-মো. কামাল উদ্দিনঃ
স্বাধীনতার ইতিহাস বনাম রাষ্ট্রক্ষমতার রাজনীতি মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত স্বাধীনতার ইতিহাস। পৃথিবীর প্রতিটি জাতি, প্রতিটি রাষ্ট্র এবং প্রতিটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, রক্ত এবং আত্মোৎসর্গের এক গৌরবময় কাহিনি। কোনো দেশই একদিনে স্বাধীন হয়নি। স্বাধীনতার পেছনে কাজ করেছে রাজনৈতিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক জাগরণ, জনমত গঠন এবং জনগণকে সংগঠিত করার সক্ষমতা। আর এই দীর্ঘ সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক সংগঠন এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কিছু রাজনৈতিক সংগঠনের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে, যারা জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে। জনগণের ভাষা, অধিকার, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিকে সংগঠিত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই দলগুলোর নেতারা কারাগারে গেছেন, নির্বাসিত হয়েছেন, মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন কিংবা জীবন উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি কম আলোচিত অধ্যায় হলো—স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামকারী এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নেতৃত্বদানকারী কোনো কোনো রাজনৈতিক দল পরবর্তীকালে নিষিদ্ধ হয়েছে, দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে কিংবা রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি ইতিহাসের এক গভীর বৈপরীত্য। একদিকে একটি দল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দেয়, অন্যদিকে সেই রাষ্ট্রেরই কোনো এক পর্যায়ে সেই দলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। কখনো সামরিক সরকার, কখনো বিপ্লবী শাসন, কখনো আদর্শিক সংঘাত, আবার কখনো রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতা এই পরিস্থিতির জন্ম দেয়। দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রধান শক্তি ANC-কে ১৯৬০ সালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বর্ণবাদী সরকার মনে করেছিল আইন, প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তি ব্যবহার করে আন্দোলনকে চিরতরে দমন করা সম্ভব হবে। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন কথা বলেছে। নিষিদ্ধ হওয়ার তিন দশক পর সেই ANC-ই দক্ষিণ আফ্রিকার গণতান্ত্রিক রূপান্তরের নেতৃত্ব দেয় এবং নেলসন ম্যান্ডেলা রাষ্ট্রপতি হন। একই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকার রাজনৈতিক বিরোধীদের দুর্বল করতে ১৯৬৮ সালে "Prohibition of Political Interference Act" প্রণয়ন করে। আইনটির ভাষা ছিল প্রশাসনিক, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক। বহুজাতিক ও বহু-বর্ণভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে কার্যত অকার্যকর করে দেওয়া হয়। লিবারেল পার্টি অব সাউথ আফ্রিকা বিলুপ্ত হতে বাধ্য হয়। কিন্তু ইতিহাসে আজ সেই আইনকে গণতন্ত্রবিরোধী এবং বৈষম্যমূলক আইন হিসেবে বিবেচনা করা হয়; আর যাদের দমন করা হয়েছিল, তারাই ইতিহাসে সম্মানিত। মিয়ানমারের ক্ষেত্রেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী NLD সামরিক শক্তির কাছে পরাজিত হলেও ইতিহাসে তাদের অবস্থান অক্ষুণ্ণ রয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতা তাদের সংগঠনকে দুর্বল করতে পেরেছে, কিন্তু জনগণের স্মৃতি থেকে তাদের মুছে ফেলতে পারেনি। আলজেরিয়া, জিম্বাবুয়ে, অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিকসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রক্ষমতা ও আন্দোলনের আদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জে সমালোচিত হয়েছে। কিন্তু তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবদান কখনো অস্বীকার করা যায়নি। ইতিহাসের একটি মৌলিক সত্য হলো—রাষ্ট্রক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু ইতিহাস দীর্ঘস্থায়ী। একটি সরকার পাঁচ বছর, দশ বছর কিংবা বিশ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারে। কিন্তু একটি জাতির ইতিহাস শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকে। এই কারণেই ইতিহাসবিদরা রাজনৈতিক দল সম্পর্কে দুটি পৃথক মূল্যায়নের কথা বলেন। প্রথমটি হলো দলটির বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দ্বিতীয়টি হলো জাতির ইতিহাসে তার অবদান। একটি দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে, বিচার হতে পারে, এমনকি আইনগত নিষেধাজ্ঞাও আসতে পারে। কিন্তু সেই দল যদি একটি জাতির স্বাধীনতা, মুক্তি কিংবা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে, তাহলে সেই অবদান ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবে। ইতিহাসকে আদালতের রায় দিয়ে পরিবর্তন করা যায় না। গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে ইতিহাস পুনর্লিখন করা যায় না। আইন দিয়ে সংগঠন নিষিদ্ধ করা সম্ভব, কিন্তু মানুষের স্মৃতি, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। কারণ বাংলাদেশের জন্মও একটি রাজনৈতিক আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ফলে স্বাধীনতার ইতিহাস ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। স্বাধীনতার ইতিহাস, আওয়ামী লীগ এবং রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিতর্ক প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি, বিশ্ব ইতিহাসে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা বিরল হলেও নজিরবিহীন নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, মিয়ানমার এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে পারলেও তার ঐতিহাসিক অবদানকে মুছে ফেলতে পারে না। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাও সেই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নাম গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর দলটি ধীরে ধীরে পূর্ব বাংলার বাঙালি জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রধান বাহকে পরিণত হয়। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিরোধী আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে দলটি স্বাধীনতার সংগ্রামের কেন্দ্রীয় শক্তি হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভূমিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের একটি অপরিহার্য অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত প্রবাসী সরকার, আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টি এবং মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বে দলটির অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতি কখনো সরলরেখায় এগোয়নি। সামরিক শাসন, অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, গণআন্দোলন এবং ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বহুবার মোড় পরিবর্তন করেছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় আওয়ামী লীগ যেমন ক্ষমতায় এসেছে, তেমনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকেছে। দলটি যেমন প্রশংসা অর্জন করেছে, তেমনি কঠোর সমালোচনার মুখেও পড়েছে। বিশেষত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচন ব্যবস্থা, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহারের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দল, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন মহল থেকে নানা অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। অন্যদিকে দলটির সমর্থকরা উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ডিজিটাল রূপান্তরের সাফল্যের কথা তুলে ধরেছেন। এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এটিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। এখানেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—কোনো রাজনৈতিক দলের বর্তমান কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ঐতিহাসিক অবদানের মূল্যায়ন কি এক জিনিস? বিশ্ব ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, এই দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। একটি দল রাষ্ট্র পরিচালনায় ভুল করতে পারে, সমালোচিত হতে পারে কিংবা আইনগত জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে পারে। কিন্তু যদি সেই দল একটি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে, তাহলে সেই অবদান ইতিহাসের অংশ হিসেবেই থেকে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় ANC নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামে তাদের অবদান অস্বীকার করা যায়নি। মিয়ানমারে NLD দমন-পীড়নের মুখে পড়েছে, কিন্তু গণতন্ত্রের আন্দোলনে তাদের ভূমিকা মুছে যায়নি। একইভাবে বিশ্বের বহু দেশে রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হলেও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পরিবর্তিত হয়নি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ইতিহাসের বিচার একদিন ইতিহাসই করবে। আদালত আইনগত বিষয়ের নিষ্পত্তি করতে পারে, সরকার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারে; কিন্তু ইতিহাসের চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ধারণ করে সময়, গবেষণা এবং জনগণের স্মৃতি। জাতির ইতিহাস কখনো একক ব্যক্তি বা একক দলের সম্পত্তি নয়। আবার কোনো জাতির ইতিহাস থেকে কোনো রাজনৈতিক শক্তির অবদানও সম্পূর্ণ মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাসের শক্তি এখানেই—সে শেষ পর্যন্ত দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে ধারণ করে। বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা—সবকিছুই একদিন ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে। তখন ইতিহাসবিদরা শুধু রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘটনাই নয়, সেই নিষেধাজ্ঞার পটভূমি, কারণ, প্রভাব এবং জাতীয় জীবনে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও মূল্যায়ন করবেন। সুতরাং ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করা সম্ভব, কিন্তু ইতিহাসকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতার জন্য যারা সংগ্রাম করেছে, যারা জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে, তাদের স্থান ইতিহাসের পাতায় থেকেই যায়। রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তিত হয়, সরকার আসে ও যায়, আইন সংশোধিত হয়, রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যায়; কিন্তু ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে। আর সেই ইতিহাসই একদিন নির্ধারণ করে দেয় কে সাময়িক ক্ষমতার অধিকারী ছিল এবং কে জাতির দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।