় এক বছর আগে ট্রলারে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন। আজও তিনি জানেন না, তাঁর স্বামী বেঁচে আছেন নাকি আর কখনো ফিরবেন না। দুই ছোট সন্তানের দায়িত্ব এখন তাঁর একার কাঁধে। এরই মধ্যে তিনি নিজেও স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। নিয়মিত চিকিৎসা কিংবা ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই। গণশুনানিতে তিনি সন্তানদের ভরণ-পোষণ, নিজের চিকিৎসা এবং নিখোঁজ স্বামীর সন্ধানে প্রশাসনিক সহযোগিতা কামনা করেন। তাঁর কথা শুনে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
বন্যায় ঘরহারা পরিবার পেল পুনর্বাসনের আশ্বাস
বাঁশখালীর ইলশা গ্রামের রেয়াজুল জান্নাত রাহাত জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় তাঁদের বাড়িতে পাঁচ থেকে ছয় ফুট পানি ওঠে। এতে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় কাঁচা বসতঘর, নষ্ট হয়ে যায় কৃষিজমির ফসল। তাঁর বাবা রেয়াজ আহামদ দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রোকে আক্রান্ত ও শারীরিকভাবে অক্ষম। বর্তমানে পরিবারটি অস্থায়ী আশ্রয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বিষয়টি শুনে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক সহায়তা দেন এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত শাহাজাহানের চিকিৎসায় সহায়তা
বোয়ালখালীর পশ্চিম শাকপুরার মো. শাহাজাহান দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয় বহন করা তাঁর পরিবারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না।তাঁর অসহায় অবস্থার কথা বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসক চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
অর্থাভাবে থমকে যাওয়া শিক্ষাজীবনে নতুন আশা
বাঁশখালীর মিনজিরিতলার মিফতাহুল জান্নাত রিয়া সরকারি সিটি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। ২০১৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে। সাম্প্রতিক বন্যায় তাঁদের বসতঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থের অভাবে বই, কলেজ ড্রেস ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কিনতে না পারায় তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি শুনে জেলা প্রশাসক তাঁকে বিশেষ আর্থিক অনুদান প্রদান করেন, যা তাঁর শিক্ষাজীবন চালিয়ে যেতে নতুন আশা জাগিয়েছে।
ক্যান্সার আক্রান্ত কর্মচারীর পাশে জেলা প্রশাসন
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আরএম শাখার অফিস সহায়ক নিলুফার ইয়াসমিন কয়েক বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন কন্যা ও এক পুত্রকে নিয়ে সংগ্রাম করছেন তিনি।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং ঢাকায় পিইটি স্ক্যানসহ ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে আরও প্রায় তিন লাখ টাকার প্রয়োজন। তাঁর আবেদন বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসক আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
অস্ত্রোপচারের অর্থ পেলেন দুর্ঘটনায় আহত যুবক
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ মোহাম্মদ আবু কাউছারের ডান পায়ের গোড়ালির হাড় সড়ক দুর্ঘটনায় ভেঙে যায়। চিকিৎসা করাতে গিয়ে তাঁর সব সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে চিকিৎসা থমকে ছিল।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির এমন দুর্দশার কথা শুনে জেলা প্রশাসক তাঁর চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেন।
বাড়ি ফেরার ভাড়াও ছিল না, সহায়তা পেলেন শফিকুল
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মো. শফিকুল ইসলাম জীবিকার সন্ধানে চট্টগ্রামে এসে কোনো কাজ পাননি। একপর্যায়ে তাঁর কাছে দৈনন্দিন খরচ কিংবা নিজ জেলায় ফিরে যাওয়ার ভাড়াটুকুও ছিল না। জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করলে তাঁকে দিনাজপুরে ফেরার প্রয়োজনীয় গাড়িভাড়া প্রদান করা হয়।
প্রবাসীদের অভিযোগও শুনলেন জেলা প্রশাসক
একই দিনে জেলা প্রশাসক প্রবাসীদের জন্য অনলাইন গণশুনানির আয়োজন করেন। এতে এক প্রবাসী তাঁর পারিবারিক জমিজমা জবরদখলের অভিযোগ তুলে ধরেন। অভিযোগ শুনে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
আবেদন নয়, আস্থার ঠিকানা
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানি এখন আর কেবল আবেদন গ্রহণের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; এটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায়। কেউ ফিরেছেন চিকিৎসার অর্থ হাতে নিয়ে, কেউ পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সাহস নিয়ে, কেউ নতুন ঘর তৈরির আশ্বাস নিয়ে, আবার কেউ নিজের বাড়ি ফেরার ভাড়া নিয়ে। হয়তো একটি দিনের সহায়তায় জীবনের সব সংকট দূর হয় না। কিন্তু অসহায় মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাঁদের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাৎক্ষণিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে গেছে—রাষ্ট্রের দরজা এখনও সাধারণ মানুষের জন্য খোলা, আর সেই দরজায় মানবিকতার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।


