
– মো. কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রাম সাংবাদিকদের ঐতিহ্যের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান,
চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব শুধু একটি পেশাজীবী সংগঠন নয়; এটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, পেশাগত মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক অটুট প্রতীক। বহু আন্দোলন-সংগ্রামের সাক্ষী এই প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়ের মান রক্ষায় অবিচল। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দ্বি-বার্ষিক (২০২২-২৩) নির্বাচন মাধ্যমে গঠিত নির্বাচিত কমিটি বৈধভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল। তবে কথিত একটি “নতুন কমিটি” বৈধ কমিটির অধিকারকে পাশ কাটিয়ে প্রেসক্লাব দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। এটি কেবল ক্লাবের জন্য নয়, সমগ্র সাংবাদিক সমাজের জন্যও হুমকি। এই প্রবন্ধে আমরা বৈধ কমিটির অধিকার, অবৈধ কমিটির চক্রান্ত এবং সাংবাদিক সমাজের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের প্রয়োজন তুলে ধরব। নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক বৈধতা ৩১ ডিসেম্বর সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ভোটগ্রহণে ২৫৬ জন স্থায়ী সদস্য অংশগ্রহণ করেন। রাত ৮টার দিকে বঙ্গবন্ধু হলে ভোট গণনা শেষে ফল ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন কমিশনার ওমর কায়সার নিশ্চিত করেছেন যে, ফলাফল সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং গঠনতন্ত্রের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল সংক্ষেপে: সভাপতি: সালাহউদ্দিন মো. রেজা – ৯৫ ভোট সাধারণ সম্পাদক: দেবদুলাল ভৌমিক – ৭৭ ভোট সিনিয়র সহ-সভাপতি: চৌধুরী ফরিদ – ১৭৬ ভোট সহ-সভাপতি: মনজুর কাদের মনজু – ১২৫ ভোট যুগ্ম সম্পাদক: শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার ১৫০ ভোট অর্থ সম্পাদক: রাশেদ মাহমুদ – ১২৫ ভোট
সাংস্কৃতিক সম্পাদক: নাসির উদ্দিন হায়দার – ১৪৮ ভোট ক্রীড়া সম্পাদক: সোহেল সরওয়ার – ১৯১ ভোট গ্রন্থাগার সম্পাদক: কুতুব উদ্দিন – ৮০ ভোট সমাজসেবা ও আপ্যায়ন সম্পাদক: আল রাহমান – ১২৩ ভোট প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক: খোরশেদুল আলম শামীম ১৮৬ ভোট নির্বাহী সদস্য: জসীম চৌধুরী সবুজ – ১৭২ ভোট, মোয়াজ্জেমুল হক – ১৫২ ভোট, আইয়ুব আলী – ১২৫ ভোট, মনজুরুল আলম মঞ্জু – ১১৩ ভোট নির্বাচনের পূর্বপ্রক্রিয়ায় মনোনয়নপত্র প্রদান, প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রার্থিতা প্রত্যাহার—সব ধাপ স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে নির্বাচিত কমিটি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বৈধ ও স্থায়ী। গঠনতন্ত্র: বৈধ কমিটির অটল ভিত্তি নির্বাচিত কমিটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে গঠনতন্ত্রের ঊর্ধ্বে কেউ নেই। প্রতিটি সংগঠনের প্রাণ হলো তার গঠনতন্ত্র। এটি নিয়ম নির্ধারণ করে, ক্ষমতার সীমা ঠিক করে এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখে। গঠনতন্ত্রের মূল বিষয়গুলো হলো: ভোটাধিকার: শুধুমাত্র স্থায়ী সদস্যদের ভোটাধিকার দ্বারা কমিটি গঠিত হবে। সদস্যপদ বাতিলের প্রক্রিয়া: অভিযোগ থাকলে তা লিখিতভাবে আনা, তদন্ত করা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া এবং স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ। শৃঙ্খলা ও ন্যায়ের মান: সংগঠন ও সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ন্যায়ের মান বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। সদস্যপদ কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়; এটি সংগঠনের মূল অধিকার। সেই অধিকার হরণ মানেই ক্লাবের ভিত নড়িয়ে দেওয়া। অবৈধ কমিটি: প্রেসক্লাব দখলের অসভ্যতা কথিত “নতুন কমিটি” গঠন করা হয়েছে, যা: কোনো সাধারণ সভা বা নির্বাচনের মাধ্যমে অনুমোদিত নয়, স্থায়ী সদস্যদের সম্মতি নেই, গঠনতন্ত্রের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। নির্বাচিত কমিটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে—এটি গোষ্ঠীভিত্তিক উদ্যোগ, যা ক্লাবের ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করছে।প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো: বৈধ কমিটির অধিকারকে পাশ কাটানো, ভোটাধিকারহীন কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রেসক্লাব দখল, মনগড়া সিদ্ধান্তে সদস্যপদ বাতিলের প্রচেষ্টা, ক্লাবের স্বাভাবিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ। এই কর্মকাণ্ড অসভ্যতা, স্বেচ্ছাচারিতা এবং ব্যক্তিস্বার্থের প্রকাশ। এটি শুধু ক্লাবের জন্য নয়, সমগ্র সাংবাদিক সমাজের জন্যও হুমকি।
সাংবাদিক সমাজের দায়িত্ব ও ঐক্য চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ঐতিহ্য প্রমাণ করে—সংগঠন ও সদস্যরা শৃঙ্খলা, ন্যায়ের মান এবং পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় অটল। সদস্যদের দায়িত্ব:ব্যক্তিস্বার্থের জন্য নয়, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকা, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা এড়িয়ে চলা, গঠনতন্ত্র রক্ষা করা, ক্লাবের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য অটুট রাখা। ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজই পারে প্রেসক্লাবকে দখলচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা করতে। সরকারের হস্তক্ষেপ: সময়োপযোগী সমাধান নির্বাচিত কমিটি সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছে: গঠনতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করা, বৈধ কমিটির সাংগঠনিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, মনগড়া সিদ্ধান্তে সদস্যপদ বাতিলের প্রক্রিয়া স্থগিত করা, ক্লাবের নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। প্রশাসনিক শুনানি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন প্রয়োজন দ্রুত, স্বচ্ছ এবং ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত। সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ একমাত্র কার্যকর সমাধান। সত্য ও ন্যায়ের জয় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সমস্যা ব্যক্তির নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচিত কমিটি বৈধ এবং অটল, সদস্যদের ভোট ও অংশগ্রহণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, ক্লাবের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য রক্ষা করে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, সাংবাদিক সমাজের আস্থার প্রতীক। গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি জোর দাবি: ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুন, গঠনতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষা করুন, এবং সাংবাদিক সমাজের আস্থার প্রতীক এই প্রতিষ্ঠানকে অরাজকতা থেকে মুক্ত করুন। সত্যের জয় হবেই—যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি। গঠনতন্ত্রই হোক পথনির্দেশ, ন্যায়বিচারই হোক চূড়ান্ত রায়।

