-বিপ্লব বিজয়ঃ
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার মাজারগেট এলাকা রোববার সন্ধ্যার কনকনে শীত। ফোঁটা ফোঁটা হিমঘন বাতাস যেন ছোট্ট দুটি প্রাণকে আরও ছোট করে দিয়েছে। চার বছর বয়সী আয়েশা ও দুই বছর বয়সী মোরশেদ, অসহায় ও নিরীহ, বসে আছেন সড়কের পাশে। তাদের ছোট ছোট দেহ কম্পমান, চোখে ভয়ে জল ভরা, আর মুখে কেবল প্রশ্ন “আমরা কোথায় যাবো?”। শিশু দুটির দুর্দশার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তাৎক্ষণিক নজর দিলেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চট্টগ্রাম জনাব মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। কোনো বিলম্ব ছাড়াই তিনি আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) নির্দেশ দেন শিশু দুটিকে দ্রুত উদ্ধার করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে আসতে। কার্যালয়ে শিশুদের সঙ্গে দেখা করার পর জেলা প্রশাসক নিজে খোঁজখবর নেন—তাদের শারীরিক অবস্থা, মানসিক ভয়, পরিবারিক পরিচয় এবং কেন তারা এমন বিপদের মুখে পড়ল। ছোট্ট এই শিশুদের কাঁপতে থাকা হাত ও ভয়াভিভূত চোখ তার হৃদয় স্পর্শ করে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা, ওষুধ এবং জরুরি আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করেন, যাতে শিশু দুটির শীত ও অসুস্থতা দূর হয়। কিন্তু মানবিক দৃষ্টি এখানে থেমে থাকেনি। জেলা প্রশাসক সমাজসেবা অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত পরিচর্যা এবং ভবিষ্যতের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে। শিশু দুটির ভবিষ্যৎ যেন আর কখনো অনিশ্চয়তার শীতের কাছে নিপীড়িত না হয় এটাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। শিশুদের ভাষ্যমতে, তাদের এক আত্মীয়ই সড়কের পাশে রেখে চলে যান। মা-বাবা, যারা জন্ম দিয়েছেন, তারা কোথায় ছিলেন? এই দায়িত্বহীনতা এই নিষ্ঠুরতা আমাদের সমাজের নিঠুর বাস্তবতা। আমাদের প্রশ্ন করতে হবে দেশের এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে আমরা কখন সোচ্চার হবো? শিশুদের জন্ম দিয়ে আমরা কি যথাযথ সুরক্ষা দিতে পারছি? মা-বাবা, পরিবার ও সমাজ এই দায়িত্ব কে নেবে? তবে এই অমানবিকতার বিপরীতে মানবতার আলো জ্বালালেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তার দ্রুত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ শিশু দুটির জীবনকে বিপদ থেকে রক্ষা করেছে। এই ঘটনাটি শুধু আনোয়ারার নয়, পুরো দেশের জন্য এক মানবিক শিক্ষণ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যদি আমরা দায়িত্বশীল এবং সংবেদনশীল হই, অসহায়দের জীবনে আমরা আশার আলো জ্বালাতে পারি। আয়েশা ও মোরশেদের অসহায় চাহনি আমাদের সমাজের আয়না। আসুন, আমরা আর কখনো শীতের অন্ধকারে সড়কের পাশে বসে থাকা শিশুদের মতো নিঃস্ব জীবন চাই না। আসুন, আমরা সকলেই মা-বাবা, নাগরিক ও প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বশীল হই যতটা সম্ভব মানবিক হই। জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগ আমাদের মনে জাগিয়েছে দায়িত্ব, সতর্কতা ও মানবতার চরম প্রয়োজনীয়তা। শীতের সেই কণকনে রাত, অসহায় দুই শিশু, এবং এক নেতার মানবিক দৃষ্টি এই দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।