নুরুল আজিম- ঢাকাঃ
একটি সমাজ তখনই সভ্যতার দাবিদার হতে পারে, যখন সে তার সৎ, মানবিক ও নিবেদিত মানুষদের রক্ষা করতে পারে। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সেই জায়গায় আছি? নাকি আমরা এমন এক অদ্ভুত নীরবতার ভেতরে ঢুকে পড়েছি, যেখানে অন্যায় চোখের সামনে ঘটলেও রাষ্ট্রের যন্ত্রগুলো নিশ্চুপ থাকে? রাজধানীর শ্যামলীতে প্রতিষ্ঠিত কিডনি চিকিৎসা কেন্দ্র—যেখানে প্রতিদিন গ্রামের অসহায় মানুষ নতুন জীবনের আশায় আসে—সেই মানবিক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যে মানুষটি বছরের পর বছর ধরে “গরীবের ডাক্তার” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, যার হাসপাতাল ব্যবসার চেয়ে সেবাকেই অগ্রাধিকার দেয়—তাঁকেই এখন চাঁদাবাজদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অভিযোগটি শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, এটি একটি চক্রের প্রতিচ্ছবি। মঈন উদ্দিন নামের একজন ব্যক্তি, যিনি নিজেকে রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত করে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন—তার সাহস কোথা থেকে আসে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের গভীরে তাকাতে হবে। অধ্যাপক কামরুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ব্যক্তি একসময় হাসপাতালের খাদ্য সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত দাম দাবি করায় তাকে বাদ দেওয়া হয়। এখানেই শুরু হয় সংঘাতের মূল। অর্থাৎ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার “অপরাধেই” একজন চিকিৎসক আজ হুমকি ও চাঁদাবাজির শিকার। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট— যেখানে সততা থাকে, সেখানেই দুর্নীতির সঙ্গে সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এই সংঘর্ষে রাষ্ট্র কার পাশে দাঁড়াবে? এই প্রশ্নের উত্তরই আজ সবচেয়ে জরুরি। অধ্যাপক কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি স্থানীয় থানা থেকে শুরু করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পর্যন্ত বিষয়টি অবহিত করেছেন। এমনকি ডিআইজি ও অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়েও অভিযোগ গেছে। কিন্তু এক মাসেরও বেশি সময় পার হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই নীরবতা কেবল দুঃখজনক নয়, এটি ভীতিকর।
কারণ, আইনের নীরবতা অপরাধীর শক্তি বাড়ায়। একজন সাধারণ নাগরিক যদি থানায় অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার না পান, তাহলে তিনি হতাশ হন—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক, রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত একজন সেবক, যদি একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তবে তা পুরো ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তোলে। এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার। যদিও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি তাদের কেউ নন—তবুও বাস্তবতা হলো, এই ধরনের পরিচয় ব্যবহার করে সমাজে ভয় সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে। এটি শুধু একটি দলের নয়, পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যই একটি বিপজ্জনক সংকেত। রাজনীতির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের সেবা, কিন্তু যদি সেই নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখল, হুমকি দেওয়া হয়—তবে সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতি হয়ে ওঠে আতঙ্কের নাম। অন্যদিকে, অধ্যাপক কামরুল ইসলামের হাসপাতালের কার্যক্রম আমাদের জন্য একটি অনুকরণীয় উদাহরণ হতে পারত। যেখানে রোগীদের তিন বেলা খাবার দেওয়া হয়, আলাদা বিল নেওয়া হয় না, বরং কম খরচে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়—সেই মডেলকে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানই আজ নিরাপত্তাহীন। এটি কেবল একজন চিকিৎসকের সংকট নয়— এটি একটি মানবিক উদ্যোগের অস্তিত্বের সংকট। যদি এই পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কেউ আর এমন উদ্যোগ নিতে সাহস করবে না। কারণ, তারা জানবে—সৎ থাকলে, নিয়ম মেনে চললে, একদিন না একদিন চাঁদাবাজির মুখোমুখি হতেই হবে। এই বাস্তবতা ভয়াবহ। এখন প্রশ্ন—সমাধান কোথায়? প্রথমত, এই ঘটনার দ্রুত ও দৃশ্যমান তদন্ত প্রয়োজন। অভিযুক্ত ব্যক্তি যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যাই হোক না কেন—আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কেন অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—তার ব্যাখ্যা দিতে হবে সংশ্লিষ্টদের। তৃতীয়ত, সৎ ও মানবিক উদ্যোগগুলোর জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যারা সমাজের জন্য কাজ করেন, তাদের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সবশেষে, আমাদের সমাজকেও সচেতন হতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা মানে তাকে প্রশ্রয় দেওয়া। আজ যদি আমরা কথা না বলি, তাহলে আগামীকাল এই অন্যায় আমাদের দরজায় কড়া নাড়বে। অধ্যাপক কামরুল ইসলামের কণ্ঠে যে আক্ষেপ, তা এক ব্যক্তির নয়—এটি হাজারো সৎ মানুষের কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠস্বর যদি আমরা আজও না শুনি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। কারণ, যে সমাজ তার সেবকদের রক্ষা করতে পারে না— সে সমাজ একসময় নিজেকেই হারিয়ে ফেলে