
-বাঁশখালী প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ৭ নম্বর দক্ষিণ সরল ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে এক মানসিক প্রতিবন্ধী কিশোরীর ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে পুরো এলাকা আজ আতঙ্ক, ক্ষোভ ও গভীর মানবিক সংকটে নিমজ্জিত। অভিযোগের ভয়াবহতা শুধু একটি অপরাধের বিবরণ নয়—এটি সমাজের নৈতিক ভিত কতটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে, তার নির্মম সাক্ষ্য। ভুক্তভোগী কাশেফা বেগম (২৩)–এর অভিযোগ অনুযায়ী, একই এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে ও সুযোগ বুঝে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে পরিচিত ও স্বজনসদৃশ ব্যক্তিদের নাম উঠে আসায় ঘটনাটি আরও মর্মান্তিক রূপ নিয়েছে। যে সমাজে মানুষ মানুষকে চেনে, যেখানে প্রতিবেশীর মুখে ভরসা থাকার কথা—সেই পরিবেশেই একজন মানসিক প্রতিবন্ধী নারী এমন নির্মমতার শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, বাড়ির পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে যাওয়ার সময় রিদওয়ান, হামিদু উল্লাহ ও খোরশেদ নামের তিন ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক মুখ চেপে ধরে নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। চিৎকার করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। সেখানে একে একে তার ওপর ধর্ষণ চালানো হয় বলে অভিযোগ। কাশেফা বেগম আরও জানান, মাহমুদ উল্লাহ (আনুমানিক বয়স ৪০) নামের এক ব্যক্তি বিভিন্ন সময় টাকার প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেছে। বাড়ির আশপাশে একা থাকার সুযোগ পেলেই এই নির্যাতন চলত। অভিযুক্ত ব্যক্তি বারবার হুমকি দিত—ঘটনা প্রকাশ পেলে তাকে হত্যা করা হবে। এই দীর্ঘ নির্যাতনের পরও কাশেফা যখন বিষয়টি পরিবারকে জানান, তখনও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। এতে তিনি আরও অসহায় হয়ে পড়েন এবং দীর্ঘ সময় নীরবে নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের আশায় তিনি আইনের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং মামলার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর পুরো এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায়, একজন মানসিক প্রতিবন্ধী নারীর ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। তারা অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, মানসিক প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীরা সমাজে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ভয়, নির্ভরশীলতা ও অসহায়তার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা তাদের সহজ শিকার বানায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা বিচার পায় না—এটাই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণ এমনিতেই একটি গুরুতর অপরাধ; ভুক্তভোগী যদি মানসিক প্রতিবন্ধী হন, তাহলে অপরাধের মাত্রা আরও ভয়াবহ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। দ্রুত তদন্ত, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ভুক্তভোগী কাশেফা বেগম প্রশাসনের কাছে একটাই আবেদন জানিয়েছেন “আমি আমার ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার চাই। যারা আমাকে কষ্ট দিয়েছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হোক।” স্থানীয় পরিবার, প্রতিবেশী ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, যদি এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার না হয়, তবে অপরাধীরা আরও সাহসী হবে এবং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে। সমাজকল্যাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক নজরদারি এবং প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা এখন সময়ের দাবি। নীরবতা নয়—প্রতিরোধই হতে হবে সমাজের ভাষা। এই ঘটনা শুধু বাঁশখালীর নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক দায়িত্ব রক্ষায় রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সমাজ—সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। কারণ, একজন অসহায় মানুষের আর্তনাদ উপেক্ষিত হলে, সেই সমাজ নিজেই একদিন কাঠগড়ায় দাঁড়ায়।