
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
কিছু মানুষ জন্ম নেন আলো নিয়ে। তাঁদের উপস্থিতি নীরবে হলেও সময়ের অন্ধকারে পথ দেখায়। বাংলা সাহিত্যে ফরিদা হোসেন তেমনই এক আলোকবর্তিকা—যাঁর লেখায় আছে মমতা, যাঁর কণ্ঠে আছে দায়িত্ববোধ, আর যাঁর জীবনজুড়ে বিস্তৃত এক অনিঃশেষ সাহিত্য সাধনা। ১৯ জানুয়ারি—এই দিনটি তাই কেবল একটি জন্মদিন নয়; এটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক দীর্ঘ, নিরবচ্ছিন্ন যাত্রাপথের উৎসব। ফরিদা হোসেন বাংলা সাহিত্যের সেই বিরল লেখকদের একজন, যাঁরা শিশুদের জন্য লিখে কখনো শিশু হয়ে যাননি, আবার বড়দের জন্য লিখে শিশুদের ভুলে যাননি। তাঁর সাহিত্য পাঠককে শেখায় না—পাশে বসে গল্প করে। আর সেই গল্পের ভেতর দিয়েই পাঠক ধীরে ধীরে জীবনের অর্থ খুঁজে পায়। ১৯৪৫ সালের ১৯ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর শিকড় প্রোথিত চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার শাহেরখালী গ্রামে—বাংলার মাটি, মানুষের গন্ধ ও ইতিহাস যেখানে জীবনকে সহজ অথচ দৃঢ় করে তোলে। বাবা ফয়েজ আহমেদ ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শ্রম নেতা, আইএলও গভর্নিং বডির প্রাক্তন পরিচালক—যাঁর জীবন ছিল সংগ্রামের; আর মা বেগম ফয়েজুননেসা ছিলেন নীরব শক্তির প্রতীক। এই দুই ধারার সম্মিলনেই ফরিদা হোসেন হয়ে উঠেছেন মানবিক, সংযত ও গভীরভাবে দায়িত্বশীল এক সাহিত্যিক সত্তা। ছাত্রীজীবনেই ষাটের দশকে লেখা আজন্তা শুধু একটি প্রথম গ্রন্থ নয়—এটি ছিল এক প্রতিশ্রুতি। সময়ের জটিলতা, মানুষের নিঃশব্দ যন্ত্রণা, নারীর অন্তর্লোক—সবই সেখানে ধরা পড়েছিল সংযত ভাষায়। এরপর তাঁর সাহিত্য ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও বিশেষভাবে শিশুসাহিত্যে। শিশুদের জন্য লেখা তাঁর বইগুলো কোনো কৃত্রিম নৈতিকতার ভার চাপায় না—বরং কল্পনা, সাহস ও মানবিক বোধের দরজা খুলে দেয়। ফরিদা হোসেন শুধু লেখেননি—তিনি গড়ে তুলেছেন লেখার পরিবেশ। ‘অবিনশ্বর’ লিটল ম্যাগাজিন কেবল একটি পত্রিকা নয়; এটি বহু লেখকের প্রথম সাহসের ঠিকানা। কতজন যে এই পত্রিকার পাতায় নিজের নাম দেখে লেখক হয়ে ওঠার স্বপ্নে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন—তার হিসাব কেবল সময়ই জানে। তিনি কখনো প্রচার চাননি, কৃতিত্ব দাবি করেননি—নীরবে কাজ করে গেছেন। আমার নিজের জীবনেও ফরিদা হোসেন এক অনন্য আশ্রয়ের নাম। তাঁর কারণেই আমি বিশ্ব লেখকদের সংগঠন পেন ইন্টারন্যাশনাল–এর সদস্য হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সেই পরিচয়ের মাধ্যমে বিশ্বের নানা দেশের লেখক, চিন্তক ও সাহিত্যকর্মীদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। ২০১২ সালে কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত পেন ইন্টারন্যাশনালের ৭৬তম বিশ্ব লেখক সম্মেলনে তাঁর নেতৃত্বে অংশগ্রহণ ছিল আমার সাহিত্যজীবনের এক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নোবেলজয়ী সাহিত্যিক, রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্ব ও প্রথিতযশা লেখকদের সঙ্গে একই পরিসরে দাঁড়ানো—এই আত্মবিশ্বাস ফরিদা হোসেনই আমাদের দিয়েছেন।সেই সম্মেলনে পেন বাংলাদেশ প্রশংসিত হয়েছিল—কারণ ফরিদা হোসেন পেনকে কেবল একটি সংগঠন হিসেবে নয়, একটি গবেষণামুখী সাহিত্যিক কর্মক্ষেত্রে রূপ দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের দরবারে মর্যাদার সঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে—নম্র কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক রাজনৈতিক পরিবারের অংশ হয়েও সাহিত্যিক সত্তাকে কখনো আড়াল হতে দেননি। প্রয়াত মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন—ফেনীর বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য—তাঁর রাজনৈতিক জীবন আর ফরিদা হোসেনের সাহিত্য সাধনা পাশাপাশি চলেছে পরস্পরের প্রতি সম্মান রেখে। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন নারী একই সঙ্গে লেখক, সংসারী, সংগঠক ও নেতৃত্বদানকারী হতে পারেন কোনো আত্মঘোষণা ছাড়াই। ফরিদা হোসেনের সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি মানুষ। তাঁর মধ্যে নেই আত্মঅহংকার, নেই দূরত্ব। তিনি নতুন লেখকের পাশে দাঁড়ান, সাহস দেন, পথ দেখান। তাঁর অনুপ্রেরণায় আজ আমি ত্রিশটির বেশি বই লিখতে পেরেছি—এ কথা আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উচ্চারণ করি। তাঁর লেখা না পড়লে তাঁকে জানা যায় না। তাঁর গল্পে যে নরম আলো, যে দীর্ঘস্থায়ী রেশ—তা পাঠকের ভেতরে থেকে যায় অনেকদিন। তিনি তৎক্ষণাৎ চমক সৃষ্টি করেন না; ধীরে ধীরে হৃদয়ে জায়গা করে নেন। এটাই কালজয়ী সাহিত্যের লক্ষণ।আজ এই জন্মদিনে তাই মনে হয়—এই মহীরুহ কথাসাহিত্যিককে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য একটি বিশেষ প্রকাশনা শুধু প্রয়োজন নয়, দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ লেখকদের জন্য ফরিদা হোসেন হয়ে থাকুন এক আলোকবর্তিকা—যাঁর জীবন বলে দেয়, সাহিত্য মানে কেবল লেখা নয়; সাহিত্য মানে মানুষের পাশে থাকা। ১৯ জানুয়ারি—এই জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় ও কৃতজ্ঞতায় আমি এই মহৎ মানুষটির সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও অবিরাম সৃষ্টিশীলতা কামনা করি। ফরিদা হোসেন— একজন মানুষ, একটি প্রতিষ্ঠান, এবং বাংলা সাহিত্যের এক অবিনশ্বর নাম।