-মো.কামাল উদ্দিনঃ
একই পাড়ার মানুষ, একই স্বপ্নের সহযাত্রী: আহমদ খলিল খান,দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্মৃতির মিনারে-আহমদ খলিল খান—নামটি উচ্চারণ করলেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে পশ্চিম চরণদ্বীপের সেই চিরচেনা পথ, উঠান, মানুষের মুখ আর রাজনীতির নীরব অথচ দৃঢ় পদচারণা। আজ তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। দুই বছর পেরিয়ে গেল, কিন্তু মনে হয় তিনি যেন এখনো আমাদের পাশেই আছেন—পশ্চিম চরণদ্বীপ পাঠানপাড়ার সেই বাড়িটিতে, কিংবা আমার বাড়ির সামনের পথ দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছেন, মিষ্টি হাসি আর কোমল ভাষায় কুশল জিজ্ঞেস করছেন। আমার বাড়ি আর তাঁর বাড়ি—একই এলাকায়, পশ্চিম চরণদ্বীপে। শুধু ভৌগোলিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও আমরা ছিলাম খুব কাছের মানুষ। পাড়ার বড় ভাই হিসেবে, একজন অভিভাবক হিসেবে, একজন রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক হিসেবে তিনি ছিলেন আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের এই পাড়ায় রাজনীতি কখনো কেবল ক্ষমতার বিষয় ছিল না—ছিল সম্পর্ক, ছিল দায়িত্ববোধ, ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার। সেই রাজনীতির প্রতিচ্ছবি ছিলেন আহমদ খলিল খান। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, বোয়ালখালীর কৃতি সন্তান—কিন্তু পরিচয়ের এই গণ্ডির বাইরে গিয়ে তিনি ছিলেন একজন সর্বজনগ্রাহ্য মানুষ। দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে আপন করে নেওয়ার যে অসাধারণ গুণ তাঁর মধ্যে ছিল, তা আজকের দিনে বিরল। তাঁর কথা বলার ভঙ্গি ছিল মিষ্টি, কিন্তু অবস্থান ছিল দৃঢ়। তিনি কখনো উচ্চস্বরে রাজনীতি করতেন না—মানুষকে আপন করে নিয়ে, নীরবে কাজ করে যাওয়াই ছিল তাঁর শক্তি। আমি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলাম তাঁকে দেখেই। পশ্চিম চরণদ্বীপের আড্ডা, রাজনৈতিক আলোচনা, মানুষের সুখ-দুঃখে তাঁর সরব উপস্থিতি আমাকে রাজনীতির পথে টেনেছিল। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন—রাজনীতি মানে মানুষের পাশে থাকা, বিপদের সময় মুখ ফিরিয়ে না নেওয়া। ১৯৮০ সালের একটি স্মৃতি আজও আমার জীবনের গভীরে গাঁথা। খলিল ভাই এবং আমার জেঠাতো ভাই জানে আলমের হাত ধরে আমরা তখন স্কুলপড়ুয়া কয়েকজন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানকে ফুল দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। বোয়ালখালীর কধুরখীল চৌধুরীর হাটের পশ্চিমে জামতল বিলে জনসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। তৎকালীন এমপি সিরাজুল ইসলাম সাহেবের আমন্ত্রণে শহীদ জিয়া সেখানে এসেছিলেন। সেই দিনের উত্তেজনা, মানুষের ঢল, আর একজন কিশোর হিসেবে রাষ্ট্রপ্রধানের সামনে দাঁড়ানোর গর্ব—সব কিছুর নেপথ্যে ছিলেন খলিল ভাই। সেই দিন থেকেই রাজনীতি আমার কাছে কেবল শোনা কোনো বিষয় নয়, বরং জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আমি তাঁকে কাছে পেয়েছি—এটাই আমার পরম সৌভাগ্য। মৃত্যুর কিছুদিন আগে একটি চক্র বিভিন্নভাবে তাঁকে হয়রানি করেছিল। সেই সময় আমি বোয়ালখালী থানার তৎকালীন ওসি আব্দুর রাজ্জাকের মাধ্যমে সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে গিয়েছিলাম। খলিল ভাই তখনো অবিচল ছিলেন। তাঁর কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু ভেঙে পড়া ছিল না। সেই দিনের কথাবার্তা আজও মনে পড়লে বুক ভারী হয়ে আসে। ২০২৩ সালের এই দিনে, বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়—এটি ছিল পশ্চিম চরণদ্বীপ, বোয়ালখালী ও বিএনপির রাজনীতির জন্য এক অপূরণীয় শূন্যতা। খলিল ভাইয়ের জানাজায় আমি এবং ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলাম। কাপাসগোলা স্কুলের মাঠে অনুষ্ঠিত সেই জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। সেদিন তাঁর পাশে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বোয়ালখালী বিএনপির নেতা, শ্রীপুর বুড়া মসজিদের মোতোয়ালি—আমার বন্ধু নুরুন নবী চৌধুরী। তাঁর নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা সবার প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
দেখতে দেখতে দুই বছর কেটে গেছে। কিন্তু আহমদ খলিল খান কোনো স্মৃতির পাতায় আটকে থাকা মানুষ নন—তিনি এখনো আমাদের চিন্তা, আমাদের রাজনৈতিক বোধ ও মানবিক মূল্যবোধের অংশ। তিনি ছিলেন বিএনপির রাজনীতির একজন নিবেদিত প্রাণ। তাঁর জীবনটাই নিঃশেষ হয়েছে দল, আদর্শ ও মানুষের জন্য সংগ্রাম করতে করতে। আজ এই দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে পশ্চিম চরণদ্বীপের মাটি ছুঁয়ে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি আমার প্রিয় মানুষ, আমার পাড়ার বড় ভাই আহমদ খলিল খানকে। আল্লাহ তায়ালা যেন তাঁর আত্মাকে মাগফিরাত দান করেন, জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন, এবং আমাদের সবাইকে তাঁর মতো মানবিক, বিনয়ী ও আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতি করার শক্তি দেন—এই দোয়াই করি। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায়— আহমদ খলিল খান, আপনি আমাদের মাঝেই আছেন।