দেয়াঙ পরগণার ইতিহাস”: শেকড়ের সন্ধানে এক সাহসী সাংবাদিক ও কিংবদন্তি ইতিহাসবিদ জামাল উদ্দিন-

0
284

-মো.কামাল উদ্দিনঃ

চট্টগ্রামের ইতিহাস মানে কেবল বন্দর, পাহাড় আর বাণিজ্যের গল্প নয়—চট্টগ্রামের ইতিহাস মানে সভ্যতার বহুস্তর, যুদ্ধ ও প্রতিরোধ, সংস্কৃতি ও সহনশীলতা, রক্ত ও রোদের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা এক জনপদের আত্মকথা। সেই আত্মকথা পাঠ করতে হলে প্রয়োজন হয় এমন একজন মানুষের, যিনি ইতিহাসকে শুধু পড়েন না—ইতিহাসকে খুঁজে ফেরেন, স্পর্শ করেন, ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করেন বিস্মৃত স্মৃতি। সেই মানুষের নাম জামাল উদ্দিন। তার রচিত গবেষণাগ্রন্থ “দেয়াঙ পরগণার ইতিহাস” চট্টগ্রামের হাজার বছরের অতীতকে নতুন করে চিনতে শেখায়। এই বইয়ে রয়েছে প্রাচীন চট্টগ্রাম বন্দরের উত্থান-পতনের কাহিনি, দেয়াঙ পাহাড়ে অবস্থিত পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় অধ্যায়, মঘ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের নির্মমতা, ‘দেয়াঙ’ নামকরণের উৎস, চন্দ্র, বর্মন, পাল, সেন ও দেব রাজবংশের ধারাবাহিক ইতিহাস, মোগল ও ব্রিটিশ আমলের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক রূপান্তর, ‘ইসলামাবাদ’ নামকরণ, ‘চাটিগাঁও’ শব্দের উৎপত্তি এবং এমনকি প্রাক-ঐতিহাসিক প্রস্তর যুগের নিদর্শনের বিবরণ। এই গ্রন্থ কেবল ইতিহাস নয়—এটি চট্টগ্রামের আত্মপরিচয়ের দলিল। সত্যের কাছে দায়বদ্ধ এক সাহসী সাংবাদিক-জামাল উদ্দিনের পরিচয় কেবল ইতিহাসবিদ হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি প্রথমত একজন সাহসী সাংবাদিক—যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তার কলম কখনো ক্ষমতার দরবারে নত হয়নি, কখনো মিথ্যার সঙ্গে আপস করেনি। অসত্য, অসুন্দর ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে তার লেখনী ছিল ধারালো তলোয়ারের মতো—নীরব অথচ অপ্রতিরোধ্য।
১৯৮১ সালের দিকে সাংবাদিকতায় প্রবেশের পর থেকেই তিনি সন্ত্রাস, দুর্নীতি, কালোবাজারি, ভূমিদস্যুতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কলম ধরেন। তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে একের পর এক সমাজের দাপুটে মুখোশধারীরা উন্মোচিত হয়েছে। হুমকি এসেছে, প্রলোভন এসেছে, ভয় দেখানো হয়েছে কিন্তু জামাল উদ্দিন কখনো পিছু হটেননি। তিনি কাজ করেছেন দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক সেবক, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক রূপালী ও দৈনিক আজকের কাগজে কখনো স্টাফ রিপোর্টার, কখনো ব্যুরো প্রধান হিসেবে সাংবাদিকতার এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি প্রমাণ করেছেন সংবাদ কেবল পেশা নয়, সংবাদ একটি নৈতিক দায়িত্ব। চট্টলচিত্রের জনক: চট্টগ্রামের কণ্ঠস্বর জামাল উদ্দিনের আরেকটি ঐতিহাসিক পরিচয়—তিনি বহুল আলোচিত ও প্রচারিত পাক্ষিক ‘চট্টলচিত্র’-এর জনক। ২০০২ সালের দিকে দৈনিক আজকের কাগজে ব্যুরো প্রধান থাকাকালীন সময় তিনি চট্টগ্রাম থেকে এই পত্রিকাটি সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘চট্টলচিত্র’ খুব দ্রুতই হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও জনজীবনের প্রামাণ্য দলিল। আজও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে ‘চট্টলচিত্র’-এর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এই পত্রিকা চট্টগ্রামের কথা বলে, চট্টগ্রামের পক্ষে দাঁড়ায়—এবং সেটিই জামাল উদ্দিনের সাংবাদিকতার দর্শন। একাত্তরের কিশোর, আজীবন মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক-জামাল উদ্দিনের জীবনচেতনার মূল উৎস মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন আনোয়ারার স্কুলপড়ুয়া কিশোর। কিন্তু সেই বয়সেই তিনি মুক্তিযুদ্ধকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। প্রত্যক্ষ করেছেন পাকবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের নৃশংস নির্যাতন, লুটপাট, গণহত্যা ও আগুনে পোড়া গ্রাম। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবারুদ বহন করেছেন, শহর থেকে আনোয়ারায় আশ্রয় নিতে আসা মানুষদের সেবা দিয়েছেন, পাহারার দায়িত্ব পালন করেছেন। এই কিশোর বয়সেই মুক্তিযুদ্ধ তার হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়। পরবর্তীকালে তার সাংবাদিকতা ও গবেষণার প্রতিটি কাজেই এই মুক্তিযুদ্ধ হয়ে ওঠে নৈতিক দিকনির্দেশনা। প্রগতিশীল পরিবার ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ-জামাল উদ্দিন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৯ সালের ৮ জানুয়ারি, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার শিলইগড়া গ্রামে। পিতা মরহুম কবির আহমদ ও মাতা মোস্তান বেগম—একটি প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের পরিবার গড়ে তুলেছিলেন। পরিবার ও প্রতিবেশে ন্যাপ-ভাসানী ধারার রাজনীতির প্রভাব ছিল প্রবল।
আনোয়ারা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়েই তার ভেতরে প্রগতিশীল চেতনার উন্মেষ ঘটে। ছাত্র ইউনিয়নের ভাবধারায় রাজনীতির সূচনা হলেও পরে আনোয়ারা কলেজে পড়ার সময় তিনি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর থানার ছাত্রলীগের সভাপতি, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সহসাধারণ সম্পাদক ও সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দমন-পীড়নেও অটল থাকা জীবন-তার ছাত্ররাজনীতির পথ সহজ ছিল না। বিশেষ করে মেজর জেনারেল জিয়ার শাসনামলে তিনি চরম রোষানলের শিকার হন। পড়াশোনা ও রাজনৈতিক জীবনে নানা বাধা এসেছে কিন্তু এই দমন-পীড়ন তাকে দমাতে পারেনি—বরং আরও দৃঢ় করেছে। -কিংবদন্তি ইতিহাসবিদ: মাঠে-ঘাটে ঘুরে লেখা ইতিহাস-জামাল উদ্দিনের ইতিহাসচর্চার বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি কেবল পাঠনির্ভর নন। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও তিনি ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম ও ড. সুনীতি ভূষণ কানুনগোর তত্ত্বাবধানে গবেষণার পাঠ গ্রহণ করেন। তারপর শুরু হয় এক দুঃসাহসিক যাত্রা। পার্বত্য চট্টগ্রাম, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মিজোরাম, কলকাতা ও দিল্লি—বৈধ ও অবৈধ পথে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করেছেন। এই গবেষণার পথে তিনি মিয়ানমারে নাসাকা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণও করেছেন। গবেষণার অর্জন ও উত্তরাধিকার-তার গবেষণায় উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের বিস্মৃত অধ্যায়, স্বাধীনতাবিরোধীদের অপকর্মের দালিলিক প্রমাণ, এবং পার্বত্য ও সমতলের আদিবাসীদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-জীবনধারা। ২০১৪ সাল থেকে তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রণয়ন প্রকল্পে গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চট্টগ্রামের গর্ব, ইতিহাসের প্রহরী “দেয়াঙ পরগণার ইতিহাস” মূল্য: ২০০০ টাকা US $30 ISBN: 9789849494508) শুধু একটি বই নয়—এটি চট্টগ্রামের হারিয়ে যাওয়া আত্মার পুনরুদ্ধার।জামাল উদ্দিন প্রমাণ করেছেন—একজন মানুষ চাইলে সাংবাদিক, গবেষক ও ইতিহাসবিদ—তিন পরিচয় একসঙ্গে বহন করতে পারেন। চট্টগ্রাম তাকে শুধু একজন লেখক হিসেবে নয়, একজন ইতিহাসের প্রহরী হিসেবে মনে রাখবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here