-মো.কামাল উদ্দিনঃ
মানুষকে বিচার করা হয় প্রায়শই তার বাহ্যিক পরিচয়ে। পুলিশ অফিসার—এই শব্দটি উচ্চারণ করলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কঠোর মুখ, কঠিন আইন, অপরাধীদের ধাওয়া করার এক দৃশ্যপট। অথচ সেই ইউনিফর্মের ভেতরে যে একজন মানুষ আছেন—যার হৃদয়েও স্বপ্ন আছে, অনুভূতি আছে, আছে সাহিত্যপ্রেম ও মানবিকতা—তা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। পুলিশের দায়িত্ব ও কঠোর বাস্তবতার মাঝে থেকেও যদি কেউ সাহিত্য, সৃজনশীলতা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসাকে ধারণ করতে পারেন, তবে তিনি নিঃসন্দেহে এক বিরল মানুষ। এমনই একজন মানুষ পুলিশ পরিদর্শক জাহিদুল কবির, যিনি বর্তমানে চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার পেকুয়ার সন্তান তিনি। সেখানকার মাটির গন্ধ, শৈশবের সমুদ্র-হাওয়ার স্বপ্নিল ছোঁয়া, গ্রামীণ সরলতা আর এক অন্যরকম মানবিকতার শিক্ষাই হয়তো তাকে আজকের জাহিদুল কবির বানিয়েছে। আমি তার পুলিশি জীবন শুরুর সময় থেকেই তাকে চিনি। তবে আমি তাকে কখনো শুধু একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে দেখি নি। আমার কাছে তিনি বরাবরই একজন মানবিক, সহজ-সরল, চিন্তাশীল এবং সাহিত্যের প্রতি অদম্য প্রেমে আসক্ত একজন মানুষ।
জাহিদুল কবিরের ভেতরে আছে আলো আর আঁধারির খেলা। দায়িত্বের কঠিন বাস্তবতায় মাঝে মাঝে তাকে হতে হয় দৃঢ়, শাসনক্ষম, নিরপেক্ষ আইনরক্ষক। কিন্তু মানুষের সাথে বসলে, বিশেষ করে আড্ডার চায়ের টেবিলে, তিনি হয়ে ওঠেন অন্য এক মানুষ—সাহিত্যের আলোয় আলোকিত, মানুষের কাছে থাকা সহজ-সরল সঙ্গী। আমার সাথে তার সম্পর্ক বহুদিনের। সেই সম্পর্কের ভেতরে আমি তাকে চিনেছি একজন মানুষপ্রেমী পুলিশ অফিসার হিসেবে। তিনি মানুষের দুঃখ শুনেন, মানুষের গল্প বোঝেন। তার কাছে পুলিশি দায়িত্ব মানে শুধু অপরাধী ধরা নয়—বরং অপরাধ প্রতিরোধ করা, অপরাধীকে সংশোধন করা, এবং সমাজে একটি সুন্দর বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।গতকাল রাতে চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জের টেবিলে বসে চা-আড্ডায় তার সাথে দীর্ঘ সময় কাটালাম। কথার পরতে পরতে উঠে এল সাহিত্য, মানবাধিকার, সমাজ, অপরাধ, আইন ও মানুষের জটিল সম্পর্কের নানা দিক। হঠাৎ কথার এক ফাঁকে তিনি আমাকে বললেন—
“কামাল ভাই, আমি আপনাকে নিয়ে একটি গবেষণামূলক লেখা লিখতে চাই। তবে তা পুলিশের ভাষায় নয়, একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে। আমি চাই, এই লেখায় ফুটে উঠুক অপরাধ ও অপরাধী, আইন ও আদালত, মানবাধিকার আর সমাজের অসঙ্গতির ছবি। এমনভাবে উপস্থাপন করতে চাই যাতে পাঠকের কাছে এটি শুধু একটি লেখা না হয়ে, হয়ে ওঠে একটি মেসেজ, একটি দিকনির্দেশনা।”তার এই কথার মধ্যে আমি আবিষ্কার করলাম এক বিরল আহ্বান। পুলিশের দায়িত্ব পালনের ফাঁকেই তিনি যে সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতির জন্য সৃজনশীলভাবে কিছু করতে চান, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি তখনই তার মধ্যে এক সাহিত্যিক মনোভাব, সৃজনশীল প্রতিভার স্ফুরণ দেখতে পেলাম।
তিনি আমার লেখা পড়েন নিয়মিত। আমাকে বললেন,“কামাল ভাই, আপনি এত লেখেন, এত সুন্দর লেখেন—আমি অবাক হই। কখন লেখেন? কীভাবে লেখেন?” আমি হাসলাম, বললাম—এ আমার সাধনা। কিন্তু আমি অনুভব করলাম, তিনি সত্যিই সাহিত্যপ্রেমী। হয়তো পুলিশিংয়ের কঠোর জীবন তাকে প্রতিদিন তাড়া করে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি শব্দের জগতে আশ্রয় খোঁজেন।এই জায়গাটিতে এসে আমি মনে করলাম, একসময় পুলিশের লেখক ধীরেজের বই পড়েছিলাম। তখন যেমন বিস্ময় জেগেছিল, আজ আবার জাহিদুল কবিরের কথায় সেই স্মৃতি ফিরে এল। পুলিশ যখন শুধু দায়িত্বের ভেতর আটকে থাকে না, বরং মানুষের ভেতরে আলো জ্বালানোর চিন্তা করে, তখন সে হয়ে ওঠে সমাজের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।
আমাদের দেশে পুলিশি দায়িত্বের ধারণা প্রায়শই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে—অপরাধী ধরা, মামলা নেওয়া, শাস্তি দেওয়া। কিন্তু জাহিদুল কবিরের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। তিনি মনে করেন, অপরাধ দমনই শেষ কথা নয়। অপরাধীকে সংশোধন করাই আসল উদ্দেশ্য। অপরাধকে সমাজ থেকে মুছে ফেলার জন্য শুধু শাস্তি নয়, প্রয়োজন শিক্ষার, মানবিকতার এবং সামাজিক দিকনির্দেশনার।এই চিন্তাধারাই তাকে আলাদা করে তুলেছে। তিনি যেমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে পারেন, তেমনি দরিদ্র, পথশিশু, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতেও তার ভেতরে আছে মানবিক টান।আমি যখন তার সাথে আলাপ করি, বুঝতে পারি—তার ভেতরে এক লেখক-মন কাজ করছে। তিনি শুধু কথায় নয়, লেখাতেও সমাজের অসঙ্গতি, অপরাধজীবনের অন্ধকার আর মানবিকতার আলো ফুটিয়ে তুলতে চান।
তিনি চান—একদিন হয়তো তার কলমে বের হয়ে আসবে সেই সব গল্প, যা হবে রাষ্ট্র ও জাতির জন্য এক মূল্যবান দলিল।
তার ভেতরে আমি দেখি এক দ্বন্দ্ব—পুলিশের কঠোরতা আর লেখকের কোমলতা। এই দ্বন্দ্বই তাকে করে তুলেছে ব্যতিক্রমী। হয়তো এ কারণেই আমি তাকে শুধু একজন অফিসার নয়, বরং একজন সাহিত্যপ্রেমী বন্ধু হিসেবেও দেখি।
জাহিদুল কবিরকে সবাই পুলিশ অফিসার হিসেবে চেনে। কিন্তু আমার কাছে তিনি একেবারেই ভিন্ন। তিনি সেই মানুষ, যিনি চায়ের টেবিলে বসে সমাজের কথা ভাবেন, লেখালেখির স্বপ্ন দেখেন, এবং একজন সাধারণ পাঠকের মতো আমার লেখায় মুগ্ধ হন।
এই সরলতা, এই ভেতরের আলোই তাকে অন্যরকম করে তোলে। আমি তাকে বলেছি—তুমি লেখো। লেখার ভেতর দিয়ে তুমি তোমার সৃজনশীলতাকে প্রকাশ করো। পুলিশি দায়িত্ব পালন করতে করতে তুমি যদি একটি সাহিত্যিক বার্তা জাতির কাছে পৌঁছে দিতে পারো, তবে সেটিই হবে তোমার সবচেয়ে বড় অবদান।
জাহিদুল কবির—তিনি একজন পুলিশ পরিদর্শক, একজন অফিসার ইনচার্জ। কিন্তু সেই পরিচয়ের আড়ালে তিনি একজন মানুষ, একজন লেখকপ্রেমী, একজন সৃজনশীল স্বপ্নদ্রষ্টা। তার ভেতরে আলো-আঁধারির খেলা থাকলেও, আমি বিশ্বাস করি সেই আলোই শেষ পর্যন্ত সমাজকে আলোকিত করবে।
পুলিশ যখন শুধু আইন রক্ষক হয়ে থাকে না, বরং সাহিত্যপ্রেমী ও মানবিক বার্তাবাহক হয়ে ওঠে—তখন সমাজে এক নতুন সম্ভাবনা জন্ম নেয়। জাহিদুল কবির সেই সম্ভাবনারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

