ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার: “চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে তথ্য মন্ত্রীর ঐতিহাসিক বৈঠক, সংকট সমাধানের আশ্বাসে আশার আলো—তবু শেষ প্রহরে অনাকাঙ্ক্ষিত অশান্তির ছায়া-

0
211

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ, বিভক্তি, গঠনতন্ত্রবহির্ভূত সিদ্ধান্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে আলোচিত হয়ে আসছিল চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব। অবশেষে সেই জটিলতার নিরসনে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের সূচনা হলো গতকাল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে। মাননীয় তথ্য মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন–এর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছিল না; এটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধতা পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকারের দিন। সংকটের পটভূমি: প্রশ্ন গঠনতন্ত্রের সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রেস ক্লাবের নির্বাচিত ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন মো. রেজা স্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ তোলেন—সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত কমিটি ভেঙে দিয়ে একটি অবৈধ অন্তর্বর্তী কমিটি গঠন করা হয়েছে। শতাধিক অযোগ্য, অপেশাদার ও বিতর্কিত ব্যক্তিকে সদস্যপদ দেওয়া হয়েছে, যা ক্লাবের ঐতিহ্য ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন–এর সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী বলেন, প্রেস ক্লাবকে জিম্মিমুক্ত করে পেশাদার সাংবাদিকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া সময়ের দাবি। তাঁর বক্তব্যে ছিল ক্ষোভের পাশাপাশি একটি সুস্পষ্ট আহ্বান—গণতান্ত্রিক ও গঠনতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচন দিয়ে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মন্ত্রীর অবস্থান: ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান বড় মাননীয় তথ্য মন্ত্রী অত্যন্ত ধৈর্য ও মনোযোগ দিয়ে সব বক্তব্য শোনেন। তাঁর বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট ও নীতিনিষ্ঠ। তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান তখনই দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন ব্যক্তির ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। নিয়মকানুন নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সমাধান হতে হবে নিয়মের মধ্যেই।
তিনি আরও আশ্বাস দেন—চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পরামর্শ করে গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধিদের নিয়ে ঢাকায় একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক আহ্বান করা হবে। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আলোকে সমাধান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বর্তমানে দেশে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব পালন করছে এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন তারেক রহমান। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধতার বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল—বাংলাদেশকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রতিটি সংগঠনকে নিয়ম ও গঠনতন্ত্রের পথে ফিরতে হবে। ঐক্যের মুহূর্ত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিকবৃন্দ, বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা এবং উভয় কমিটির নেতারা। রিয়াজ হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বে সাংবাদিক সমাজের একটি বড় অংশ ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে—এটি বৈঠকের অন্যতম ইতিবাচক দিক।
রিয়াজ হায়দার চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে সহকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে একজন গ্রহণযোগ্য ও মানবিক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর প্রতি সাংবাদিকদের আস্থা ও সমর্থন বৈঠকের পরিবেশে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। সভা শেষে প্রতিনিধিরা মাননীয় তথ্য মন্ত্রীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানান। অনেকের চোখে ছিল স্বস্তির ছাপ—দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা হয়তো এবার গঠনতান্ত্রিক পথে এগোবে। অশুভ শক্তির অপচেষ্টা কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ আলোচনার পর বিদায়ের মুহূর্তে কিছু নামসর্বস্ব ব্যক্তি পেশিশক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করে। বিশেষভাবে টার্গেট করা হয় রিয়াজ হায়দার চৌধুরীকে। পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি ও মব আচরণের মাধ্যমে বৈঠকের ইতিবাচক বার্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়।
এটি ছিল অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অপ্রত্যাশিত। গণতান্ত্রিক সমাজে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সহিংসতার ইঙ্গিত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে সাংবাদিক সমাজের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কারণে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। সহকর্মীরা দ্রুত এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এই সংহতিই প্রমাণ করে—চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা রক্ষায় একসঙ্গে দাঁড়াতে জানে। এখন করণীয় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব কেবল একটি ভবন নয়; এটি ইতিহাস, সংগ্রাম ও পেশাগত নৈতিকতার প্রতীক। এই প্রতিষ্ঠানকে কলঙ্কমুক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদায় ফিরিয়ে আনা সময়ের দাবি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচন, সদস্যদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ, স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো এবং সকল মতের সহাবস্থান—এই চারটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। গতকালের বৈঠক একটি সূচনা মাত্র। এখন প্রয়োজন দ্রুত পদক্ষেপ, দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং সকল পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ। ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ নয়—প্রাধান্য পেতে হবে প্রতিষ্ঠানকে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সেই বৈঠক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে যদি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়। মাননীয় তথ্য মন্ত্রীর অঙ্গীকার, সালাহউদ্দিন রেজার দৃঢ় অবস্থান, রিয়াজ হায়দার চৌধুরীর জনপ্রিয় নেতৃত্ব এবং সিনিয়র সাংবাদিকদের ঐক্য—এই চার শক্তি একত্রে কাজ করলে সংকট নিরসন অনিবার্য। এখন সময় কথাকে কাজে রূপ দেওয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধতার পথে ফিরে এসে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব আবারও হোক ঐক্য, মর্যাদা ও পেশাগত সততার আলোকবর্তিকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here