কারা অতীতে দায়মুক্তি পেয়েছেন? ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ ভাগ্যে কী

0
142

গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই ‘দায়মুক্তি’ প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি আইন উপদেষ্টার বক্তব্যের পর বিষয়টি রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে ফের বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। তবে গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া কথিত ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ জন্য প্রস্তাবিত দায়মুক্তি আইন কতদিন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে—সে বিষয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই লাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দায়মুক্তির নজির নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে আইন ও অধ্যাদেশ জারি করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। অন্তত তিনবার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি দিয়ে একটি আইন প্রণয়ন করে। শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা—সব সরকারের আমলেই দায়মুক্তি আইনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব আইন পরবর্তীতে বাতিল হয়েছে কিংবা আদালতের রায়ে কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তির প্রয়োজনীয়তা ও সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আইনবিদ ও বিশ্লেষকেরা।বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়মুক্তির নজির থাকলেও বাংলাদেশে এটি প্রায়শই রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তারা মনে করেন, বিচার পাওয়ার অধিকার মানুষের একটি মৌলিক অধিকার, আর আইন করে সেই অধিকার হরণ করা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাংলাদেশে দায়মুক্তির পূর্ববর্তী নজির স্বাধীনতার পর প্রথম দায়মুক্তি দেওয়া হয় বিতর্কিত রক্ষীবাহিনীকে। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রপতিত্বকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে গঠিত এই বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে দায়মুক্তি দিতে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরবর্তীতে বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বাড়লে ১৯৭৪ সালে সংশোধনীর মাধ্যমে তাদের সব কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়া হয়। এ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য রুল জারি করেন। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার সংশোধন এনে কিছু নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান যুক্ত করা হলেও একই বছরের আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রক্ষীবাহিনী বিলুপ্ত হয় এবং সংশ্লিষ্ট আদেশ বাতিল করা হয়। এরপর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বার ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়, যার মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের হত্যাকারীদের বিচার নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এটি সংসদে আইনে পরিণত হয়। দীর্ঘ দুই দশক পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে আইনটি বাতিল করে এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। তৃতীয় দফায় দায়মুক্তির আইন প্রণীত হয় ২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়। ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এ অংশ নেওয়া বাহিনীর সদস্যদের দায়মুক্তি দিতে এই আইন করা হয়। অভিযানে ৪০ জনের বেশি মানুষ হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে হাইকোর্ট আইনটিকে অবৈধ ঘোষণা করে।সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিকের মতে, বিচার চাওয়ার অধিকার মানুষের প্রথম ও অন্যতম মৌলিক অধিকার। আইন করে সেই অধিকার বন্ধ করা কোনোভাবেই সংবিধানসম্মত হতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, জাতি গঠন, জাতীয় ঐক্য ও সম্প্রীতির যুক্তিতে বিভিন্ন দেশে দায়মুক্তির প্রসঙ্গ আসতে পারে। তবে বাংলাদেশে এই আইনগুলো বারবার রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী, বাহিনী কিংবা রাজনৈতিক দলকে রক্ষা করতেই এসব আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি প্রসঙ্গ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিনের মাথায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এরপর থেকেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন উপদেষ্টা ও সমন্বয়ক ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তির দাবি তুলে আসছেন। বিষয়টি ‘জুলাই সনদ’-এও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি কয়েকজন সমন্বয়ককে ঘিরে বিতর্কের প্রেক্ষাপটে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন। তিনি সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দায়মুক্তি আইনের উদাহরণ তুলে ধরেন। তবে এই তুলনার সঙ্গে একমত নন অনেক বিশ্লেষক। অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, আর জুলাই আন্দোলন ছিল দেশের ভেতরে একটি সরকারের বিরুদ্ধে। এই দুই প্রেক্ষাপট এক নয়। তিনি আরও বলেন, দায়মুক্তির প্রশ্ন তুললে আগে স্পষ্ট করতে হবে—কোন অপরাধের জন্য দায়মুক্তি চাওয়া হচ্ছে। হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট বা রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ধ্বংসের মতো অপরাধের জন্য দায়মুক্তি দেওয়া ন্যায়সংগত হতে পারে না। একই আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন শাহদীন মালিকও। তাঁর মতে, বিচার এড়িয়ে দায়মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিহাসে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হবে না। এখন হয়তো আবেগ প্রবল, কিন্তু এক দশক বা দেড় দশক পরে মানুষ প্রশ্ন তুলবে—এত প্রাণহানি ও সহিংসতার পরও কেন দায়মুক্তি দেওয়া হলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here