বিদেশে পড়াশোনা করার জন্য অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে আবেদন করেন, কখনও স্কলারশিপও পান। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভিসা না পাওয়া কারণে অনেকেই যেতে পারেন না। এরকম একজন তানজুমান আলম ঝুমা। তিনি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে হাঙ্গেরি ও যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে চেষ্টা করেছেন এবং স্কলারশিপও পেয়েছেন। তবে শুধু ভিসার জটিলতার কারণে তিনি দুই দেশেই যেতে পারেননি। তানজুমান আলম ঝুমা বলেন, “অক্টোবরে বুদাপেস্টে আবেদন করি। জানুয়ারিতে তা ‘নো’ হয়। পরে জানুয়ারিতে ইউএসের জন্য আবেদন করি। প্রায় এক বছর এই প্রক্রিয়ায় লেগেছে।” শুধু শিক্ষার্থী ভিসিই নয়, অনেক দেশেই পর্যটক, ব্যবসায়ী বা শ্রমিক ভিসাও সহজে মিলছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও, যেখান থেকে আগে সহজে ভিসা পাওয়া যেত, এখন অনেক ক্ষেত্রে দিচ্ছে না। ভারত ছাড়া প্রায় কোনো দেশে বাংলাদেশের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, অনিয়মিতভাবে ভিসার সুযোগ ব্যবহার করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। পাশাপাশি, বিদেশে রাজনৈতিক দল সমর্থকদের জড়িত বিবাদ দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাসপোর্টের র্যাঙ্কিংয়ের পতনও ভিসা প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, সমস্যার সমাধানের জন্য দেশের ভেতরে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া এবং কূটনৈতিকভাবে উদ্যোগী হওয়া জরুরি। **কোন দেশগুলো ভিসা দিচ্ছে না?** কয়েকটি দেশে, বিদেশে পড়াশোনা, কাজ বা ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশিদের ভিসা সহজে মিলছে না। ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান জানিয়েছেন, “ইন্ডিয়া, ইউএই, কাতার, বাহরাইন, ওমান, উজবেকিস্তান, সৌদি আরব, ভিয়েতনাম — এই সব দেশ এখন ভিসা দিচ্ছে না। থাইল্যান্ডের ভিসা প্রক্রিয়া দীর্ঘ, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার ভিসার রেশিও কম, ফিলিপাইনে সময় বেশি লাগে, ইন্দোনেশিয়ার ভিসা ফি অনেক, আর শ্রীলঙ্কার ইলেকট্রনিক অ্যারাইভাল ভিসাতেও দুই-তিন দিন সময় লাগে।” ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতের গণঅভ্যুত্থানের পর ভারত বাংলাদেশিদের পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয়। ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার অনেক দেশ থেকেও ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতগুলো দেশের ভিসার জটিলতা সাময়িক। যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর লাখ লাখ ভিসা দেয়, কিন্তু এবছর দুই লাখের বেশি নয়। **কেন ভিসা দেওয়া হচ্ছে না?** অনেকেই দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে কারণ হিসেবে মনে করেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত অনিয়মিতভাবে ভিসা ব্যবহার এবং সহজলভ্য দেশের ভিসা নিয়ে অন্য দেশে যাওয়া প্রবণতা সমস্যার মূল। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, “ভিসার সুযোগ অনিয়মিতভাবে ব্যবহার করার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিছু অসৎ ব্যবসায়ী ভ্রমণ ভিসা নিয়ে শ্রমিক ভিসায় পরিবর্তন করছে। প্রতিবেশী দেশের ভিসা নিয়ন্ত্রণও সতর্কতা বাড়িয়েছে। ফলে অল্প সংখ্যক মানুষের অনিয়মের কারণে অনেকই ভোগান্তিতে পড়ছে।” বিদেশে প্রকাশ্যে কোন্দল বা বিবাদে জড়ানোও দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাসপোর্টের র্যাঙ্কিং কমে যাওয়াও সমস্যা বাড়াচ্ছে। হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পাসপোর্ট বিশ্বের দুর্বলতম পাসপোর্টের তালিকায় সপ্তম। **সমাধানের পথ** গত বছর ভারতের ভিসা সীমিত থাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের ভিসা সেন্টার দিল্লি থেকে অন্য দেশে সরানোর অনুরোধ করা হয়। পরে ঢাকা থেকে ৯ দেশের ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হলেও জটিলতা কমেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধান ছাড়া সম্ভব নয়। তবে অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যারা অনিয়মিতভাবে বিদেশে যাচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ভিসা জটিলতা কমানো সম্ভব। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মন্তব্য করেন, “দেশের ভেতরে সঠিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নিলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।”