মো.কামাল উদ্দিনঃ শৈলী প্রকাশনের আয়োজন এবং বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমির সহযোগিতায় চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি হয়ে উঠেছিল দুই দিনব্যাপী স্বাধীনতার বই উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। আকাশে ভেসে চলছিল বেলুনের রঙিন ঝলকানি, বাতাসে বইয়ের কাগজ, কালি এবং স্বাধীনতার ইতিহাসের মিশ্রিত সুবাস। প্রতিটি পদক্ষেপে অনুভূত হত উৎসবের উত্তেজনা; এখানে প্রতিটি শিশু, কিশোর, লেখক, কবি, সাংবাদিক এবং স্বাধীনতা প্রেমি যেন একত্রিত হয়ে এক সাহিত্যসেতু গড়ে তুলেছে। শুক্রবার সকাল ১০টায় একুশে পদকপ্রাপ্ত সংবাদ ব্যক্তিত্ব, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বেলুন উড়িয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। 
তার কণ্ঠস্বরের গভীরতা শোনার সঙ্গে সঙ্গে অনুভূত হত ইতিহাসের স্পন্দন। তিনি বলেন, “সাধারণ হতে পারাটা এক অসাধারণ কাজ। আমরা সকলে সাধারণ হতে পারি না। এই সাধারণ হওয়ার চর্চা আমাদের করতে হবে। একজন মানুষের সৌন্দর্য তার অহংকার নয়, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই নিহিত।” তিনি আরও যোগ করেন, “ফুল ভালোবাসার প্রতীক। কিন্তু বই উপহার দিলে তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হলো বই। আলেকজেন্দ্রিয়ার ১৬ তলা বিশিষ্ট লাইব্রেরি ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা আমার মনে চিরকাল অম্লান। আমাদের আজাদী অফিসেও ছোট লাইব্রেরি আছে, যা করোনা পূর্বে পাঠকের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা চাইলে আবার খোলা সম্ভব।”
তার বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ যেন প্রত্যেক পাঠককে বইয়ের প্রতি নতুন উদ্দীপনা যুগিয়ে দিচ্ছিল। “বই আমাদের আলোর সন্ধান দেয়। যত বেশি জানব, তত বেশি শিখব। একটি ভালো বই বন্ধুর সমান, আর একজন ভালো মানুষ পুরো লাইব্রেরির সমান।” উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রাবন্ধিক নেছার আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। আলোচনায় অংশ নেন সাহিত্যিক অধ্যক্ষ ড. আনোয়ারা আলম, ব্যাংক এশিয়ার উপ–ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়েস চৌধুরী, প্রাবন্ধিক কাজী রুনু বিলকিস, অধ্যাপক ফাতেমা জেবুন্নেসা, এবং গীতিকার জসিম উদ্দিন খান। স্বাগত বক্তব্য দেন উৎসবের সদস্য সচিব প্রাবন্ধিক নিজামুল ইসলাম সরফী। উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন উঠোন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের শিল্পীরা, যার সুর যেন পুরো একাডেমিকে আলোকিত করে দিয়েছে। প্রত্যেকটি সুরে ইতিহাসের স্পন্দন, স্বাধীনতার চেতনা এবং সাহিত্যিক অনুপ্রেরণার সংযোগ অনুভূত হচ্ছিল। সকাল সোয়া ১১টায় অনুষ্ঠিত হলো স্বাধীনতার কিশোর কবিতা উৎসব, উদ্বোধন করেন শিশুসাহিত্যিক অরুণ শীল। কবি আজিজ রাহমানের সভাপতিত্বে পাঠ করেন: আবুল কালাম বেলাল, আনোয়ারুল হক নূরী, জাকির হোসেন কামাল, আকাশ আহমেদ, ওবায়দুল সমীর, অমিত বড়ুয়া, ইসমাইল জসীম, সনজিত দে, প্রদ্যোত কুমার বড়ুয়া, আখতারুল ইসলাম, কানিজ ফাতিমা, সুবর্ণা দাশ মুনমুন, লিটন কুমার চৌধুরী।
শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন অঞ্জলি বড়ুয়া, যার কণ্ঠস্বর ও উপস্থিতি শিশু-কিশোরদের মনে বই ও কবিতার প্রতি আগ্রহ উদ্দীপিত করেছিল। এই কবিতা পাঠ প্রতিটি অংশগ্রহণকারীকে অনুপ্রাণিত করে পাঠ্যসাহিত্য, চিত্রকলা এবং সৃজনশীলতার সঙ্গে স্বাধীনতার মেলবন্ধনে যুক্ত করেছিল। বিকেল সোয়া ৩টায় অনুষ্ঠিত হয় আবৃত্তি ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, উদ্বোধন করেন প্রফেসর রীতা দত্ত। শৈলীর উপদেষ্টা শিশু সাহিত্যিক রাশেদ রউফ এর সঞ্চালনায় আলোচক ছিলেন রিটন কুমার বড়ুয়া। এরপর স্বাধীনতার গান পরিবেশন করেন বিশ্বভরা প্রাণ এবং চট্টগ্রাম জেলা কমিটির শিল্পীবৃন্দ। প্রতিটি সুর, প্রতিটি আবৃত্তি যেন পাঠকদের মনে ইতিহাস ও শিল্পের এক অনন্য সমন্বয় তৈরি করছিল। অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন শিমলী দাশ, যার তত্ত্বাবধানে প্রতিটি অনুষ্ঠান সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়। এরপর অনুষ্ঠিত হলো আলোচ্য পর্ব “আমার লেখায় আমার স্বাধীনতা”, সভাপতিত্ব করেন অভীক ওসমান, আলোচক ছিলেন নাসের রহমান, দীপক বড়ুয়া, বিচিত্রা সেন, রশীদ এনাম। বিকেল ৫টায় শুরু হয় স্বাধীনতার কবিতা উৎসব পর্ব–১, উদ্বোধন করেন কবি খুরশীদ আনোয়ার, সভাপতিত্ব করেন কবি আকতার হোসাইন।
অংশ নেন কবিরা: জাহাঙ্গীর আজাদ, কল্যাণ বড়ুয়া, মুহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী, শামীম ফাতেমা মুন্নী, ফারহানা ইসলাম রুহী, শাহিদা জাহান, শিরিন আফরোজ, পুষ্পিতা সেন, উজ্জ্বল সম্পু, জেবারুত সাফিনা, চাঁদ সুলতানা নকশী, সৈয়দা করিমুননেসা, মোহাম্মদ ইসমাইল, নাহিদ আকতার লাকী। সন্ধ্যা ৫.৪৫টায় অনুষ্ঠিত হলো স্বাধীনতার গল্প পাঠ, উদ্বোধন করেন কবি ওমর কায়সার। এতে অংশ নেন গল্পকার কাসেম আলী রানা, ইফতেখার মারুফ, রুনা তাসমিনা, লিপি বড়ুয়া। সভাপতিত্ব করেন মো. মাজহারুল হক, আলোচনায় অংশ নেন প্রফেসর নারায়ণ বৈদ্য, ড. উজ্জ্বল কুমার দেব, ড. শ্যামল কান্তি দত্ত, রেজাউল করিম স্বপন, মোহাম্মদ জহির, সালাউদ্দিন শাহরিয়ার, শাহেদ আলী টিটু। স্বাধীনতার ছড়া উৎসব পর্ব–১ উদ্বোধন করেন বিপুল বড়ুয়া, সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার। বিকেল ৩.৫৯টায় অনুষ্ঠিত হলো আবৃত্তি ও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ, উদ্বোধন করেন অধ্যক্ষ তহুরীন সবুর ডালিয়া, সভাপতিত্ব করেন প্রাবন্ধিক সাইফুদ্দিন আহমেদ সাকী। বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিত হলো স্বাধীনতার ছড়া উৎসব পর্ব–২, উদ্বোধন করেন ছড়াকার উৎপলকান্তি বড়ুয়া, সভাপতিত্ব করেন শিক্ষাবিদ মর্জিনা আখতার। সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় অনুষ্ঠিত হলো স্বাধীনতার কবিতা আবৃত্তি, উদ্বোধন করেন কবি সুলতানা নুরজাহান রোজী, অংশ নেন সৌভিক চৌধুরী, সিমলা চৌধুরী, মলিনা মজুমদার, রিনিক মুন, এস টিএফ যুঁথী, সুপ্রিয়া বড়ুয়া, এনায়েত হোসেন পলাশ।সন্ধ্যা ৬টায় অনুষ্ঠিত হলো নতুন বইয়ের পাঠ উন্মোচন উৎসব, উদ্বোধন করেন কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী, সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক কাঞ্চনা চক্রবর্তী। ৬.৪৫টায় অনুষ্ঠিত হলো স্বাধীনতার গান–পর্ব–২, উদ্বোধন করেন ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, সংগীত পরিবেশনায় ছিলেন শিউলী নাথ, কাকলী দাশগুপ্ত, মিতা দাশ, সত্যজিৎ দাশ কাঞ্চন, কুমুদিনী কলি, বনানী শেখর রুদ্র। রাত ৭.১৫টায় অনুষ্ঠিত হলো স্বাধীনতার কবিতা উৎসব পর্ব–২, উদ্বোধন করেন কবি রিজোয়ান মাহমুদ, সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মৃণালিনী চক্রবর্তী। কবিতা পাঠে অংশ নেন ইউসুফ মুহাম্মদ, মাহবুবা চৌধুরী, অঞ্জলি বড়ুয়া, স্বপন কুমার বড়ুয়া, নাসিম আখতার রীনা, তালুকদার হালিম, তাহেরা বেগম, জিতেন্দ্রলাল বড়ুয়া, দীপিকা বড়ুয়া, বাবুল কান্তি দাশ, মোঃ কামাল উদ্দিন, সেলিম তালুকদার আকাশ, আয়েশা পারভীন চৌধুরী, তানভীর হাসান বিপ্লব, সুমি দাশ, স্মরণিকা চৌধুরী, তানজিনা রাহী, নাজনীন আমান, মুহাম্মদ এনামুল হক মিঠু, রাফিয়া ডলি, এস. সুদত্ত বড়ুয়া, দিলরুবা খানম রুবি, রূপম চক্রবর্তী, কস্তুরী সিংহ, সুষ্মিতা তালুকদার মিতুল, ডা. বরুণ কুমার আচার্য, সেবপ্রিয় বড়ুয়া, সুজিত চৌধুরী, শর্মি বড়ুয়া, স্বপ্না রানী বড়ুয়া, রাজশ্রী মজুমদার, আসিফ ইকবাল, আবদুল হান্নান হীরা, মোহাম্মদ আইয়ুব। রাত ৮টায় অনুষ্ঠিত হলো সমাপনী অনুষ্ঠান, আলোচক ছিলেন মোহাম্মদ জহির, শঙ্কর প্রসাদ দে, রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, খনরঞ্জন রায়। কবিতা, গান ও কথামালার মাধ্যমে দুই দিনের উৎসবের পরিপূর্ণ সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। উৎসবের সফলতার পেছনে ছিল শৈলীর কর্ণধার, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কবি রাশেদ রউফ, শৈলীর প্রকাশক আয়েশা হক শিমু, উদযাপন পরিষদের সভাপতি প্রাবন্ধিক নেছার আহমেদ, এবং সদস্য সচিব প্রাবন্ধিক নিজামুল ইসলাম সরফী। এই মিলনমেলা কেবল পাঠকসংখ্যা বাড়ায়নি, নতুন লেখক, কবি ও শিল্পীর সঙ্গে পাঠকের সরাসরি সংযোগ তৈরি করেছে। চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি হয়ে উঠেছিল সাহিত্য, স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক প্রাণবন্ত মিলনক্ষেত্র। বই, কবিতা, গান, আবৃত্তি, চিত্রাংকন—সবকিছু মিলিয়ে এটি সাফল্যের এক অনন্য উদাহরণ। পাঠক, লেখক ও শিল্পীর হৃদয় মিলেছিল ইতিহাস ও স্বাধীনতার আবহে।