চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির প্রাঙ্গণে ২৭ মার্চ শুরু হওয়া ‘স্বাধীনতার ৫৪ উৎসব’ ও বই মেলা আজ ২৮ মার্চ সমাপ্ত হলো। কিন্তু এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি গান, প্রতিটি কবিতা, প্রতিটি বইয়ের পাতায় খোঁচা দেওয়া ইতিহাস এখনও বেঁচে আছে দর্শক, পাঠক ও লেখকের মনে। দুই দিন ধরে এই মেলা হয়ে উঠেছিল শুধুই একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়—এটি ছিল এক জীবন্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, এক চেতনার পুনর্জাগরণ। শহিদদের রক্তে লেখা ইতিহাস, মানুষের অবিনাশী স্বপ্ন, স্বাধীনতার প্রতি অটুট ভালোবাসা—সব মিলেমিশে এক অনবদ্য আলোকমেলায় রূপ নিয়েছিল। প্রথম দিনের আবির্ভাব: জ্ঞানের আলো ও কিশোর কবিতার সুর
সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে উদ্বোধন কার্যক্রম শুরু হলে পুরো প্রাঙ্গণ এক নতুন জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হলো। এম এ মালেকের প্রজ্ঞা, নেছার আহমদের সভাপতিত্ব, ড. আনোয়ারা আলম, অধ্যাপক এলিজাবেথ মুবাশ্বিরা, কায়েস চৌধুরী, কাজী রুন্নু বিলকিস, অধ্যাপক ফাতেমা জেবুন্নেসা, জসিম উদ্দিন খানের আলোচনায় মঞ্চ হয়ে উঠল এক জ্ঞানের দিগন্ত। স্বাগত বক্তব্যে নিজামুল ইসলাম সরফী এবং সঞ্চালনায় আয়েশা হক শিমু দর্শকদের মনকে এক অনন্য ভ্রমণে নিয়ে গেলেন। সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে কিশোর কবিতা উৎসবে কিশোরদের কণ্ঠে উঠে এলো স্বাধীনতার নতুন সুর। সিতাংশু কর, আবুল কালাম বেলাল, আনোয়ারুল হক নূরী, জাকির হোসেন কামাল, আকাশ আহমেদ, ওবায়দুল সমীর, অমিত বড়ুয়া, শুকলাল দাশ, ইসমাইল জসীম, সনজিত দে, জুবাইর জসীম, প্রদ্যোত কুমার বড়ুয়া, আখতারুল ইসলাম, কানিজ ফাতেমা, সুবর্ণা দাশ মুনমুন, লিটন কুমার চৌধুরী—তাঁদের কণ্ঠে ভেসে এলো এক নতুন বাংলাদেশের গল্প। সেই কণ্ঠ যেন স্বাধীনতার নতুন সূর্যের পদধ্বনি হয়ে হৃদয় স্পর্শ করল।
বিকেল: সৃষ্টির আড্ডা ও নতুন চিন্তার দ্বার বিকেল ৩টা ৫৯ মিনিটে প্রফেসর রীতা দত্ত, রোকেয়া হক ও রিটন কুমার বড়ুয়ার উপস্থিতিতে আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই প্রতিযোগিতা শুধু প্রতিভার প্রকাশ নয়—এটি ছিল স্বাধীনতার প্রতি আবেগের চিত্র ও শব্দের মিলন। বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে “বিশ্বভরা প্রাণ”-এর সুরে স্বাধীনতার গান পুরো প্রাঙ্গণ ভরিয়ে তুলল, আর ৪টা ৩০ মিনিটে অভীক ওসমানের সভাপতিত্বে তরুণ লেখক ও কবিদের আলোচনায় উঠে এলো স্বাধীনতার গভীরতা, মানুষের অধিকার ও সৃষ্টিশীলতার নতুন দিগন্ত। ৫টা থেকে শুরু হওয়া কবিতা উৎসব—জাহাঙ্গীর আজাদ থেকে রেহেনা আকতার—প্রতিটি কণ্ঠে হয়ে উঠল সময়ের দলিল। ৫টা ৪৫ মিনিটে কাসেম আলী রানা, ইফতেখার মারুফ, রুনা তাসমিনা, লিপি বড়ুয়ার গল্পবক্তৃতায় জীবন, সংগ্রাম ও আনন্দের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল। ৬টা ১৫ মিনিটে বই ও সাহিত্য নিয়ে ড. নারায়ন বৈদ্য, ড. উজ্জ্বল কুমার দেব, শাকিল আহমেদ, ড. শ্যামল কান্তি দত্ত, ড. বিকিরণ বড়ুয়া, রেজাউল করিম স্বপন, মোহাম্মদ জহির, সালাউদ্দিন শাহরিয়ার, শাহেদ আলী টিটুর আলোচনায় বইয়ের ভবিষ্যৎ ও পাঠকের নতুন দিগন্ত নিয়ে ভাবনা জাগল। সন্ধ্যা ৭টায় ছড়া উৎসবে সৈয়দ জিয়াউদ্দীন থেকে শুভাশীষ দত্ত—ছন্দে ছন্দে জীবনকে নতুনভাবে দেখালেন। প্রতিটি ছড়া, প্রতিটি লাইন যেন সময়ের বাঁধন ছিঁড়ে স্বাধীনতার শ্বাস-প্রশ্বাস হয়ে উঠল। দ্বিতীয় দিন: সম্মান, সৃষ্টির পুনরাবৃত্তি ও কবিতার মহাসমুদ্র ২৮ মার্চের শুরু হয় সম্মানের আলোয়। তহুরীন সবুর ডালিয়া, সাইফুদ্দিন আহমেদ সাকীসহ গুণীজনদের উপস্থিতিতে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এরপর শুরু হয় ছড়া উৎসব, আবৃত্তি, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন—সব মিলিয়ে সৃষ্টি ও স্বীকৃতির এক অপূর্ব সমন্বয়। সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে কবিতা উৎসবের দ্বিতীয় পর্বে ইউসুফ মুহাম্মদ থেকে মোহাম্মদ আইয়ুব—অসংখ্য কবির কণ্ঠে সৃষ্টি হলো এক মহাসমুদ্র। মো. কামাল উদ্দিন-এর উপস্থিতি এই মিলনমেলাকে আরও অর্থবহ করেছে—একজন লেখক, সাংবাদিক ও কবির মিলিত পরিচয় হয়ে। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কবিতা, প্রতিটি কণ্ঠ যেন স্বাধীনতার পথে নতুন আলোকবর্তিকা হয়ে উঠল।
রাত ৮টায় সমাপনী অনুষ্ঠান হলেও এই উৎসবের প্রভাব চিরকাল বেঁচে থাকবে। শব্দই হলো সেতু, সাহিত্য হলো আলো, আর মানুষই হলো শক্তি। বই মেলার প্রতিটি স্টল, প্রতিটি বইয়ের পাতায়, প্রতিটি লেখকের কথায় ফুটেছে স্বাধীনতার চেতনা, মানবিকতা এবং সৃষ্টিশীল শক্তি। এই দুই দিনের মেলা শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়—এটি স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের স্মরণ, নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। জীবনমুখী কবিতা: স্বাধীনতার এই মেলা স্বাধীনতার এই মেলায় মানুষ আসে হাতে হাত রেখে—কেউ কবিতা হয়ে, কেউ গান হয়ে, কেউ বা নীরব ইতিহাস বয়ে। শিল্পকলার প্রাঙ্গণে শহিদদের রক্তের গন্ধ মিশে আছে বাতাসে। নাম না জানা মুখগুলো চেয়ে আছে আমাদের দিকে, বলছে, “তোমরা কি ভুলে যাওনি তো?” কিশোর কণ্ঠে কবিতা ওঠে—সেই শব্দে ভেসে আসে এক নতুন সূর্যের প্রতিধ্বনি। গান, কবিতা, গল্প—সব মিলিয়ে স্বাধীনতার এই মেলা হয়ে উঠল চেতনার, শব্দের, এবং সৃষ্টিশীল শক্তির এক অপূর্ব মিলনমেলা। আমরা—লেখক, পাঠক, দর্শক—এই মেলার অংশ হয়ে বেঁচে থাকি। শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, স্বাধীনতার আলোকে চিরজাগরুক রাখি। এবং চলি চলতেই থাকি, শব্দের সৈনিক হয়ে, স্বাধীনতার পথ ধরে…