
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের আকাশে যখন অনিশ্চয়তার মেঘ ঘনিয়ে উঠেছিল, ঠিক সেই সময়ই দায়িত্বের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন দুই সহযোদ্ধা—হাসিব আজিজ ও আহসান হাবিব পলাশ। সময়টা সহজ ছিল না; চারদিকে অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ, জনমনে আস্থাহীনতা। কিন্তু এই দুই বন্ধু প্রমাণ করেছিলেন—সততা, দক্ষতা ও নৈতিকতার ওপর দাঁড়িয়ে থেকেও দায়িত্ব সফলভাবে পালন করা যায়। আজ তাদের বদলিকে ঘিরে যে আলোচনা, সমালোচনা কিংবা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা আসলে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ, এটি কোনো অবমূল্যায়ন নয়—বরং এটি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ, এবং অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি উচ্চতর দায়িত্বের দিকে অগ্রযাত্রা। হাসিব আজিজ, যিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁর সময়কালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল দৃশ্যমান অগ্রগতি। বিশেষ করে বেপরোয়া ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের মতো কঠিন কাজটি তিনি যেভাবে বাস্তবায়ন করেছেন, তা দেশের অন্য কোনো মহানগরে তেমনভাবে দেখা যায়নি। একজন অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা হিসেবে ডিআইজি পদের একটি দায়িত্ব পালন করা নিজেই তাঁর দায়িত্ববোধ ও পেশাদারিত্বের প্রমাণ। অন্যদিকে আহসান হাবিব পলাশ—যিনি দীর্ঘদিন অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়েও নীতির প্রশ্নে আপস করেননি—তিনি আজ ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে নতুন পথচলার সূচনা করেছেন। তাঁর মতো একজন সৎ ও নির্ভীক কর্মকর্তার উত্থান শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো পুলিশ বাহিনীর জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। দুই বন্ধুর এই যাত্রা একসঙ্গে শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সালে, ১৫তম বিসিএস ব্যাচের মাধ্যমে। সময়ের পরিক্রমায় অনেকেই পদোন্নতির সিঁড়ি দ্রুত অতিক্রম করেছেন, কিন্তু এই দুইজনকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। সেই অপেক্ষা ছিল কষ্টের, ছিল অবহেলার—তবুও তারা হার মানেননি। বরং নিজেদের যোগ্যতা ও সততার মাধ্যমে আজ তারা প্রমাণ করেছেন, দেরিতে হলেও সত্যিকারের মূল্যায়ন একদিন আসেই। আজ যখন বলা হচ্ছে—হাসিব আজিজের বদলি নাকি তাঁর সম্মানহানি—তখন ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, এই ধারণা কতটা ভুল। এই পদে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ পরবর্তীতে আইজিপি হয়েছেন। আবার র্যাব থেকেও দেশের সর্বোচ্চ পুলিশ পদে আসীন হওয়ার নজির রয়েছে। সুতরাং, একটি দায়িত্ব থেকে আরেকটি দায়িত্বে যাওয়া কখনোই অবনমন নয়; বরং এটি অভিজ্ঞতার বিস্তার এবং দায়িত্বের পরিধি বৃদ্ধি। প্রশাসনের এই কাঠামোতে পদবী নয়, কাজই শেষ কথা। একজন কর্মকর্তা কোথায় বসে কাজ করছেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ—তিনি কীভাবে কাজ করছেন। সেই বিবেচনায় হাসিব আজিজ ও আহসান হাবিব পলাশ—দুজনই তাদের দায়িত্ব পালনে সফল, এবং সেই সাফল্যই তাদের পরবর্তী অবস্থানে নিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম শহর সবসময়ই সংগ্রাম, সম্ভাবনা ও প্রাণচাঞ্চল্যের এক অনন্য মিশ্রণ। এই শহরের মানুষের প্রত্যাশা শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ নয়, বরং একটি মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা। এই দুই কর্মকর্তা তাদের দায়িত্বকালীন সময়ে সেই আস্থার ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছেন—এটাই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।
আজ তারা নতুন দায়িত্বে যাচ্ছেন—একজন এপিবিএনের প্রধান হিসেবে, অন্যজন র্যাব প্রধান হিসেবে। এটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি সেই দীর্ঘ সংগ্রামের স্বীকৃতি, যা তারা বছরের পর বছর নীরবে বহন করেছেন। সমালোচনা থাকবে, বিভ্রান্তি ছড়াবে—কিন্তু সত্য একটাই: বদলি মানেই ব্যর্থতা নয়। অনেক সময় এটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সোপান। আর এই দুই বন্ধুর জীবনের গল্প সেটিই বলে— সততা কখনো পরাজিত হয় না, সময়মতো সে তার মর্যাদা ফিরিয়ে নেয়। চট্টগ্রামবাসী হিসেবে আমাদের উচিত তাদের এই নতুন যাত্রায় পাশে থাকা, তাদের প্রতি আস্থা রাখা এবং একটি জনবান্ধব, ন্যায়ভিত্তিক পুলিশ বাহিনী গঠনের স্বপ্নকে আরও শক্তিশালী করা। কারণ, নেতৃত্বের আসল পরিচয় পদবীতে নয়—মানুষের হৃদয়ে।

