
– মো. কামাল উদ্দিন
আজ ১৫ নভেম্বর ২০২৫, শনিবার সকালে চট্টগ্রাম চেরাগী পাহাড়স্থ লুসাই হলে অনুষ্ঠিত হলো মহাকবি আল্লামা ইকবাল ও কবি বাহাদুর শাহ জাফর (রাহ:) স্মরণে এক বৈশিষ্ট্যময় সাহিত্যিক আলোচনা সভা। চট্টগ্রামের সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে এমন গভীর ভাবনার আয়োজন বহুদিন পর দেখা গেল। প্রভাতের নরম আলো যেন আজকের এই অনুষ্ঠানকে আরও পবিত্র করে তুলেছিল। কবি মাহমুদুল হাসান নিজামী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। আমি—সাদা কালো মাল্টিমিডিয়া নিউজ হাউজের পক্ষ থেকে—প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত থেকে দুই মহাকবির জীবন, দর্শন ও সাহিত্যগৌরব নিয়ে আমার বক্তব্য উপস্থাপন করি। বক্তৃতার শুরুতে আমি বলেছি—“ইকবাল ও শাহ জাফর কেবল দুই জন কবি নন; তাঁরা দুই ভুবনের দুই দীপশিখা। একজন চিন্তার মুক্তিসংবাদদাতা, অন্যজন ব্যথায় দীর্ণ আত্মার অবিনশ্বর স্বর। ইকবাল আমাদের আত্মাকে শিখিয়েছেন উড়তে, আর শাহ জাফর শিখিয়েছেন কষ্টকে শব্দে রূপান্তরিত করার অনন্ত শক্তি।” আমার আলোচনার মূল বক্তব্যে আমি তিনটি বিষয় তুলে ধরেছি— আল্লামা ইকবালের চিন্তাজগত: আত্মমর্যাদার আহ্বান- ইকবালের কবিতা মানুষের আত্মার ভেতর দীপ্তির জন্ম দেয়। তাঁর “শিকারি ও ফুল” কিংবা “খুদিকে কর বুলন্দ এতনা…”—এসব পংক্তি আজও আমাদের ভিতরে জাগায় নতুন আত্মবিশ্বাস। ইকবাল শিখিয়েছেন, মানুষের ভেতরের ‘খুদি’ই তার আসল শক্তি; যে জাতি নিজেকে চিনতে পারে না, সে জাতি কখনোই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। আজকের অস্থির সময়ে ইকবালের দৃষ্টি-শক্তি আরও প্রয়োজন—কারণ তিনি মানুষকে আত্মমর্যাদা, মূল্যবোধ এবং সৃষ্টিশীলতার পথে আহ্বান করেছিলেন।
বাহাদুর শাহ জাফর (রাহ:)—ব্যথার রাজপথের শেষ সম্রাট-শাহ জাফর ছিলেন এক বিষাদসিংহাসনে বসা কবি। দিল্লির শেষ সম্রাট হয়েও তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে বন্দিত্ব, অপমান আর অশেষ দুঃখে। তবুও সেই অন্ধকার রাত্রিতে তিনি লিখেছিলেন— “কি কহিয়ো মোহাম্মদ সে জাফর, মরিয়ে কর জউঙ্গা কাফন কা”,যেখানে নিজেকে সমর্পণ করেছেন জীবনের সমস্ত যন্ত্রণার কাছে। জাফরের কবিতা শেখায় বিনম্রতা, ধৈর্য ও অন্তর্গত সত্যের প্রতি অবিচল থাকা। দুই মহান কবির সাহিত্য-ঐতিহ্য নবীন প্রজন্মের জন্য এক চিরন্তন দিশা ইকবাল আমাদের শেখান আত্মোন্নয়ন, আর জাফর শেখান আত্মসমর্পণ—এই দুইয়ের মিলনেই তৈরি হয় মানুষের পূর্ণ মানবিকতা। নতুন প্রজন্ম যদি এই দুই কবির সাহিত্যকে ধারণ করতে পারে, তবে তারা নিজের ভেতরের সত্যকে উন্মোচন করতে শিখবে।
আজকের অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ, আলোচনা এবং সাহিত্য-ভাবনার যে স্রোতধারা বহেছে, তা চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে সমৃদ্ধ করবে। আয়োজক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিনকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি বলেছি—“সাহিত্য কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; সাহিত্য এক আলোকিত ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তি। ইকবাল ও শাহ জাফর আমাদের সেই শক্তির পথ দেখান।” সমাপনীর সময় আমি সবাইকে অনুরোধ করেছি— “চলুন আমরা মহান কবিদের স্মৃতি থেকে নতুন আলো ধার করি। আমাদের সময়, সমাজ ও ভবিষ্যৎ—সবকিছুই আজ সাহিত্যিক মূল্যবোধের নতুন পুনর্জাগরণ দাবি করে।”ইকবাল: আত্মজাগরণের কবি ১৮৭৭ সালে ৯ নভেম্বর জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ ইকবাল ছিলেন কেবল কবি নন—একজন দার্শনিক, একজন আত্মজাগরণের গুরু, একজন চিন্তার অভিযাত্রী। তার সাহিত্যিক যাত্রার মূল প্রেরণা ছিল মানুষের আত্মশক্তিকে জাগিয়ে তোলা। তিনি বিশ্বাস করতেন—একজন মানুষ নিজের সামর্থ্য ও মর্যাদা চিনে না নিলে কোনো জাতিই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। স্বকীয়তার ধারণা: ইকবালের কবিতায় বারবার ফিরে আসে মানুষের আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও সম্ভাবনার কথা। তার দর্শনের মূল কথা— মানুষকে এমন শক্তিমান হতে হবে যে ভাগ্যের চেয়ে মানুষই তার ভবিষ্যৎ গড়ে নেবে। পূর্ব ও পশ্চিমের জ্ঞানের সমন্বয়: ইকবাল পূর্বের আধ্যাত্মিকতা ও পশ্চিমের যুক্তিবাদের মাঝে এক অপূর্ব সেতুবন্ধন নির্মাণ করেছিলেন। তার রচনায় জ্ঞান, বিশ্বাস, যুক্তি, শক্তি—এই চারটি উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য জাগরণের দর্শন। রচনা ও অবদান: রহস্যে স্বকীয়তা স্বকীয়তার বাইরে পূর্বের ডাক,জ্ঞানের ডানা,কালিমের আঘাত,শিশুকণ্ঠে আজও প্রতিধ্বনিত সেই চিরপরিচিত প্রার্থনা—“ঠোঁটে ফুটুক সেই প্রার্থনা, যা হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা।” ইকবাল কেবল কবি ছিলেন না—একটি জাতির আত্মপরিচয়ের স্থপতিও ছিলেন। জাফর: নিঃসঙ্গতার সুর ও বেদনাবিদ্ধ কাব্য-বাহাদুর শাহ জাফর—মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট, তবে ইতিহাসে বেশি পরিচিত কবি হিসেবে। ১৮৩৭ সালে সিংহাসনে বসার পর থেকেই তার জীবনের পথ ছিল সংগ্রাম ও সংকটের। সাম্রাজ্যের ক্ষমতা তখন প্রায় লুপ্ত, ব্রিটিশ শক্তির চাপ বেড়ে গেছে, কিন্তু জাফরের হৃদয় ছিল সঙ্গীত, কবিতা ও মানবিকতার আলোয় উজ্জ্বল। দেশপ্রেম ও পতনের সাক্ষী: ১৮৫৭ সালের সংগ্রাম যখন শুরু হয়, তখন জাফর ছিলেন বৃদ্ধ ও দুর্বল। তবুও বিদ্রোহীরা তার মধ্যেই খুঁজে পান আশার প্রতীককে। তিনি সেই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন, যদিও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। ব্যর্থতার পর তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয় দূর রাঙুনে—যেখানে তার জীবনের শেষ অধ্যায় কাটে নিঃসঙ্গতা ও অনাদরে। জাফরের কবিতার বেদনা: নির্বাসনের ঘরে বসে জাফর লেখেন মানুষের হৃদয়ের গভীর ব্যথা ও বিষাদের কথা। তার কবিতা ভরপুর—নিঃসঙ্গতা,বেদনার আর্তি,সময়ের নিষ্ঠুরতা,বিচ্ছেদের অশ্রু,এক বিখ্যাত কবিতায় তিনি বলেছেন— “এই উজাড় পৃথিবীতে হৃদয় আর টেকে না; নশ্বর এই দুনিয়ায় কারই বা কিছু স্থায়ী হয়?” আর এক স্থানে তার বেদনার চূড়ান্ত উচ্চারণ—“কী দুর্ভাগা এই জাফর! মৃত্যুর পর দাফনের মতো সামান্য দুই হাত জমিও তার নিজের দেশে জুটল না।”একজন সম্রাটের শেষ কথায় এমন দুঃখ, সত্য ও মানবিকতা—ইতিহাসে বিরল। দু’টি জীবন, দু’টি পথ—এক অনন্ত শিক্ষাইকবাল মানুষকে সামনে তাকাতে শেখান, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখান, বিশ্বাসের আলোয় ভবিষ্যৎ গড়তে শেখান। জাফর শেখান— জীবনের পতনেও সৌন্দর্য থাকে, বেদনার ভেতরেও সত্য থাকে, শিল্পের ভেতরেই অমরত্ব লুকিয়ে থাকে। একজন জাগরণের কবি, অন্যজন বেদনার কবি। কিন্তু দুজনই মানুষের আত্মাকে আলো দেখান। আজকের প্রজন্মের জন্য শিক্ষা:আত্মবিশ্বাসই মানবশক্তির মূল—ইকবালের শিক্ষা। পতনেও মানুষ মর্যাদাহীন হয় না—জাফরের শিক্ষা।
সাহিত্যই মানুষের বিবেকের আলো। ইতিহাস ভুলে গেলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যায়। মহামানব মোহাম্মদ ইকবাল এবং সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর— ভিন্ন পথের যাত্রী হলেও দুজনের আলো একই স্থানে এসে মেশে— মানুষের আত্মাকে জাগিয়ে তোলা, সত্যকে রক্ষা করা, এবং সময়ের অন্ধকারে মানুষের হাতে আলোর প্রদীপ তুলে দেওয়া। তাদের জীবন আমাদের শেখায়— ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী হলেও চিন্তা ও কবিতা চিরস্থায়ী। মানুষের আত্মশক্তি আর বেদনাবিধুর সত্য—এই দুই শক্তি মিলেই গড়ে ওঠে ইতিহাসের নতুন আলো।

