
মো. কামাল উদ্দিন
ডেপুটি এডিটর, দি টুরিস্ট
নির্বাহী সম্পাদক, চট্রল চিত্র
সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেসক্লাব
চট্টগ্রামের মাটি যেমন সমুদ্রের বিশালতা ধারণ করে, তেমনি ধারণ করে পাহাড়ের নীরবতা, সীমান্তের সংবেদনশীলতা, বন্দরের ব্যস্ততা এবং কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার অসংখ্য গল্প। এই জনপদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা তাই অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে আলাদা। এখানে অপরাধের চরিত্র বহুমাত্রিক, সামাজিক বাস্তবতা জটিল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও বহুগুণ বেশি। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের নতুন ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী, পিপিএম। গত ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে তাঁকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের দায়িত্ব থেকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে পদায়ন করা হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর পদবি নয়, তাঁর বক্তব্যও নয়। সময়ের সঙ্গে তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্ত, মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড, অধীনস্থদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর আচরণই শেষ পর্যন্ত তাঁর পেশাগত পরিচয় তৈরি করে। সেই জায়গা থেকেই আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর চট্টগ্রাম রেঞ্জে আগমনকে দেখলে তাঁর পূর্ববর্তী কর্মপরিধি এবং সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। দায়িত্বের পরিধি যেমন বিশাল, চ্যালেঞ্জও তেমনি বহুমাত্রিক চট্টগ্রাম রেঞ্জ বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। সমুদ্রবন্দর, সীমান্ত, পাহাড়ি এলাকা, পর্যটন অঞ্চল, শিল্পাঞ্চল, নগর ও গ্রামীণ জনপদ মিলিয়ে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বাস্তবতা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। মাদক, চোরাচালান, সন্ত্রাস, অস্ত্র, কিশোর অপরাধ, ভূমি দখল, চাঁদাবাজি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পুলিশি সেবা পাওয়ার প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একজন রেঞ্জ ডিআইজির দায়িত্ব শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার করা কিংবা অভিযান পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁকে একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের পুলিশকে সক্রিয় রাখতে হয়, তদন্তের মান উন্নত করতে হয়, জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হয় এবং পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহির মধ্যেও রাখতে হয়। এই বাস্তবতায় আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে তাঁর নেতৃত্বকে কতটা কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা যায়। সিলেট থেকে চট্টগ্রাম, অভিজ্ঞতার একটি নতুন অধ্যায় চট্টগ্রাম রেঞ্জে আসার আগে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সিলেটে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট ও ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সিলেটে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি নিরাপদ, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর নগর পুলিশিংয়ের কথা বলেছেন। নাগরিকদের দ্রুত পুলিশি সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর অ্যাপ চালুর উদ্যোগও তাঁর দায়িত্বকালের আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রযুক্তির মাধ্যমে জরুরি পুলিশি সহায়তা, অবস্থান জানানো, অভিযোগের অগ্রগতি অনুসরণসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। আধুনিক পুলিশিং শুধু অস্ত্র, ইউনিফর্ম কিংবা অভিযাননির্ভর নয়। আধুনিক পুলিশিংয়ের সঙ্গে প্রযুক্তি, নাগরিক যোগাযোগ, দ্রুত সেবা এবং আস্থার সম্পর্কও জড়িয়ে আছে। আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডে এই ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়। অপরাধের শিকড় খুঁজে আঘাত করার কথা বলেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে মাদকবিরোধী অবস্থান বিশেষভাবে সামনে এসেছে। গত ২০ আগস্ট লক্ষ্মীপুরে আয়োজিত মাদকবিরোধী সমাবেশে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে মাদক নির্মূলের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাঁর বক্তব্যে শুধু মাদকসেবী নয়, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ডিলার, অর্থের জোগানদাতা, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাসহ পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে আইনের আওতায় আনার কথা উঠে আসে। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ মাদককে শুধু একজন সেবনকারীর ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গায় পৌঁছানো যায় না। মাদকের পেছনে অর্থের প্রবাহ, সরবরাহকারী, পরিবেশক এবং স্থানীয় নেটওয়ার্ক থাকে। সেই জায়গায় আঘাত করতে না পারলে অভিযান সাময়িক ফল দিতে পারে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় মাদকবিরোধী অভিযানে সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি অর্থের উৎস শনাক্ত করার যে কথা তিনি বলেছেন, সেটি মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। জঙ্গল সলিমপুরে সরেজমিনে উপস্থিতি চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা, ভূমি দখল, পাহাড় কাটা এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নিয়ে আলোচনায় থাকা একটি এলাকা। দায়িত্ব গ্রহণের পর সেখানে সরেজমিনে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী। ৪ আগস্ট তিনি জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন পুলিশ ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। জঙ্গল সলিমপুরের মতো এলাকায় একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার সরেজমিনে উপস্থিতির আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। কারণ মাঠের বাস্তবতা কাগজের প্রতিবেদনের চেয়ে অনেক সময় ভিন্ন হয়। একটি এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান, মানুষের চলাচল, অপরাধের ধরন, পুলিশের সক্ষমতা এবং স্থানীয় বাস্তবতা নিজের চোখে দেখা নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও বাস্তবভিত্তিক করতে পারে। সেখানে তাঁর বক্তব্যে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা উঠে আসে। এই বার্তা কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। শুধু অভিযান নয়, মানবিক পুলিশিংয়ের কথাও এসেছে পুলিশের কাজের সবচেয়ে কঠিন জায়গাগুলোর একটি হলো কঠোরতা এবং মানবিকতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।
অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে হবে কঠোরভাবে। কিন্তু একই সঙ্গে নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ পুলিশ জনগণের নিরাপত্তার জন্যই নিয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী মানবিক পুলিশিং এবং জনগণের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরির কথা বলেছেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে তাঁকে বলতে দেখা যায়, অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে পুলিশকেও পরিবর্তিত হতে হবে এবং নাগরিক ও পুলিশের মধ্যে আস্থার সেতু গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই ধারণাটি চট্টগ্রাম রেঞ্জের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি থানায় সাধারণ মানুষ অভিযোগ করতে এসে যদি নিজেকে নিরাপদ ও সম্মানিত মনে করেন, তাহলে পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক শক্তিশালী হয়। আবার অপরাধী যদি মনে করে আইনের হাত তার নাগালের বাইরে, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়। পুলিশি কঠোরতা যেন হয় আইনের ভিতরে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী নোয়াখালীতে অপরাধ দমন ও শাস্তির কার্যকারিতা নিয়েও বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি এমন শাস্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, যার মাধ্যমে সমাজে অপরাধের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর বার্তা যায়। একই সঙ্গে তিনি বিচারিক প্রক্রিয়ার বাস্তবতাও তুলে ধরেছেন। পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে, তদন্ত করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত আদালতের। এই বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিচার বিভাগের ভূমিকার সীমারেখা স্বীকার করা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশি ক্ষমতা যতটা প্রয়োজনীয়, সেই ক্ষমতার আইনি সীমারেখাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই চট্টগ্রাম রেঞ্জে তাঁর নেতৃত্বের একটি বড় পরীক্ষা হবে অপরাধ দমনে কঠোরতা বজায় রেখেও আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া এবং নাগরিক অধিকারকে সম্মান করা। একজন কর্মকর্তাকে মূল্যায়নের আসল জায়গা মাঠ কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে শুধু তাঁর বক্তব্য দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তাঁর দায়িত্বকালে অপরাধের প্রবণতা কীভাবে পরিবর্তিত হলো, তদন্তের মান কতটা বাড়ল, মামলা নিষ্পত্তির গতি কেমন হলো, সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছ থেকে কতটা দ্রুত সেবা পেলেন এবং পুলিশ সদস্যরা কতটা
জবাবদিহির মধ্যে থাকলেন, এসব বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
তাঁর সামনে এখন একটি বিশাল কর্মক্ষেত্র। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার, কুমিল্লা থেকে নোয়াখালী, ফেনী থেকে লক্ষ্মীপুর, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সীমান্তবর্তী জনপদ, প্রতিটি এলাকার অপরাধের ধরন আলাদা। কোথাও মাদক বড় সমস্যা, কোথাও চোরাচালান, কোথাও ভূমি ও পাহাড়কেন্দ্রিক বিরোধ, কোথাও কিশোর অপরাধ, আবার কোথাও রাজনৈতিক বা সামাজিক বিরোধ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। একজন রেঞ্জ ডিআইজির নেতৃত্বের সাফল্য তাই একটি অভিযানের সাফল্যে মাপা যায় না। সামগ্রিক পুলিশ ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিক উন্নতিই সেখানে আসল মাপকাঠি। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরাই তাঁর নেতৃত্বের মূল শক্তি একজন ডিআইজি যতই দক্ষ পরিকল্পনা করুন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশ পরিদর্শক, উপপরিদর্শক এবং কনস্টেবল পর্যায়ের সদস্যরা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর জন্য শুধু অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে তাঁর অধীনস্থ পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, সততা এবং জনবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করা। একজন ভালো নেতৃত্বের পরিচয় অনেক সময় নিজের বক্তব্যে নয়, অধীনস্থদের আচরণে প্রকাশ পায়। একজন নাগরিক থানায় গিয়ে কী ব্যবহার পেলেন, একজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ কত দ্রুত নেওয়া হলো, তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হলো এবং একজন সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছ থেকে কতটা সহযোগিতা পেলেন, সেখানেই নেতৃত্বের বাস্তব প্রতিফলন ঘটে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক কর্মপরিধি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর পেশাগত জীবনে দেশীয় দায়িত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে কাজ করা একজন পুলিশ কর্মকর্তার জন্য শৃঙ্খলা, বহুজাতিক পরিবেশে কাজ করার সক্ষমতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত হয়। চট্টগ্রাম রেঞ্জের মতো বহুমাত্রিক একটি অঞ্চলে এই অভিজ্ঞতা তাঁর প্রশাসনিক ও নেতৃত্বের কাজে কতটা কার্যকর হয়, সেটিও সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।
চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা এখন কর্মে চট্টগ্রামের মানুষ পুলিশের কাছে শুধু অভিযান চায় না। তারা নিরাপদ সড়ক চায়, মাদকমুক্ত পরিবেশ চায়, চাঁদাবাজমুক্ত ব্যবসার পরিবেশ চায়, পাহাড় ও ভূমি দখল থেকে নিরাপত্তা চায়, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা চায় এবং সর্বোপরি চায় থানায় গিয়ে সম্মানের সঙ্গে কথা বলার অধিকার। এই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই নতুন ডিআইজির প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর বক্তব্যে মাদক ও অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। মাঠপর্যায়ে তাঁর উপস্থিতিও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের যেকোনো নতুন নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বার্তার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ প্রতিশ্রুতি শুনে আশাবাদী হয়, কিন্তু ফলাফল দেখে আস্থা তৈরি করে। সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
চট্টগ্রাম রেঞ্জে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর সামনে তাই একদিকে যেমন কঠিন অপরাধ দমনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে মানবিক পুলিশিং প্রতিষ্ঠার সুযোগ।
অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোরতা থাকতে হবে, কিন্তু নিরপরাধ মানুষের প্রতি থাকতে হবে সংবেদনশীলতা। মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযান চলবে, কিন্তু মাদকাসক্ত একজন তরুণকে সমাজে ফিরিয়ে আনার পথও ভাবতে হবে। চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, আবার ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান থাকতে হবে, কিন্তু সেই শক্তি অবশ্যই আইনের কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োগ করতে হবে। এই ভারসাম্যই একজন পুলিশ নেতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সময়ই বলবে কর্মের হিসাব আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর চট্টগ্রাম রেঞ্জ অধ্যায় এখনো শুরুর পর্যায়ে। তাই তাঁর নেতৃত্বের চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মাদকবিরোধী অবস্থান, জঙ্গল সলিমপুরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় সরেজমিনে উপস্থিতি এবং বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ দমন নিয়ে তাঁর বক্তব্য তাঁর অগ্রাধিকার সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা দেয়। এখন প্রয়োজন সেই অগ্রাধিকারকে ধারাবাহিক কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের মানুষ দেখতে চায়, অপরাধের বড় নামের পাশাপাশি ছোট অপরাধীও আইনের আওতায় আসছে কি না। তারা দেখতে চায়, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুধু বক্তৃতার মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকছে, নাকি মাদকের অর্থের উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থায়ও আঘাত হানছে। তারা দেখতে চায়, পুলিশ সদস্যদের অনিয়মের বিরুদ্ধেও একই কঠোরতা প্রয়োগ হচ্ছে কি না। তারা দেখতে চায়, থানায় সাধারণ মানুষের অভিযোগ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত একজন পুলিশ কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর পদবি নয়, তাঁর বক্তব্য নয়, তাঁর কর্মফল।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের নতুন ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর সামনে এখন সেই কর্মফল নির্মাণের সময়। বিশাল এই রেঞ্জের সমুদ্র, পাহাড়, সীমান্ত, নগর ও জনপদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। মানুষের প্রত্যাশা একটাই, অপরাধীর জন্য আইনের কঠোরতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য পুলিশের মানবিক হাত যেন একই সঙ্গে দৃশ্যমান হয়। চট্টগ্রাম এখন তাঁর বক্তব্য শুনেছে। এবার চট্টগ্রাম দেখতে চায় তাঁর কর্ম। সময়ই সেই কর্মের সবচেয়ে নিরপেক্ষ সাক্ষী হবে।