“আজ স্কুলে যাব না” এক বছর পরও যে কান্না থামেনি একটি ট্র্যাজেডি, যা কাঁপিয়ে দেয় জাতির বিবেক

0
8
 -মো. কামাল উদ্দিন একটি বছর কেটে গেছে।  পৃথিবী তার নিজস্ব নিয়মে ঘুরেছে। ঋতু বদলেছে। বর্ষা এসেছে, শরৎ এসেছে, শীত পেরিয়ে আবারও নতুন সূর্য উঠেছে। স্কুলের ঘণ্টা আবারও বেজেছে, নতুন বইয়ের গন্ধে মুখর হয়েছে শ্রেণিকক্ষ, নতুন শিশুরা নতুন স্বপ্ন নিয়ে ক্লাসে বসেছে। কিন্তু কিছু পরিবারে সময় আর এগোয়নি। সেখানে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টালেও ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে সেই ভয়াল দুপুরে। একটি মায়ের চোখে আজও ঘুম নামে না। একটি বাবা আজও দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন—হয়তো এই বুঝি ছোট্ট পায়ের শব্দ শুনতে পাবেন। সেদিনও সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই। সাত বছরের জুনায়েদ মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল— “আম্মু, আজ আমি স্কুলে যাব না।”   শিশুরা কখনো কখনো এমন কথা বলে। কেউ ভাবে আলস্য, কেউ ভাবে বায়না, কেউ ভাবে সাময়িক মন খারাপ। কিন্তু কে জানত, এই কথার ভেতরে লুকিয়ে ছিল নিয়তির এক নিঃশব্দ আহ্বান! মা সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন— “না বাবা, আজ যেতেই হবে। বিকেলে তোমাকে ঘুরতে নিয়ে যাব, তোমার প্রিয় চিকেনও রান্না করব।” শিশুটি হাসল। সে বিশ্বাস করেছিল তার মাকে। সে জানত, বিকেল আসবে। সে জানত, স্কুল শেষে বাসায় ফিরবে।  সে জানত, মা অপেক্ষা করবেন। কিন্তু নিয়তি অন্য গল্প লিখে রেখেছিল। এক মুহূর্ত। মাত্র একটি মুহূর্ত। তারপর… আকাশ কেঁপে উঠল। আগুন ছড়িয়ে পড়ল। ধোঁয়ায় ঢেকে গেল চারপাশ।  কান্না, চিৎকার, আতঙ্ক, ছুটে চলা মানুষ, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন—সব মিলিয়ে যেন পৃথিবী থমকে গেল। যে শ্রেণিকক্ষে শিশুরা অ আ ক খ শিখছিল, সেখানে নেমে এলো মৃত্যুর নীরবতা। যে করিডোরে একটু আগেও ছোটাছুটি করছিল নিষ্পাপ শিশুরা, সেখানে ছড়িয়ে পড়ল ধ্বংসস্তূপ। একটি মা রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন। একটি বাবা অফিস ছেড়ে প্রাণপণে দৌড়ালেন। কেউ সন্তানকে ডাকছেন   কেউ নাম ধরে চিৎকার করছেন। কেউ বারবার বলছেন— “একবার শুধু আমাকে ডাকো বাবা… আমি এসে গেছি…” কিন্তু কোনো উত্তর নেই। শুধু নীরবতা। শুধু কান্না। শুধু অপেক্ষা। তারপর… একটি ছোট্ট স্কুলব্যাগ। একটি অর্ধপোড়া খাতা। একটি টিফিনবক্স।  একটি অসমাপ্ত চিঠি। একটি থেমে যাওয়া জীবন।  কেউ বলেছিল— “একটি শিশুর দেহ পাওয়া গেছে…” এই একটি বাক্যই একটি পরিবারের সমস্ত পৃথিবী ভেঙে দিয়েছিল। একজন মা বুক চাপড়ে কেঁদে উঠেছিলেন— “আমার বাজান তো বলেছিল, আজ স্কুলে যাবে না। আমি-ই জোর করে পাঠিয়েছি…”  এই কান্নার কোনো ভাষা নেই।
এই বেদনার কোনো অভিধান নেই। এক বছর পরও সেই মায়ের বুকের ভেতর একই প্রশ্ন ঘোরে—  “সেদিন যদি আরেকটু শুনতাম…” কিন্তু ইতিহাসে ‘যদি’ বলে কিছু নেই। থেকে যায় শুধু শূন্যতা।
আজও হয়তো সেই শিশুর আলমারিতে ঝুলছে তার ছোট্ট ইউনিফর্ম। আজও হয়তো বইয়ের ভাঁজে শুকিয়ে আছে একটি ফুল। আজও হয়তো বিছানার পাশে পড়ে আছে প্রিয় খেলনাটি। আজও হয়তো মা রাতে দরজা খুলে মনে মনে বলেন— “বাবা, বাসায় আয়…” কিন্তু কেউ আর ফিরে আসে না। একটি দুর্ঘটনা কেবল কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয় না। এটি ভেঙে দেয় একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ। একজন বাবার স্বপ্ন। একজন মায়ের পৃথিবী। একটি ভাইয়ের হাসি। একটি বোনের খেলাধুলার সঙ্গী। শিশুরা কোনো ভুল করেনি। তারা শুধু পড়তে গিয়েছিল। তারা শুধু স্বপ্ন দেখতে গিয়েছিল। তাদের হাতে ছিল বই, অস্ত্র নয়। তাদের চোখে ছিল ভবিষ্যৎ, ভয় নয়। তাই তাদের মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়—এটি আমাদের সকলের বিবেকের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন।
নিরাপত্তা কি সত্যিই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার? আমরা কি যথেষ্ট প্রস্তুত? আমরা কি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে নিরাপদ করেছি, যাতে একজন অভিভাবক নিশ্চিন্তে সন্তানকে বিদায় জানাতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তদন্ত প্রতিবেদনে নয়, আমাদের নীতিতে, পরিকল্পনায় এবং বাস্তব পদক্ষেপে খুঁজে নিতে হবে। আজ, এই শোকের প্রথম বার্ষিকীতে আমরা মাথা নত করে স্মরণ করি সেই সব নিষ্পাপ শিশুদের, যাদের স্বপ্ন মাঝপথেই থেমে গেছে। আমরা স্মরণ করি সেই সব শিক্ষককে, যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে শিক্ষার্থীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন।
আমরা স্মরণ করি সেই সব উদ্ধারকর্মীকে, যারা আগুন, ধোঁয়া ও বিপদের মাঝেও মানবতার দায়িত্ব পালন করেছেন। আর আমরা শ্রদ্ধা জানাই সেই সব মা-বাবাকে, যারা আজও বুকের ভেতর সন্তানকে বাঁচিয়ে রেখে প্রতিটি দিন বেঁচে আছেন।  তাদের কান্না যেন বৃথা না যায়।  তাদের সন্তানের মৃত্যু যেন শুধু পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে। এই ট্র্যাজেডি আমাদের শিক্ষা দিক—
শিশুদের নিরাপত্তা কোনো বিকল্প নয়, এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।  যে জাতি তার শিশুদের নিরাপদ রাখতে পারে, সেই জাতিই সত্যিকার অর্থে সভ্য।
আজও যেন বাতাসে ভেসে আসে সেই ছোট্ট কণ্ঠ— “আম্মু… আজ আমি স্কুলে যাব না…” এই একটি বাক্য আজ বাংলাদেশের প্রতিটি অভিভাবকের হৃদয়ে অনন্ত প্রতিধ্বনি হয়ে বাজে।
হয়তো কোনো উত্তর নেই। কিন্তু একটি অঙ্গীকার থাকতে পারে। আর কোনো মা যেন এভাবে সন্তান হারিয়ে না কাঁদেন। আর কোনো বাবা যেন একটি ছোট্ট স্কুলব্যাগ বুকে জড়িয়ে শেষ বিদায় না জানান। আর কোনো শিশুর অসমাপ্ত খাতায় যেন জীবন থেমে না যায়। প্রার্থনা করি—সৃষ্টিকর্তা সকল প্রয়াত শিশুকে তাঁর অসীম রহমতে শান্তিতে রাখুন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ধৈর্য ও শক্তি দান করুন। স্মৃতি অমলিন থাকবে। কান্না থামবে না। কিন্তু সেই কান্নাই আমাদের নিরাপদ আগামী নির্মাণের অঙ্গীকার হয়ে থাকুক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here