--সংসদ থেকে মো. কামাল উদ্দিনঃ
বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিল্পায়ন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মানচিত্রে চট্টগ্রাম একটি অনন্য নাম। হাজার বছরের বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের ধারক এই নগরী শুধু দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরই নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের প্রায় সমগ্র আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ, ভারী শিল্প, জাহাজ চলাচল, কনটেইনার পরিবহন, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং বিনিয়োগের বিশাল একটি অংশ চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। এমন একটি নগরীকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি আজকের নয়। এটি বহু দশকের পুরোনো দাবি। রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ, নাগরিক সংগঠন, শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং সচেতন নাগরিকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন—বাংলাদেশের অর্থনৈতিক হৃদস্পন্দনের নাম যদি ঢাকা না হয়ে থাকে, তবে সেটি নিঃসন্দেহে চট্টগ্রাম। সেই দীর্ঘদিনের দাবিই আবারও জাতীয় সংসদে জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়েছে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব জসীম উদ্দীন আহমেদের কণ্ঠে।
জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে তিনি জানতে চান, ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু দুই যুগেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও সেই ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বর্তমান সরকার কবে নাগাদ চট্টগ্রামকে বাস্তব অর্থে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে? প্রশ্নটি ছিল কেবল একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্ন নয়; এটি ছিল বৃহত্তর চট্টগ্রামের কোটি মানুষের মনের কথা। এটি ছিল বন্দরনগরীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, প্রত্যাশা এবং স্বপ্নের প্রতিফলন। ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার দাবির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামের এক বিশাল জনসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণার সময় সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যিনি নিজেও চট্টগ্রামের সন্তান এবং দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পক্ষে সোচ্চার। সেই ঘোষণার পর চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে নতুন স্বপ্নের জন্ম হয়েছিল। মানুষ মনে করেছিল, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে চট্টগ্রাম তার ন্যায্য মর্যাদা পাবে। বন্দর, বিমানবন্দর, শিল্পাঞ্চল, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে। কিন্তু নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার অভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি। সংসদে জসীম উদ্দীনের প্রশ্ন কেন গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রামের উন্নয়ন নিয়ে অতীতে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু জাতীয় সংসদের মতো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে বিষয়টি পুনরায় উত্থাপিত হওয়া বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এমপি জসীম উদ্দীন আহমেদ তাঁর প্রশ্নে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অবদানকারী অঞ্চলের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল সমগ্র বাংলাদেশ। দেশের রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোও গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম ও এর আশপাশে। অথচ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম এখনো কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায়নি। তাঁর প্রশ্ন সংসদে উত্থাপিত হওয়ার ফলে বিষয়টি নতুন করে জাতীয় আলোচনায় এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ইতিবাচক অবস্থান সংসদে দেওয়া লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামের গুরুত্বকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, আমদানি-রপ্তানির কেন্দ্রবিন্দু এবং শিল্প-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান নগরী। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের লক্ষ্যে চট্টগ্রামকে প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু একটি নাম বা ঘোষণা দিয়ে কোনো শহরকে বাণিজ্যিক রাজধানী বানানো যায় না। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী অবকাঠামো, আধুনিক বন্দর ব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর, দক্ষ নগর ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো।
তিনি জানান, আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, গভীর সমুদ্রবন্দর, ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা, সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা, রেল ও সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে ধাপে ধাপে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপান্তর করা হবে। এম এ হাশেম রাজুর উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া
জাতীয় সংসদে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উত্থাপন এবং প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক জবাবকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সহ-সভাপতি এম এ হাশেম রাজু। তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার দাবি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি চট্টগ্রামের মানুষের অস্তিত্ব, মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন। তিনি এমপি জসীম উদ্দীন আহমেদকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, জাতীয় সংসদে চট্টগ্রামের প্রাণের দাবিটি উত্থাপন করে তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের মনের কথা তুলে ধরেছেন। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যকে তিনি যুগোপযোগী ও আশাব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেন। এম এ হাশেম রাজু বলেন, “আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৩ সালে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। আজ সেই ঘোষণার ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টিকে পুনরায় গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এনেছেন। এটি চট্টগ্রামবাসীর জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি বার্তা।” তিনি চন্দনাইশসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সংসদ সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান। চট্টগ্রামের স্বপ্ন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামকে প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও গতিশীল হবে। চট্টগ্রামের মানুষ আজও বিশ্বাস করে, দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এই বন্দরনগরীর সম্ভাবনার মধ্যে। জাতীয় সংসদে এমপি জসীম উদ্দীনের উত্থাপিত প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ইতিবাচক জবাব এবং এম এ হাশেম রাজুর স্বাগত বক্তব্য নতুন করে সেই স্বপ্নকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। এখন চট্টগ্রামবাসীর একটাই প্রত্যাশা—২৩ বছর আগের ঘোষণাটি আর যেন কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। কারণ চট্টগ্রামের অগ্রগতি মানেই বাংলাদেশের অগ্রগতি, চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানেই জাতীয় অর্থনীতির আরও শক্তিশালী ভিত্তি নির্মাণ।