
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সময় সময় এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন ব্যক্তি নয়—একটি চিন্তাধারা সামনে চলে আসে। আজকের আলোচনায় সেই জায়গাতেই উঠে আসছেন সালাহউদ্দিন আহমেদএকজন রাজনীতিক, যিনি কেবল বক্তব্য দেন না, বরং যুক্তির শক্তিতে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন। সাম্প্রতিক বিতর্কে একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেন আইন নিয়ে কথা বলেন?” প্রশ্নটি শুনতে সাধারণ হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক ধরনের অস্বস্তি, এক ধরনের অক্ষমতা। কারণ, যখন যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা যায় না, তখনই প্রশ্নের আড়ালে আক্রমণের আশ্রয় নেওয়া হয়। বাস্তবতা হলো—সালাহউদ্দিন আহমেদ কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন মেধাবী ছাত্র, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করেছেন, বিসিএস ক্যাডার হিসেবে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। আইন, প্রশাসন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি—এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর একটি বাস্তবভিত্তিক উপলব্ধি রয়েছে। ফলে আইন নিয়ে তাঁর কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক নয়, বরং প্রাসঙ্গিকতারই দাবি রাখে। বিতর্কে পরাজয়, প্রশ্নে আশ্রয়: রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক সংকট যখন কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যুক্তির লড়াইয়ে টিকতে পারে না, তখন তারা ব্যক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পথ বেছে নেয়। এটি নতুন কিছু নয়; বরং এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পথ কি টেকসই? ইতিহাস বলছে, নয়। কারণ ব্যক্তি আক্রমণ সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু জনমত গঠন করতে পারে না। জনমত গড়ে ওঠে যুক্তি, তথ্য ও বাস্তবতার ওপর। সংগ্রামের ইতিহাস: একদিনে জন্ম নেয় না কোনো বিপ্লব বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে দীর্ঘ সংগ্রামের দিকে। শেখ হাসিনা-এর সরকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের কথা আজ বলা হচ্ছে, সেটি কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ নয়। এটি ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রয়াস।
বিএনপি সেই ধারাবাহিকতায় নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছিল। সভা-সমাবেশ, প্রতিবাদ, রাজনৈতিক বক্তব্য—এই সবকিছুর মাধ্যমে তারা জনমত তৈরি করেছে। জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে—কোথায় অন্যায় হচ্ছে, কোথায় রাষ্ট্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। রাজনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো—জনমত ছাড়া কোনো আন্দোলন সফল হয় না। আর সেই জনমত গড়ে তুলতে সময় লাগে, ধৈর্য লাগে, ধারাবাহিকতা লাগে। জুলাই আন্দোলন: আকস্মিক বিস্ফোরণ নয়, দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল
জুলাইয়ের আন্দোলন, যা শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের দিকে গিয়েছে—তা অনেকের কাছে হঠাৎ মনে হলেও বাস্তবে এটি ছিল একটি দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল। প্রথমে এটি ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন—একটি নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে শুরু হওয়া ছাত্র-আন্দোলন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক রূপ নেয়। এই রূপান্তর হঠাৎ হয়নি; এর পেছনে ছিল বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা ক্ষোভ, অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক প্রস্তুতি। যদি সেই পূর্বপ্রস্তুতি না থাকতো, যদি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন সরকারের জনপ্রিয়তা ক্ষয়প্রাপ্ত না হতো—তাহলে জুলাইয়ের আন্দোলন এত বড় আকার ধারণ করতো না। রাজনীতির ধারাবাহিকতা: শুরু যেমন নয়, শেষও নয় আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা দেখেছি—ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতার সংগ্রাম—প্রতিটি আন্দোলন পরবর্তী আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছে। একইভাবে বর্তমান সময়ের আন্দোলনও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রভাবিত করবে।
অতএব, একটি আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখে তার পূর্ণ মূল্যায়ন করা যায় না। এটি একটি ধারার অংশ—একটি চলমান ইতিহাসের অধ্যায়। চেতনার ব্যবহার ও অপব্যবহার: এক সতর্ক সংকেত সংসদে দেওয়া বক্তব্যে যখন বলা হয়—“রক্ত দিয়েছেন বলেই আজ ক্ষমতায়”—তখন সেই বক্তব্য আবেগ তৈরি করলেও বাস্তবতার প্রশ্ন তোলে। শুধু জুলাই আনদোলন-এর নাম উল্লেখ করে যে দাবি করা হয়েছে, তা একপাক্ষিক ব্যাখ্যা মাত্র। কারণ এই দেশের প্রতিটি আন্দোলনে, প্রতিটি পরিবর্তনে সাধারণ মানুষের অবদান রয়েছে। চেতনা একটি শক্তি—কিন্তু যখন সেটিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তখন সেটি তার মর্যাদা হারায়। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা মানে হলো—চেতনাকে সম্মান করা, কিন্তু তাকে অপব্যবহার না করা। ৭১-এর মর্যাদা: ইতিহাসের মূল ভিত্তি এই প্রেক্ষাপটে সালাহউদ্দিন আহমেদের একটি বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন—সব আন্দোলন এক নয়। ১৯৭১ আমাদের অস্তিত্বের লড়াই, আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ। এটি একটি অনন্য ইতিহাস, যার সঙ্গে অন্য কোনো আন্দোলনের তুলনা করা যায় না। জুলাইয়ের আন্দোলন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, সম্মানযোগ্য। কিন্তু সেটিকে ৭১-এর সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ইতিহাসের গভীরতাকে অস্বীকার করার শামিল। আমাদের মূল, আমাদের শেকড়—১৯৭১। সেই শেকড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা অন্যান্য আন্দোলনের মূল্যায়ন করবো—এটাই হওয়া উচিত ইতিহাসের প্রতি সম্মান। যুক্তি, জ্ঞান ও দায়িত্বশীল রাজনীতির প্রয়োজন আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—দায়িত্বশীল রাজনীতি। যেখানে বিতর্ক হবে, কিন্তু তা হবে তথ্যভিত্তিক। যেখানে বিরোধিতা থাকবে, কিন্তু তা হবে যুক্তিনির্ভর। যেখানে নেতৃত্ব থাকবে, কিন্তু তা হবে ইতিহাস-সচেতন। সালাহউদ্দিন আহমেদ সেই রাজনীতির একটি প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন—যেখানে আবেগের পাশাপাশি যুক্তি আছে, বক্তব্যের পাশাপাশি জ্ঞান আছে, এবং অবস্থানের পেছনে রয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা। রাজনীতির ময়দান শেষ পর্যন্ত তাদেরই স্বীকৃতি দেয়, যারা কেবল কথা বলেন না—বরং কথার পেছনে সত্য, যুক্তি ও দায়িত্ববোধ নিয়ে দাঁড়ান।

