মাটিরাঙ্গায় কপি চাষে বাম্পার ফলনের হাসি: সবুজের ভাঁজে কৃষকের নতুন স্বপ্ন

0
107

সবুজে মোড়া বাঁধাকপির ভাঁজে লুকিয়ে আছে কৃষকের স্বপ্ন—এ যেন মাটিরাঙ্গার শীতকালীন কৃষির প্রাণস্পন্দন। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় চলছে ফুলকপি-বাঁধাকপি চাষের বর্ণিল মৌসুম। মাঠের পর মাঠজুড়ে সবুজের ঢেউ যেন চোখ ঠান্ডা করে। অনুকূল আবহাওয়া, কৃষি বিভাগের সঠিক পরামর্শ আর কৃষকদের নিরলস পরিশ্রম—সব মিলিয়ে এ মৌসুমে কপির বাম্পার ফলনের আশায় বুক বেঁধেছেন সবাই। মৌসুমি এই ব্যস্ততা স্থানীয় অর্থনীতিতে এনেছে নতুন প্রাণ, বাড়ছে কৃষকের আয়, বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা। উপজেলা কৃষি দপ্তরের তথ্য বলছে—২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৫ হেক্টর জমিতে ফুলকপির আবাদ হয়েছিল, উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৭০০ মেট্রিক টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও সমপরিমাণ জমিতে চাষ হয়েছে, আর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন আরও বাড়বে। একইভাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩০ হেক্টর জমিতে বাঁধাকপির উৎপাদন দাঁড়ায় ৯০০ মেট্রিক টন। এ বছরও সেই পরিমাণ জমিতে আবাদ চলছে, আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আশাবাদী—ফলন এবার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হতে পারে। মাটিরাঙ্গা পৌরসভার চড়পাড়া, নতুন পাড়া, চৌধুরীঘাট, ওয়াছু, তাইন্দং, বড়নাল, তবলছড়ি, গোমতী, গড়াগড়িয়া—এসব এলাকায় চোখে পড়ে সুশৃঙ্খল সারিতে সাজানো ফুলকপি ও বাঁধাকপির বিশাল সবুজ রাজ্য। পত্রের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা কৃষকের আশা-কল্পনা যেন বাতাসেও অনুভব করা যায়। শেষ বিকেলের রোদ যখন মাঠের ওপরে পড়ে, দৃশ্যটা আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে। মাঠপর্যায়ের সাফল্যের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন ওয়াছুর কৃষক আবু তাহের। এক একর জমিতে ফুলকপি-বাঁধাকপি চাষ করে তিনি ব্যয় করেছেন দেড় লাখ টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার তার ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাহের আশা করছেন—কমপক্ষে ৩ লাখ টাকার ফসল বিক্রি করতে পারবেন। একইভাবে গোমতীর কৃষক শামসুল হকও লাভের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে তিনি চ্যালেঞ্জের কথাও বলেন—সার ও কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধি, আর অসময়ের বৃষ্টির ঝুঁকি। তবুও মাঠভরা ফসল দেখে সব কষ্ট তার উবে যায়। একযোগে তিনি পরিবহন খরচ কমানোর দাবি জানান, যাতে কৃষকের লাভ আরও বাড়ে। তাইন্দংয়ের কৃষক গনি মিয়া জানান, ‘এবার ন্যায্য দাম পেয়ে আমাদের পরিশ্রম সফল হয়েছে। আগাম কপি উঠিয়ে ভালো দাম মিলছে। পুঁজিও উঠবে, লাভও থাকবে। ন্যায্যমূল্য পেলে আমরা আরও উৎসাহ নিয়ে চাষ করব।’ তবলছড়ির কৃষক আবুল হোসেন বলেন, ‘কয়েক বছর লোকসান হলেও এবার ফলন চমৎকার। উন্নত বীজ আর সঠিক সারের ব্যবহারে এই সাফল্য এসেছে। গত বছরের তুলনায় এবার অন্তত দ্বিগুণ লাভের আশা করছি। ইতোমধ্যে প্রথম চালান ভালো দামে বিক্রি করেছি। কপি আমাদের পরিবারের বড় খরচ সামলাতে সাহায্য করে।’ কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালীন কপি চাষ মাটিরাঙ্গার গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও শক্ত করছে। ফসল পরিচর্যা থেকে শুরু করে উত্তোলন ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনমান উন্নত করছে। মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সবুজ আলী বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা কৃষকদের উন্নত জাতের বীজ, সুষম সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমনসহ নিয়মিত মাঠ পর্যায়ের পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করে আসছি। আবহাওয়া এবার খুবই অনুকূলে ছিল। তাই আবাদ ভালো হয়েছে, ফলনও আশাব্যঞ্জক। আশা করছি, এ মৌসুমে কৃষকরা ভালো লাভ করবেন, আর এতে তাদের আর্থিক অবস্থার আরও উন্নতি ঘটবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here