-মো. কামাল উদ্দিনঃ পাঁচ বছরের একটি শিশু। নাম তার জায়হান। পৃথিবীকে দেখার, জানার, স্বপ্ন দেখার বয়সও হয়নি। মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়া, বাবার হাত ধরে হাঁটা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা—এটাই ছিল তার পৃথিবী। কিন্তু সেই পৃথিবী হঠাৎ থেমে গেল। কয়েকদিনের নিখোঁজ নাটকের পর অবশেষে উদ্ধার হলো তার বস্তাবন্দি মরদেহ। যে শিশুর মুখে থাকার কথা ছিল হাসি, তার নিথর দেহ পাওয়া গেল নর্দমার ময়লার স্তূপে। একটি সভ্য সমাজের জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে? জায়হানের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং মানবিক মূল্যবোধের সামনে ছুঁড়ে দেওয়া এক নির্মম প্রশ্ন। আজ আমরা সবাই শোকাহত। কিন্তু শোকের চেয়েও বড় প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। কারণ একটি শিশু কখনো একা মারা যায় না। তার সঙ্গে মারা যায় আমাদের মানবিকতা, আমাদের দায়িত্ববোধ, আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং আমাদের বিবেকের একটি অংশ। নিখোঁজের পর কী হয়েছিল? শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিল। একজন বাবা যখন থানায় গিয়ে বলেন, “আমার সন্তানকে খুঁজে দিন”, তখন তার পৃথিবীতে আর কোনো ভরসা থাকে না। এখানেই সাধারণ মানুষের একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে। জিডি হওয়ার পরপরই কি অনুসন্ধান যথেষ্ট দ্রুত শুরু হয়েছিল? প্রথম কয়েক ঘণ্টাকে কি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল? শিশুটির জীবনের জন্য যে সময়গুলো ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো কি পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই আসবে। তবে এ প্রশ্ন তোলার অধিকার জনগণের রয়েছে। কারণ প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক ঘণ্টা জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া মাত্রই বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবাই একযোগে সক্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে শিশু নিখোঁজের ঘটনাকে সাধারণ জিডি হিসেবে না দেখে জরুরি নিরাপত্তা সংকট হিসেবে বিবেচনা করার। প্রশংসাও প্রাপ্য অন্যদিকে এটিও সত্য যে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, গোয়েন্দা তৎপরতা, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, আলামত সংগ্রহ এবং ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি পেশাদার তদন্তের উদাহরণ। কিন্তু এখানেও একটি নির্মম সত্য রয়ে যায়। রহস্য উদঘাটন হয়েছে, অপরাধী ধরা পড়েছে, কিন্তু শিশুটি আর ফিরে আসেনি। একজন মা তার সন্তানকে ফিরে পাননি। একজন বাবা তার বুকের ধনকে ফিরে পাননি। এটাই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা, সবচেয়ে বড় বেদনা।
কেন বাড়ছে শিশুহত্যা? বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে শিশু হত্যা, শিশু ধর্ষণ, অপহরণ এবং নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই দেখা যায় কোনো না কোনো শিশুর ওপর পাশবিক নির্যাতনের খবর।
কখনো ধর্ষণের পর হত্যা। কখনো অপহরণের পর হত্যা। কখনো পারিবারিক বিরোধের বলি। কখনো সম্পত্তির দ্বন্দ্বের শিকার।
কখনো আবার শুধুমাত্র বিকৃত মানসিকতার কারণে একটি শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি ধীরে ধীরে এমন একটি সমাজে পরিণত হচ্ছি যেখানে শিশুদের জীবনও আর মূল্যবান নয়? শিশু ধর্ষণ: সভ্যতার মুখে চপেটাঘাত শিশু ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যখন একটি শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন চালায়, তখন সে শুধু আইন ভঙ্গ করে না, সে মানবতার সীমা অতিক্রম করে পশুত্বের নিচে নেমে যায়। আর যখন ধর্ষণের পর শিশুটিকে হত্যা করা হয়, তখন সেই অপরাধ আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা অপরিচিত নয়। প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ ওঠে।
এ বাস্তবতা আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভয়াবহ দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে। কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে মানবিকতা?
একসময় গ্রামবাংলার মানুষ প্রতিবেশীর সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করত। আজ সেই সমাজে প্রতিবেশীকে নিয়েও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কেন? কারণ আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছি, কিন্তু নৈতিক উন্নয়ন করতে পারিনি। আমরা শিক্ষিত হয়েছি, কিন্তু মানবিক হতে পারিনি। আমরা প্রযুক্তিতে এগিয়েছি, কিন্তু বিবেকের চর্চা কমিয়ে দিয়েছি। ধর্মীয় মূল্যবোধ, পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অবক্ষয় তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রের করণীয় কী? শিশু সুরক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রতিটি থানায় নিখোঁজ শিশু সংক্রান্ত জরুরি সেল চালু করতে হবে। প্রতিটি জেলায় শিশু উদ্ধার টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। স্কুল পর্যায়ে শিশু নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ধর্ষণ ও শিশুহত্যা মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। শিশু নির্যাতনকারীদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আইন করলেই হবে না, আইনের কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারের দায়িত্ব প্রতিটি পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। শিশুরা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় খেলছে—সেদিকে নজর রাখতে হবে। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই নিরাপত্তা শিক্ষা দিতে হবে।
কোনো অপরিচিত বা সন্দেহজনক ব্যক্তির সঙ্গে না যাওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। শিশুর কথাকে গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক সময় শিশুরা ভয় বা সংকোচের কারণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বলতে পারে না। অভিভাবকদের সেই আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। জায়হানের মৃত্যু আমাদের কী শিখিয়েছে? জায়হানের মৃত্যু আমাদের শিখিয়েছে যে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও আজ নিরাপদ নয়। একটি শিশু পর্যন্ত প্রতিহিংসা, লোভ এবং বিকৃত মানসিকতার শিকার হতে পারে। এ মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—শুধু উন্নয়ন দিয়ে সভ্যতা তৈরি হয় না। সভ্যতা তৈরি হয় মানবিকতা দিয়ে। সভ্যতা তৈরি হয় ন্যায়বিচার দিয়ে। সভ্যতা তৈরি হয় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। শেষ কথা আজ জায়হান নেই। তার ছোট্ট খেলনা হয়তো ঘরের কোনো কোণে পড়ে আছে। তার স্কুলব্যাগ হয়তো এখনও অপেক্ষা করছে। তার মা হয়তো এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তার সন্তান আর ফিরে আসবে না। তার বাবার বুকের ভেতরের আর্তনাদ কেউ শুনতে পাচ্ছে না। কিন্তু জাতি হিসেবে আমাদের এই কান্না শুনতে হবে। কারণ জায়হানের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো বাংলাদেশের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আজ যদি আমরা জেগে না উঠি, যদি শিশু সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দিই, যদি মানবিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে না পারি, তাহলে আগামীকাল আবার কোনো জায়হান হারিয়ে যাবে। আর তখন হয়তো আমরা আবার শোক জানাব, আবার বিবৃতি দেব, আবার প্রতিবাদ করব। কিন্তু একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন আর কখনো ফিরিয়ে আনতে পারব না।
শিশুরা ফুলের মতো। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের নৈতিক, সামাজিক এবং মানবিক দায়িত্ব। জায়হানের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক—আর কোনো শিশু যেন প্রতিহিংসা, লালসা কিংবা অপরাধের বলি না হয়। আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।