
স. ম. জিয়াউর রহমান, মানিকগঞ্জ-
মানিকগঞ্জের সিংগাইরের বলধারা ইউনিয়ন এখন যেন ইটভাটার “কোলাহলপূর্ণ শহর”। মাত্র ৩০.৩১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে ৩৬টি ইটভাটা, যার মধ্যে বর্তমানে ২৬টি চলছে। চলতি ও গত অর্থবছরে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ১৫–১৮টি ভাটার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, ইটভাটার ধোঁয়া, ধুলো এবং মাটিকাটা তাদের জীবনকে অচল অবস্থায় ফেলেছে। শিশু ও বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, চর্মরোগে ভুগছে। একই সঙ্গে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, ফসলের উৎপাদন কমছে, রাস্তা ও ঘরের টিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভাটার কার্যক্রম বেড়ে গেলে পুরো ইউনিয়ন ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। কৃষক ও স্থানীয়দের অভিযোগ মো. সোলাইমান মিয়া, স্থানীয় বাসিন্দা, জানান, “ইটভাটার কারণে আমাদের রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে। মাটি কাটার ফলে ফসলও কম হচ্ছে। আমরা বাজারে ফসল পাঠাতে পারি না। আমাদের অনুরোধ তারা মানে না।” ৭০ বছরের বৃদ্ধ কৃষক আওলাদ হোসেন বলেন, “আমাদের জমিতে আগে ৫ মন ফসল হত, এখন একই জমি থেকে দুই–তিন মনও হয় না। ইট খোলার মালিকরা জমি কেটে নেওয়ায় আমাদের ফসলের সমস্যা ছাড়াও রাস্তাঘাট ও ঘরের টিন নষ্ট হচ্ছে। আমরা প্রতিবাদ করলেও কোনো ফল পাচ্ছি না।” চরমগড়া গ্রামের আজগোর আলী বলেন, “রাস্তার অনেক ক্ষতি হয়েছে। ধুলোবালির কারণে ঘরের টিন নষ্ট হচ্ছে, ফলন কমে যাচ্ছে। চকের উর্বর মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমরা খুব অসুবিধার মধ্যে আছি।” ইটভাটার মালিকদের দাবি অন্যদিকে সিংগাইর ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন দাবি করেন, “আমাদের ইটভাটার ছিবনিগুলোতে পানি দেওয়া থাকে, যা ধোঁয়াকে ফিল্টার করে। ফসলের ক্ষতি হয় না। আমরা যে মাটি ব্যবহার করি, তা মূলত নিজেদের জমি থেকে নেওয়া হয়। এই মাটি এক ফসলি জমি হলেও পরিবেশের জন্য ক্ষতি নেই।” কৃষি কর্মকর্তার পর্যালোচনা বলধারা ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আফজাল হোসেন বলেন, “ইটভাটার ধোঁয়া ফসলের ক্ষতি করছে। আনুমানিক, চার ভাগের এক ভাগ ফসল কম হচ্ছে। আমাদের কৃষকেরা অনেক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এটা প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে।” পরিবেশ অধিদপ্তরের মন্তব্য মানিকগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, “একটি ইউনিয়নে কতগুলো ইটভাটা থাকা উচিত, তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মনীতি মেনে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। একটি ইটভাটার ধোঁয়া থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড ও সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হয়। ইটভাটা যত কম থাকবে, পরিবেশ তত ভালো থাকবে। বেশি ইটভাটা থাকলে অবশ্যই পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে।” কৃষি ও পরিবেশের ক্ষতি ইটভাটার ধোঁয়া শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়; এটি কৃষি উৎপাদন, রাস্তা, ঘর-বাড়ি ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যকেও প্রভাবিত করছে। ফসলের ক্ষতি: কৃষকেরা জানাচ্ছেন, ধোঁয়া ও মাটি কাটার কারণে ফসলের উৎপাদন আগের তুলনায় ৩০–৫০% কমে গেছে। রাস্তার অবনতি: ইটভাটার টলি গাড়ি চলাচলের ফলে গ্রামীণ রাস্তাগুলি ভেঙে গেছে, যা সরাসরি বাজারে ফসল পৌঁছানোর পথেও বাধা সৃষ্টি করছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি: শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, চর্মরোগ এবং অন্যান্য ফুসফুসজনিত সমস্যা বেড়েছে। পরিবেশ: চরমগড়া, চক ও অন্যান্য গ্রামের উর্বর মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিজমি ও গ্রামীণ পরিবেশের জন্য হুমকি। স্থানীয়দের চাওয়া গ্রামবাসী চাইছেন, ইটভাটার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হোক। “যদি ইটভাটা বন্ধ বা সীমিত করা যায়, আমাদের ফসল, রাস্তা এবং জীবনযাত্রা সবই ঠিক হয়ে যাবে,” বলছেন স্থানীয়রা।
ইটভাটার প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত, যেখানে স্থানীয় কৃষক, বৃদ্ধ ও শিশুদের জীবনমান হুমকির মুখে। পরিবেশ অধিদপ্তরের যথাযথ নজরদারি এবং ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষের সক্রিয় পদক্ষেপ ছাড়া সমস্যার সমাধান কঠিন। বলধারা ইউনিয়নের ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৩৬টি ইটভাটা স্থানীয়দের জীবন, কৃষি ও পরিবেশকে বিপন্ন করে তুলেছে। স্থানীয়রা এখন তাদের ফসল, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনের ক্ষতি মোকাবিলা করতে বাধ্য। দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা যদি সমাধান না হয়, তবে পুরো ইউনিয়নই ইটভাটার বিষাক্ত ছায়ায় হারিয়ে যাবে।