-বিপ্লব বিজয়ঃ
দেশে জ্বালানি খাতের যে কোনো সংকট শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। বর্তমানে চলমান এলপিজি সংকট সেই বাস্তবতারই নির্মম উদাহরণ। এই সংকট শুধু একটি জ্বালানির অভাব নয়—এটি পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা একটি সম্ভাবনাময় শিল্প, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা এবং লক্ষ মানুষের জীবিকা ও যাত্রীসেবাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এলপিজি অটোগ্যাস আজ সিএনজি, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে স্বীকৃত। কম খরচে, সহজলভ্য এবং পরিবেশের জন্য তুলনা মূলক ভাবে নিরাপদ হওয়ায় সরকার নিজেই যানবাহনে এলপিজি ব্যবহারে উৎসাহ দিয়েছে। সেই নীতিগত সহায়তার ফলেই সারাদেশের ৬৪ জেলায় প্রায় এক হাজার এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন গড়ে উঠেছে এবং প্রায় দেড় লক্ষ যানবাহন এলপিজিতে কনভার্ট হয়েছে। এই পুরো ব্যবস্থাপনার পেছনে রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ, বিপুল কর্মসংস্থান এবং সরকারের নিজস্ব অনুমোদন ও লাইসেন্স। কিন্তু আজ সেই শিল্প কার্যত অচল। এলপিজির তীব্র সংকটে দেশের অধিকাংশ অটোগ্যাস স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও গ্যাস নেই, কোথাও সীমিত পরিমাণে থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় অতি নগণ্য। ফলে এলপিজিচালিত যানবাহনের মালিকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশন থেকে স্টেশনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তবু গ্যাস পাচ্ছেন না। অনেক গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকছে, যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, অফিসগামী মানুষ দেরিতে পৌঁছাচ্ছেন, রোগীবাহী গাড়ি পর্যন্ত সংকটে পড়ছে। এই ভোগান্তির শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই সংকট কোনোভাবেই অযৌক্তিক চাহিদার কারণে সৃষ্টি হয়নি। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে যানবাহন খাতে ব্যবহৃত হয় মাত্র ১৫ হাজার মেট্রিক টন, অর্থাৎ মোট ব্যবহারের প্রায় ১০ শতাংশ। এত সামান্য পরিমাণ গ্যাসের যোগান নিশ্চিত করতে না পারার কারণে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প ধ্বংসের মুখে এটি শুধু ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাই নয়, নীতিগত উদাসীনতারও প্রতিফলন। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন মালিকরা। ব্যাংক ঋণ, জায়গা ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়—সবই চলছে, কিন্তু বিক্রি নেই। দিনের পর দিন স্টেশন বন্ধ থাকায় তারা আর্থিকভাবে দেউলিয়া হওয়ার পথে। একই সঙ্গে ক্ষতির মুখে পড়ছেন এলপিজিচালিত গাড়ির মালিকরা, যারা সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজেদের যানবাহন রূপান্তর করেছিলেন। আজ তারা বাধ্য হচ্ছেন ব্যয়বহুল জ্বালানির দিকে ফিরে যেতে অথবা গাড়ি বসিয়ে রাখতে। এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে। একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য ব্যাহত হবে, অন্যদিকে দেশের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে, যা সরাসরি দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার খরচে প্রভাব ফেলবে। এলপিজি অটোগ্যাস খাত ধ্বংস হয়ে গেলে ভবিষ্যতে কেউ আর বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না—এটি বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্রের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এই বাস্তবতায় চট্টগ্রাম বিভাগ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ওনার্স এসোসিয়েশন জনস্বার্থে সরকারের কাছে কিছু সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত দাবি জানাচ্ছে। প্রথমত, এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোকে অটোগ্যাস খাতের চাহিদা অনুযায়ী নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনা প্রয়োজন। অটোগ্যাস খাতকে যেন গৃহস্থালি বা অন্য খাতের তুলনায় অবহেলিত না করা হয়। দ্বিতীয়ত, এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রশাসনিক জটিলতা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও নীতিগত অস্পষ্টতা দ্রুত দূর করতে হবে। সুলভমূল্যে এবং সময়মতো এলপিজি আমদানি নিশ্চিত করা না গেলে এই সংকট কখনোই কাটবে না। তৃতীয়ত, অপারেটরের মাধ্যমে এলপিজি আমদানির ওপর আরোপিত সীমা (লিমিট) অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। সক্ষম অপারেটরদের অতিরিক্ত আমদানির সুযোগ না দিয়ে পুরো বাজারকে সংকটে ফেলা কোনো যুক্তিসঙ্গত নীতি হতে পারে না। আমদানি ব্যবস্থা উন্মুক্ত ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। চতুর্থত, দেশে যেসব অপারেটরের এলপিজি স্টোরেজ রয়েছে কিন্তু তারা আমদানি করতে পারছে না, সেই স্টোরেজ ব্যবহার করে যোগ্য অন্য আমদানিকারকদের এলপিজি আমদানির সুযোগ দিতে হবে। অব্যবহৃত অবকাঠামোকে কাজে লাগানোই সংকট উত্তরণের সবচেয়ে দ্রুত পথ। পঞ্চমত, এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন স্থাপনে বিদ্যমান সরকারি কর, ফি ও লাইসেন্স সংক্রান্ত জটিলতা কমাতে হবে। বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ, সময়বদ্ধ ও সমন্বিত করা জরুরি। এলপিজি অটোগ্যাস খাত কোনো গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়—এটি পরিবেশ, অর্থনীতি ও জনস্বার্থের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই খাত রক্ষা মানে শুধু একটি শিল্প বাঁচানো নয়, বরং ভবিষ্যতের টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করা। অতএব, সময় নষ্ট করার আর কোনো সুযোগ নেই। সরকারের নীতিনির্ধারকদের এখনই বাস্তবতা অনুধাবন করে সাহসী ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এলপিজি অটোগ্যাস সংকট নিরসনে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতেই হবে—আজই,