
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের হাটহাজারী ধলই গ্রামের ভোরের শিশিরে যাঁর প্রথম সুরের জন্ম, সেই সুর আজও বাতাসে ভেসে বলে—ফরিদ নামটি অমর। এস. এম. ফরিদ ছিলেন শুধু মানুষ নন, এক অনির্বাণ ধ্রুবতারা, যাঁর কলমে গীত, যাঁর হৃদয়ে সুর, যাঁর কণ্ঠে ছিল প্রার্থনার ধ্বনি সারা। বেতারের মাইক্রোফোনে তিনি রাখতেন আত্মার স্পন্দন, টেলিভিশনের পর্দায় ছড়িয়ে দিতেন ভালোবাসার বন্ধন।
তাঁর সুরে কেঁদেছে রাত, তাঁর সুরে হেসেছে প্রভাত, তাঁর গানে লুকিয়ে আছে মানুষের সুখ-দুঃখের আখ্যানঘাট। আজ তিনি নীরব, তবু নন তিনি নিভে যাওয়া কোনো আলো— তিনি আছেন সুরের ভাঁজে, হৃদয়ের গভীরে, অনন্তকাল ভালো। তাঁকে নিয়ে আমার কিছু কথা বলার দায় আছে। কারণ আমি বিশ্বাস করি যাঁরা সমাজকে আলো দেন, তাঁদের কথা না বললে শব্দও একদিন লজ্জা পায়। এস. এম. ফরিদ ছিলেন তেমনই এক গুণী, যিনি সুর দিয়ে মানুষের অন্তরকে ছুঁয়েছেন। তাঁর সৃষ্টিতে ছিল মাটির গন্ধ, মানুষের কষ্টের অনুরণন, প্রেমের মাধুর্য আর আধ্যাত্মিকতার কোমল ছায়া। আমি যখন তাঁর জীবন ও কর্মের দিকে তাকাই, তখন দেখি—তিনি কেবল সুরকার নন, তিনি একজন নির্মাতা। তিনি কণ্ঠশিল্পীদের কণ্ঠে প্রাণ দিয়েছেন, নবীনদের হাতে স্বপ্ন তুলে দিয়েছেন, সংগীতাঙ্গনে শৃঙ্খলা ও নন্দনতত্ত্বের বীজ বপন করেছেন। তাঁর সান্নিধ্যে যারা এসেছে, তারা শুধু গান শেখেনি—মানুষ হওয়াও শিখেছে। একজন লেখক হিসেবে আমি বহু মানুষের গল্প লিখেছি, কিন্তু এস. এম. ফরিদকে নিয়ে লিখতে গিয়ে অনুভব করি এই লেখা কেবল শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, এটি এক আত্মিক স্বীকারোক্তি। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের গর্ব, আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। আজ তাঁর শারীরিক উপস্থিতি নেই, কিন্তু তাঁর সুর আছে। তাঁর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে তিনি আজও কথা বলেন—নীরবে, গভীরভাবে, অনুরণনের মতো। তাঁর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর স্মৃতি হোক আমাদের প্রেরণা, তাঁর সুর হোক আগামী প্রজন্মের আলোকপথ। পৃথিবীতে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের জীবন কেবল একটি ব্যক্তিগত অধ্যায় নয়—একটি সময়ের ইতিহাস। তাঁরা জন্ম নেন নিভৃত গ্রামে, কিন্তু তাঁদের সুর ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে; তাঁরা থাকেন সাধারণ ঘরে, কিন্তু তাঁদের সৃষ্টি জায়গা করে নেয় মানুষের হৃদয়ের অন্দরমহলে। চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ধলই গ্রামের এমনই এক গর্বিত সন্তান ছিলেন এস. এম. ফরিদ—বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক; একাধারে সুরের সাধক, বিনয়ের প্রতিমূর্তি এবং মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আজ তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে মনে হচ্ছে—আমি কোনো স্মৃতিচারণ করছি না, বরং এক আলোকিত সময়ের পুনরাবৃত্তি করছি। কারণ এস. এম. ফরিদ কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি সুরধারা, একটি নন্দনচেতনা, একটি সাংস্কৃতিক দায়বোধের নাম। শেকড়ের টান, মাটির গন্ধ ধলই গ্রামের নিসর্গ ছিল তাঁর প্রথম বিদ্যালয়। সবুজ ক্ষেতের দোলায়, ভোরের আজানে, সন্ধ্যার পাখির ডাকে, শীতের কুয়াশায়—তিনি শুনতেন এক অদৃশ্য সুর। হয়তো তখনই তাঁর মনে জন্ম নিয়েছিল সেই গভীর উপলব্ধি—জীবন নিজেই এক সঙ্গীত, কেবল তাকে শোনার কান চাই। শৈশব থেকেই সঙ্গীতকে তিনি হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। তাঁর কাছে গান ছিল না কেবল শিল্পের অনুশীলন; এটি ছিল আত্মার অন্বেষণ। তিনি জানতেন—সুর মানুষকে নরম করে, মানুষকে কাছে আনে, মানুষকে মানুষ হতে শেখায়। তাই জীবনের প্রতিটি মোড়ে তিনি সঙ্গীতকেই বেছে নিয়েছেন। সাধনা থেকে স্বীকৃতি সংগ্রাম ছাড়া বড় শিল্পী হওয়া যায় না। এস. এম. ফরিদের জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। সীমিত সুযোগ, সীমাবদ্ধ অবকাঠামো, গ্রাম থেকে শহরে পথচলার কণ্টকাকীর্ণ যাত্রা—সবকিছুকে অতিক্রম করে তিনি পৌঁছেছেন বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের সম্মানজনক অঙ্গনে। বেতারের মাইক্রোফোনের সামনে তাঁর সুর যেন নতুন প্রাণ পেত। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে তাঁর সুরারোপিত গান দর্শকদের হৃদয়ে গেঁথে যেত। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত ভারসাম্য—আধুনিকতার স্পর্শ, অথচ মাটির ঘ্রাণ অটুট। তাঁর সুরে কণ্ঠ মিলিয়েছেন দেশের খ্যাতিমান শিল্পীরা—সুবীর নন্দী, শাম্মী আক্তার, সামিনা চৌধুরী, ফাহমিদা নবী, শাকিলা জাফর, অ্যান্ড্রু কিশোর, প্রবাল চৌধুরী, তিমির নন্দী, খোরশেদ আলম এবং আরও অনেকে। এই শিল্পীদের কণ্ঠে তাঁর সুর শুধু পরিবেশিত হয়নি—উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। একজন সুরকার তখনই পূর্ণতা পান, যখন তাঁর সুর অন্যের কণ্ঠে নতুন জীবন লাভ করে। এস. এম. ফরিদ সেই পূর্ণতার অধিকারী ছিলেন। সুরের দর্শন: সহজে গভীর তাঁর সুরের বিশেষত্ব ছিল সরলতা। কিন্তু সেই সরলতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকত গভীরতা। তিনি জানতেন—অতিরিক্ত কারুকাজ কখনও কখনও আবেগকে আড়াল করে ফেলে। তাই তিনি সুরে রেখেছেন স্বচ্ছতা, রেখেছেন অনুভবের নির্ভেজাল প্রবাহ। লোকজ সুরের অনুরণন, আধুনিক সংগীতের ছন্দ, আধ্যাত্মিকতার মৃদু স্পর্শ—সব মিলিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব সঙ্গীতভুবন। তাঁর সুরে ছিল প্রেম, ছিল বেদনা, ছিল আশা, ছিল প্রার্থনা। তিনি বিশ্বাস করতেন—গান মানুষের আত্মাকে ছুঁতে না পারলে তার সার্থকতা নেই। তাই তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি ছিল এক একটি অনুভবের প্রতিফলন। মানুষ হিসেবে মহত্ত্ব শিল্পীর পরিচয় তাঁর সৃষ্টিতে, কিন্তু মানুষের পরিচয় তাঁর ব্যবহারে। এস. এম. ফরিদ ছিলেন সাদা মনের মানুষ—বন্ধুপরায়ণ, বিনয়ী, সহৃদয়। তিনি কখনও কৃতিত্ব নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হননি। বরং তরুণ শিল্পীদের উৎসাহ দিয়েছেন, ভুলকে ক্ষমা করেছেন, সম্ভাবনাকে লালন করেছেন। তাঁর আশপাশে থাকলে মানুষ স্বস্তি পেত, সাহস পেত। আজকের সময় যেখানে অহংকার অনেকের শিল্পকে গ্রাস করে, সেখানে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—বড় হতে হলে প্রথমে মানুষ হতে হয়। পারিবারিক উত্তরাধিকার ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা একজন মানুষের প্রকৃত সাফল্য তখনই পূর্ণ হয়, যখন তাঁর আদর্শ প্রজন্মের পর প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। ‘স্বরলিপি সাংস্কৃতিক অঙ্গন’ সেই ধারাবাহিকতারই প্রতীক। এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার, তাঁরই সন্তান শামসুল হায়দার তুষার, বাবার স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছেন। এটি কেবল একটি সংগঠন নয়; এটি এক উত্তরাধিকার, এক সুরের বৃক্ষ, যার শেকড় ফরিদের সাধনায় প্রোথিত। দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণসভা, দোয়া ও ইফতার মাহফিলের আয়োজন—এ শুধু আনুষ্ঠানিক স্মরণ নয়; এটি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ, ভালোবাসার পুনর্নবীকরণ। বিদায়ের বেদনা, অমরত্বের আলোকরেখা ১৫ মার্চ বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। (ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। কিন্তু মৃত্যু কি একজন শিল্পীকে মুছে দিতে পারে? যে সুর একবার মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, তা কি কখনও হারিয়ে যায়? রেডিওর আর্কাইভে, টেলিভিশনের স্মৃতিতে, শিল্পীদের কণ্ঠে, শ্রোতাদের হৃদয়ে—তিনি আজও বেঁচে আছেন। তাঁর অনুপস্থিতি একটি শূন্যতা, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিগুলো সেই শূন্যতাকে আলোকিত করে রাখে। একজন লেখকের অনুভব আমি বহু মানুষকে নিয়ে লিখেছি। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের নিয়ে লিখতে গিয়ে কলম আবেগে ভিজে যায়। এস. এম. ফরিদ তেমনই একজন। তাঁকে নিয়ে লিখতে পারা আমার কাছে গর্বের। কারণ তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের গর্ব, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ। আমি বিশ্বাস করি—বিশেষ মানুষরা পৃথিবীতে আসেন আলোর কাজ নিয়ে। তাঁরা প্রতিভা দিয়ে অন্ধকার দূর করেন, জ্ঞানের আলো জ্বালান, তারপর নীরবে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁদের আলো নিভে যায় না। এস. এম. ফরিদ ছিলেন সেই আলোকপুরুষদের একজন। তাঁর সুর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন যত কঠিনই হোক, সঙ্গীত তাকে কোমল করে তুলতে পারে। সুরের অনন্ত যাত্রা আজ যখন আমরা তাঁকে স্মরণ করি, তখন শোকের পাশাপাশি গর্বও অনুভব করি। গর্ব—এই মাটি এমন একজন শিল্পীকে জন্ম দিয়েছে। গর্ব—আমরা তাঁর সুরের সময়ের সাক্ষী হতে পেরেছি। তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করি। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আর আমরা যারা বেঁচে আছি—তাঁর সুরকে বাঁচিয়ে রাখাই হবে আমাদের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি। নতুন প্রজন্ম যেন জানে, এই বাংলায় একসময় একজন সুরকার ছিলেন, যিনি বিনয় দিয়ে মহত্ত্বকে ধারণ করেছিলেন, সুর দিয়ে হৃদয় জয় করেছিলেন। এস. এম. ফরিদ নেই—কিন্তু তাঁর সুর আছে। যতদিন এই বাংলার আকাশে গান ভাসবে, যতদিন মানুষ ভালোবাসবে সঙ্গীতকে, ততদিন ধলই গ্রামের সেই সুরের ধ্রুবতারা জ্বলে থাকবে—অমলিন, অনির্বাণ, অনন্ত।

