চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত এন. মোহাম্মদ ফ্যাক্টরিকে ঘিরে দিন দিন বাড়ছে শ্রমিক অসন্তোষ ও বিতর্ক। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের একটি বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই কারখানাটি এখন শ্রমিক নির্যাতন, শ্রম আইন অমান্য এবং সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিককে বাধা দেওয়ার অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। স্থানীয় সূত্র, শ্রমিকদের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক বলেই মনে করছেন সচেতন মহল। শ্রমিকদের অভিযোগ, কারখানায় প্রতিদিন তাদের দিয়ে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হয়।

অথচ দেশের প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিকের দৈনিক কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টার বেশি হওয়ার কথা নয়। অতিরিক্ত সময় কাজ করালে তা ওভারটাইম হিসেবে গণ্য করে বাড়তি পারিশ্রমিক দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু অনেক শ্রমিকের দাবি—অতিরিক্ত সময় কাজ করলেও সেই কাজের সঠিক হিসাব রাখা হয় না এবং ন্যায্য ওভারটাইমও তারা পান না। ফলে বছরের পর বছর ধরে শ্রমিকরা এক ধরনের নীরব শোষণের মধ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। আরও একটি বিষয় শ্রমিকদের ক্ষোভকে তীব্র করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস, অর্থাৎ ১লা মে—যে দিনটি সারা বিশ্বে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে পালন করা হয়—সেই দিনেও এই কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চালু থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এই দিনে ছুটি বা বিশেষ কর্মসূচি থাকলেও বোয়ালখালীর এই কারখানায় শ্রমিকদের নিয়মিত কাজ করতে বাধ্য করা হয় বলে তারা জানান।
স্থানীয়দের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো—বোয়ালখালীর বহু শ্রমিককে ধীরে ধীরে ছাঁটাই করে অন্য জেলা থেকে শ্রমিক এনে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে রংপুর অঞ্চল থেকে লোক এনে বেশি মজুরিতে চাকরি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন শ্রমিকরা। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, বোয়ালখালীর মাটিতে প্রতিষ্ঠিত একটি কারখানায় প্রথম অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত বোয়ালখালীর মানুষেরই। কারখানার ভেতরের ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে মামা-ভাগিনা জুটি মোস্তাক ও সুমনের নাম নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। শ্রমিকদের দাবি, তাদের কিছু সিদ্ধান্ত এবং আচরণ কারখানার পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। শ্রমিকদের একটি অংশের মতে, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও কঠোর মনোভাবের কারণে এখন কারখানায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি এই পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে এক সাংবাদিকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাও নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। জানা যায়, শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে ওই সাংবাদিক কারখানার আশপাশে গেলে তাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয় এবং বিভিন্নভাবে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা হয়। এমনকি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলা বা ছবি তোলার ক্ষেত্রেও তাকে বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে স্থানীয় কিছু মানুষের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় সাংবাদিক সমাজে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং অনেকে এটিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। প্রবীণ শ্রমিকদের মতে, অতীতে যখন কারখানার প্রশাসনিক দায়িত্বে ওয়াদুদ সাহেব এবং শাহীন আলম ছিলেন, তখন শ্রমিকদের সঙ্গে ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল। তখন এত বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষ বা উত্তেজনা তৈরি হয়নি। কিন্তু বর্তমানে প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিয়েছে বলে শ্রমিকরা অভিযোগ করছেন।
বোয়ালখালীর সচেতন নাগরিকদের মতে, বিষয়টি এখন কেবল একটি কারখানার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এটি শ্রমিক অধিকার, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। তারা মনে করেন, শ্রম অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উচিত দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করা এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা। এলাকাবাসীর দাবি—কারখানায় শ্রম আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, অতিরিক্ত সময় কাজের সঠিক হিসাব ও ন্যায্য ওভারটাইম নিশ্চিত করতে হবে এবং স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সুনাম কেবল উৎপাদনের উপর নির্ভর করে না; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শ্রমিকদের অধিকার, মানুষের আস্থা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নও। সেই দায়বদ্ধতা রক্ষা না করলে কোনো শিল্পই দীর্ঘদিন সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে পারে না।