নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রাম মহানগরীর অসহনীয় যানজট নিরসন, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেসবিহীন ও কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধ এবং অননুমোদিত ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণসহ নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ২৫ দফা দাবি জানিয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।
রোববার ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম নগরীর দামপাড়া পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবীর ভূঁইয়ার কাছে এ স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান এবং কেন্দ্রীয় মহাসচিব সাংবাদিক লেখক মো. কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে নাগরিক ফোরামের প্রতিনিধি দল স্মারকলিপি প্রদান করে।
স্মারকলিপি গ্রহণকালে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবীর ভূঁইয়া নাগরিক ফোরামের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান। নগরীর যানজট নিরসনে নাগরিক সমাজের গঠনমূলক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন। নাগরিকদের উত্থাপিত সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে তিনি ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন।
চট্টগ্রামের যানজট এখন নাগরিক জীবনের বড় সংকট
স্মারকলিপিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরী নয়, এটি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য, পর্যটন ও আঞ্চলিক যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশের সঙ্গে এ নগরীর কার্যক্রম সরাসরি সম্পৃক্ত।
প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে নগরীর সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের যানজট, ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, অনিয়ন্ত্রিত গণপরিবহন, লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, কালো ধোঁয়া এবং অতিরিক্ত শব্দের কারণে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
নাগরিক ফোরামের নেতারা বলেন, যানজটকে শুধু ট্রাফিক পুলিশের সমস্যা হিসেবে দেখলে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর সঙ্গে নগর পরিকল্পনা, সড়ক ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন, ফুটপাত, বাজার ব্যবস্থাপনা, পার্কিং, পরিবেশ এবং নাগরিক সচেতনতার বিষয়গুলোও সরাসরি জড়িত।
কামাল উদ্দিন: আমরা সমালোচনা নয়, সমাধানের অংশীদার হতে চাই
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামবাসী দীর্ঘদিন ধরে যানজটের দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। প্রতিদিন একজন কর্মজীবী মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকছেন, শিক্ষার্থীরা সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারছেন না, রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স যানজটে আটকে পড়ছে এবং ব্যবসা বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তিনি বলেন, “আমরা কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করার জন্য নয়, নগরবাসীর স্বার্থে একটি গঠনমূলক প্রস্তাব নিয়ে পুলিশের কাছে এসেছি। আমরা চাই প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ পরস্পরের সহযোগী হয়ে কাজ করুক। চট্টগ্রামের যানজট নিরসন সম্ভব, তবে এর জন্য নিয়মিত অভিযান, পরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
কামাল উদ্দিন আরও বলেন, “শুধু অভিযান চালিয়ে কয়েকদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখলে হবে না। যে কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে, সেই কারণ চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের পথে যেতে হবে। কোথাও ফুটপাত দখল, কোথাও অবৈধ পার্কিং, কোথাও গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা আবার কোথাও বাজারের পণ্য ওঠানামাই যানজটের মূল কারণ। তাই এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।”
তিনি নাগরিক ফোরামের স্মারকলিপি গ্রহণ ও নাগরিকদের বক্তব্য শোনার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) কবীর ভূঁইয়াকে ধন্যবাদ জানান এবং চট্টগ্রামকে নিরাপদ, স্বচ্ছন্দ ও নাগরিকবান্ধব নগর হিসেবে গড়ে তুলতে পুলিশের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মাহফুজুর রহমান: মাঠের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ট্রাফিক পরিকল্পনা প্রয়োজন
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে মাঠে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন, যানজটের প্রতিটি এলাকার সমস্যা এক নয়। কোথাও সড়কের ওপর অবৈধ পার্কিং, কোথাও ফুটপাত দখল, কোথাও যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং কোথাও ভারী যানবাহনের চাপ যানজটের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মাহফুজুর রহমান বলেন, “প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার জন্য আলাদা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করতে হবে। শুধু যানজট সৃষ্টি হওয়ার পর পুলিশ মোতায়েন না করে কোন সময় কোথায় যানজট তৈরি হয়, কেন তৈরি হয় এবং কোন ব্যবস্থা নিলে তা কমবে, সে বিষয়ে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা করা দরকার।”
তিনি নাগরিক সমাজকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অংশীদার করার আহ্বান জানান এবং নাগরিক ফোরাম মাঠপর্যায়ের সমস্যা চিহ্নিত করে পুলিশকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও উল্লেখ করেন।
ইতিহাস গবেষক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন: চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ দুটিই রক্ষা করতে হবে
ইতিহাস গবেষক সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামের ইতিহাস শুধু অতীতের গৌরবের ইতিহাস নয়, এটি একটি চলমান নগর সভ্যতার ইতিহাস। বন্দর, নদী, পাহাড়, বাজার, বাণিজ্যপথ ও মানুষের জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে শত শত বছর ধরে চট্টগ্রামের নগরজীবন বিকশিত হয়েছে।
তিনি বলেন, “একটি ঐতিহাসিক নগর যখন অপরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারিত হয় এবং তার সড়ক, ফুটপাত, বাজার ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হয় না, তখন মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। চট্টগ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনায় নগরীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার চাপকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।”
সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন আরও বলেন, “চট্টগ্রামের রাস্তাঘাট শুধু যানবাহন চলাচলের জায়গা নয়, এগুলো নগর সভ্যতার অংশ। ফুটপাত দখল হলে শুধু একজন পথচারীর চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় না, নগরীর নাগরিক সংস্কৃতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই যানজট নিরসনের পাশাপাশি পথচারীবান্ধব ও ঐতিহ্যসম্মত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন।”
তিনি চট্টগ্রামের পুরোনো বাণিজ্যিক এলাকা, বাজার ও ঐতিহাসিক সড়কগুলোর জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি নগরীর উন্নয়ন পরিকল্পনায় ইতিহাসবিদ, নগর বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, প্রকৌশলী, সাংবাদিক ও নাগরিক প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানান।
সৈয়দ মোহাম্মদ সেলিম: ফুটপাত পথচারীর জন্য
নাগরিক ফোরামের নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ফুটপাত দখল চট্টগ্রাম নগরীর যানজটের অন্যতম বড় কারণ। ফুটপাত দখল হয়ে গেলে সাধারণ পথচারী বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে আসেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি যানজটও তৈরি হয়।
তিনি বলেন, “ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য। সেখানে দোকান, মালামাল, মোটরসাইকেল কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি রাখার সুযোগ থাকা উচিত নয়। একদিন অভিযান চালিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর যদি আবার দখল হয়ে যায়, তাহলে সেই অভিযান কার্যকর ফল দেবে না। তাই নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।”
তিনি ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
হামিদ হোসাইন: নাগরিকদের দুর্ভোগ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ চাই
চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি হামিদ হোসাইন বলেন, চট্টগ্রামের যানজট এখন নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনের বড় দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, “একজন মানুষ কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য যে সময় রাস্তায় ব্যয় করেন, তার একটি বড় অংশ যানজটে নষ্ট হয়ে যায়। একজন রোগী হাসপাতালে যাওয়ার সময় যানজটে আটকে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তাই যানজটকে ছোট সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।”
হামিদ হোসাইন বলেন, নাগরিক ফোরাম কোনো সংঘাত বা সমালোচনার রাজনীতি করতে চায় না। তারা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নাগরিক সমস্যার সমাধানে কাজ করতে চান।
তিনি অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) কবীর ভূঁইয়ার ইতিবাচক মনোভাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, নাগরিকদের যৌক্তিক দাবিগুলো বাস্তবায়নে পুলিশ প্রশাসন এগিয়ে এলে নাগরিক ফোরাম সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
দুলাল কান্তি বড়ুয়া: ধারাবাহিক অভিযান ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়
চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক দুলাল কান্তি বড়ুয়া বলেন, যানজট নিরসনে অভিযান যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযানের ধারাবাহিকতা আরও বেশি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “কয়েকদিন অভিযান পরিচালনার পর যদি আবার ফুটপাত দখল হয়, অবৈধ পার্কিং শুরু হয় এবং যত্রতত্র গাড়ি দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে আগের পরিস্থিতিই ফিরে আসে। তাই নিয়মিত মনিটরিং এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার।”
তিনি রিয়াজউদ্দিন বাজার, টেরিবাজার, চকবাজার, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, অক্সিজেন, চাকতাই ও খাতুনগঞ্জসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে এলাকাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণের দাবি জানান।
লায়ন জিল্লুর রহমান শাকিল: প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বাড়াতে হবে
নাগরিক ফোরামের নেতা লায়ন জিল্লুর রহমান শাকিল বলেন, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া যানজট নিয়ন্ত্রণ কঠিন।
তিনি বলেন, “সিসিটিভি ক্যামেরা, তথ্যভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের যানবাহনের গতিপ্রবাহ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কোথায় কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। প্রযুক্তির সঙ্গে দক্ষ জনবল ও মাঠপর্যায়ের কার্যকর ব্যবস্থাপনা যুক্ত হলে যানজট নিয়ন্ত্রণে আরও ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।”
তিনি জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও অন্যান্য জরুরি সেবার যানবাহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চলাচলের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান।
কবীর ভূঁইয়ার উদ্যোগকে স্বাগত নাগরিক ফোরামের
স্মারকলিপি গ্রহণকালে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবীর ভূঁইয়া নাগরিক ফোরামের প্রতিনিধিদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন। নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে তাঁর এ উদ্যোগ ও ইতিবাচক মনোভাবকে স্বাগত জানানো হয়।
ফোরামের নেতারা বলেন, জনগণের কথা শোনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সমস্যা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণের মানসিকতা প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করে। তারা আশা করেন, স্মারকলিপিতে উত্থাপিত দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে পর্যালোচনা করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
২৫ দফা দাবিতে যা রয়েছে
নাগরিক ফোরামের ২৫ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে যানজটপ্রবণ এলাকাকে বিশেষ ট্রাফিক জোন ঘোষণা, পিক আওয়ারে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন, ফুটপাত সম্পূর্ণ দখলমুক্ত রাখা, অবৈধ পার্কিং বন্ধ, অননুমোদিত ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ, কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান এবং হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধ করা।
এ ছাড়া রিয়াজউদ্দিন বাজার ও টেরিবাজারে পৃথক ট্রাফিক পরিকল্পনা, চাকতাই ও খাতুনগঞ্জে ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, আগ্রাবাদ ও বন্দর এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর ও অক্সিজেনে বিশেষ নজরদারি, সিএনজি অটোরিকশার শৃঙ্খলা, বাসের নির্দিষ্ট স্টপেজ, স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল এলাকায় বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা, সিসিটিভি ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, জরুরি যানবাহনের জন্য গ্রিন করিডর, ট্রাফিক আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা এবং নাগরিক অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে সিএমপি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
উপস্থিত ছিলেন যারা
স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচিতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন এস. এ. মান্নান, বিপ্লব বড়ুয়া, ড. হামিদ হোসাইন, লায়ন মোহাম্মদ মজিবুর রহমান শাহিন, ডা. মো. আনোয়ার হোছাইন (সাদ্দাম), সৈয়দ মোহাম্মদ সেলিম, নাহিদা নাজু, এস. বি. সুমী, লায়ন মো. মীর হোসেন মাসুম, মো. হোসেন , সোহেল, মহিউদ্দীন, দুলাল কান্তি বড়ুয়া, লায়ন মিনহাজুর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী, মোহাম্মদ মনজুর আলম, মো. বেলাল উদ্দীন, লায়ন ফরহাদুল হাসান মোস্তফা, লায়ন জিল্লুর রহমান শাকিল, শাহ আলম সাজু তালুকদার, মোহাম্মদ মনজুর, মোহাম্মদ বাপ্পি, মোহাম্মদ আলম, মোহাম্মদ ওসমান, হামিদ হোসাইন ও ওয়াহিদ আলম মাস্টার।
কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান এবং কেন্দ্রীয় মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন।
চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি হামিদ হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক দুলাল কান্তি বড়ুয়াসহ ফোরামের নেতৃবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
“সমাধানের অংশীদার হতে চায় নাগরিক ফোরাম”
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ বলেন, চট্টগ্রামের যানজট নিরসন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। পুলিশ প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, সিডিএ, বিআরটিএ, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, ব্যবসায়ী সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তাদের মতে, চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে তাৎক্ষণিক অভিযান যেমন প্রয়োজন, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। যানজটের কারণ চিহ্নিত করে এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থা, আধুনিক গণপরিবহন, পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা, পথচারীবান্ধব ফুটপাত, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, “আমরা শুধু সমস্যা তুলে ধরতে চাই না, সমস্যার সমাধানের অংশীদার হতেও চাই।”
চট্টগ্রামের সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হলে শুধু যানজট কমবে না, নগরবাসীর সময় বাঁচবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে, রোগী ও জরুরি সেবার যানবাহন দ্রুত চলাচলের সুযোগ পাবে এবং নগরীর সামগ্রিক জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
সবশেষে নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবীর ভূঁইয়ার ইতিবাচক মনোভাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমেই চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার কার্যকর সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
স্মারকলিপি প্রদান শেষে পুলিশ লাইন ক্যান্টিনে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে একটি টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে চট্টগ্রাম নগরীর যানজট নিরসনে পুলিশের কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নেতৃবৃন্দ বলেন, প্রশাসনের উদ্যোগের সঙ্গে নাগরিকদের সচেতনতা ও স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা যুক্ত হলে যানজট নিরসনে কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব।