

হাওর-বাঁওড় আর নদনদীঘেরা সুনামগঞ্জ। উত্তরে ভারতের মেঘালয় ও খাসিয়া পাহাড়। সেখান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি একসময় প্রাণ ফিরিয়ে দিত জেলার নদীগুলোতে। এসব নদী ছিল মানুষের জীবন ও জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। নদীপথে চলত লঞ্চ, কার্গো ও বড় বড় নৌযান। জেলেরা নদীতে মাছ ধরতেন, আর এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌকা। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। নদী আছে, কিন্তু অনেক নদীতে নেই আগের সেই স্রোত। কোথাও পলি জমে তলদেশ ভরাট হয়েছে, কোথাও দখলে সংকুচিত হয়েছে নদীর বুক। কোথাও বর্জ্য ও প্লাস্টিকের দূষণ, আবার কোথাও নির্বিচারে বালু-পাথর উত্তোলনে বদলে গেছে নদীর তলদেশ ও দুই পাড়ের চেহারা। কয়েকটি নদী শুকিয়ে পরিণত হচ্ছে মরা খাল কিংবা চরে। সুনামগঞ্জের ২৬টি নদীর বাস্তব পরিস্থিতি খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র। সুনামগঞ্জের অন্যতম আলোচিত নদী জাদুকাটা। ভারতের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা এ নদীর স্বচ্ছ পানি, নীলাভ প্রবাহ ও দুই পাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের আকর্ষণ করে আসছে। তবে অবাধে বালু-পাথর উত্তোলনে নদীটি এখন অস্তিত্বের সংকটে। জাদুকাটায় অবৈধ ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কোথাও নদীর তলদেশ কেটে বালু তোলা হচ্ছে, আবার কোথাও কাটা হচ্ছে নদীর পাড়। এতে নদীর স্বাভাবিক তলদেশ, প্রবাহ ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা। সুনামগঞ্জের নদীগুলোর সংকটের অন্যতম দৃশ্যমান উদাহরণ পুরোনো সুরমা বা মরা সুরমা। প্রায় ৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী সুনামগঞ্জ, শান্তিগঞ্জ, দিরাই ও শাল্লা হয়ে ধনু নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একসময় এ নদীপথে বড় নৌযান চলাচল করলেও পলি ও বালু জমে নদীর অনেক অংশ নাব্যতা হারিয়েছে। কোথাও নদীর তলদেশ এতটাই ভরাট হয়েছে যে সেখানে এখন ধান চাষ হচ্ছে। কোথাও আবার মানুষ হেঁটেই নদী পার হচ্ছেন। শান্তিগঞ্জের নারায়ণপুর থেকে পাথারিয়া-শরিফপুর পর্যন্ত প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার অংশের বিভিন্ন জায়গা শুকিয়ে বা ভরাট হয়ে যাওয়ার চিত্র দেখা যায়। হেমন্তে স্থানীয়রা নদীর বুকে ধান চাষ করেন। এমনকি নদীর তলদেশকে মাঠ বানিয়ে যুবকেরা ফুটবল-ক্রিকেট প্রতিযোগিতার আয়োজনও করেন। জাদুকাটার পাশাপাশি নাব্যতা সংকটে ভুগছে রক্তি নদীও। প্রতিবছর মার্চে বিশ্বম্ভরপুরের কাটাখালী-নিয়ামতপুর-সুরমা পর্যন্ত প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার এলাকায় ভরাটের কারণে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদী দখলের সমস্যা। গৌরারং ইউনিয়নের নিয়ামতপুর, ফিরোজপুর ও নলুয়ারপাড় এলাকায় নদী দখল করে গড়ে উঠেছে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রস্থ কমে কোথাও কোথাও সরু খালে পরিণত হয়েছে রক্তি। অর্থাৎ, এ নদীর সংকট শুধু নাব্যতা হারানো নয়—এর সঙ্গে রয়েছে পলি জমা ও অবৈধ দখলের চাপ। সুনামগঞ্জের প্রাণ সুরমা নদীও রেহাই পায়নি সংকট থেকে। পলি জমে নাব্যতা কমার পাশাপাশি নদীর তীর দখল, বাজারের বর্জ্য, পলিথিন, প্লাস্টিক, গৃহস্থালি ও শিল্পবর্জ্য নদীটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। জামালগঞ্জ এলাকায় সুরমার দুই পাড়ে গড়ে ওঠা বড় বাজারগুলো থেকে বর্জ্য ও পলিথিন নদীতে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। এতে নদীর পানি ও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা ও পরিবেশবিদরা। সুনামগঞ্জের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদী কুশিয়ারাও নানা সংকটে জর্জরিত। নদীভাঙন, বালু উত্তোলন ও দখল এর অন্যতম প্রধান সমস্যা। নদীভাঙনে বদলে যাচ্ছে এলাকার মানচিত্র। শাল্লার বিভিন্ন অংশে নদীপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি কোথাও চর জেগে উঠছে, যা পরে চাষাবাদের উপযোগী হয়ে উঠছে। আবার নদীভাঙনে বাড়িঘর ও বসতভিটা বিলীন হয়ে বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন অনেক পরিবার। সরেজমিনে দেখা যায়, কুশিয়ারা ও কালনীর মিলনস্থল মার্কুলী টুকচানপুরে স্থায়ীভাবে বাঁধ দেওয়ার পর সেখানে গড়ে উঠেছে বসতি ও বাজার। রক্তি, আপার ধোলাই, সোমেশ্বরী, মনাই, মাই, বৌলাই, কংস, পাটনাই, জাদুকাটা, নাইন্দা, কানদী, কুশিয়ারা, চামতি, দারাইন, মহাসিং, ডাউকা, বিবিয়না, হেরা চামতি, কামারখালী, চলতি, পুরাতন সুরমা, নলজুর ও সুরমাসহ বিভিন্ন সরকারি ও স্থানীয় তালিকায় সুনামগঞ্জের একাধিক নদীর নাম রয়েছে। তবে তালিকাভেদে নদীর সংখ্যা ও নামের কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। কোথাও শাখা-উপনদী, কোথাও মৃত নদীকেও আলাদাভাবে গণনা করা হয়েছে। কিন্তু সংখ্যা যা-ই হোক, মূল প্রশ্ন একটাই—নদীগুলো কি তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে পারছে? বাস্তব চিত্র বলছে, সংকট গভীর। কোথাও বালু-পাথর উত্তোলনের চাপ, কোথাও পলি জমে নাব্যতা কমেছে। কোথাও নদী দখল হয়েছে, কোথাও বাজারের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পানি। আবার কোনো কোনো নদী হারিয়ে ফেলছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ ও অস্তিত্ব। নদী হারিয়ে গেলে শুধু একটি জলধারা হারায় না। হারিয়ে যায় নৌপথ, মাছ, কৃষির পানি, হাওরের স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য। এর সঙ্গে সংকটে পড়ে নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা মানুষের জীবন, জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জের নদী রক্ষায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। নদীগুলো খনন করা গেলে নৌপথ সচল হওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য ও জেলার অর্থনীতিতেও গতি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।