প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ৩:০৬ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ৮:১৯ এ.এম
-মো. কামাল উদ্দিনঃ
কিছু লেখা শুধু লেখা হয় না—কিছু লেখা সময়ের বুকের ওপর রেখে যাওয়া একেকটি প্রশ্ন।
দুই বছর আগে, ২০২৪ সালে আমি যখন ‘এস আলম গ্রুপকে বাঁচানোর আর্তনাদ: ডুবে যাওয়া টাইটানিকের মতো চট্টগ্রামের বাণিজ্য জাহাজকে রক্ষা করুন’ শিরোনামে লেখাটি লিখেছিলাম, তখন আমি জানতাম না ভবিষ্যৎ আমার সেই লেখাটিকে কোন আলোয় দেখবে।
আজ ২০২৬ সালে ফেসবুকের স্মৃতি হঠাৎ সেই পুরোনো লেখাটি সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিল। লেখাটি পড়তে গিয়ে নিজের কাছেই যেন ফিরে গেলাম সেই সময়টিতে। মনে হলো—কী অদ্ভুত সময় ছিল!
তখন এস আলমের নাম নেওয়াটাই যেন ছিল এক ধরনের অপরাধ। চারপাশে নানা আলোচনা, নানা অভিযোগ, নানা গুঞ্জন—কিন্তু প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস ছিল খুব কম মানুষের। আর আমি তখনও বলেছিলাম, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক, সত্য উদঘাটিত হোক, কিন্তু একটি শিল্পগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রমিক-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকাকে বিপন্ন করা যাবে না।
আমি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখিনি। সেই সময় দৈনিক ভোরের আওয়াজ এবং ইংরেজি দ্য ব্যানার পত্রিকায়ও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছি।
আজ পুরোনো সেই লেখা ফিরে দেখে মনে হচ্ছে—তখন হয়তো আমি অনেকের কাছে অজনপ্রিয় কথা বলেছিলাম, কিন্তু আমার নিজের কাছে আমি অসৎ ছিলাম না।
আমি তখন কী দেখেছিলাম?
আমি দেখেছিলাম চট্টগ্রামের একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা।
আমি দেখেছিলাম একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য মানুষের জীবন।
আমি দেখেছিলাম চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজের উদ্বেগ।
আর সবচেয়ে বড় কথা—আমি দেখেছিলাম, কোনো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান হঠাৎ ভেঙে পড়লে তার অভিঘাত শুধু মালিকের ঘরে গিয়ে থামে না; তার ঢেউ শ্রমিকের ঘর, বাজার, ব্যাংক, পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা এবং বৃহত্তর অর্থনীতিতেও গিয়ে আঘাত করতে পারে।
সেই জায়গা থেকেই আমার প্রশ্ন ছিল—
অভিযোগের বিচার হবে, নাকি প্রতিষ্ঠানটিই ধ্বংস হবে?
আজকের তথ্য কী বলছে?
২০২৪ সালের আগস্টে প্রকাশিত বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ছয়টি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৫,৩৩১ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এর প্রায় ৭৯ শতাংশই ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছিল এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাংকিং নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠে আসে।
আরও একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন-সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ১৭,২২৯ কোটি টাকা ঋণের তথ্য পাওয়া যায়; এসব ঋণের বড় অংশ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও উঠে আসে।
ইসলামী ব্যাংক নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে। ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে ব্যাংকটির ঋণপোর্টফোলিওতে এস আলম-সংশ্লিষ্ট ঋণের বড় অংশের কথা বলা হয় এবং ঋণের বিপরীতে সম্পদের মূল্যায়ন ও জামানত নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
অর্থাৎ আজ যে বাস্তবতার কথা আমরা আলোচনা করছি, তার অনেকগুলো প্রশ্নই ২০২৪ সালে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছিল।
কিন্তু তখনও আমার বক্তব্য ছিল—অভিযোগের তদন্ত হোক, অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হোক; কিন্তু তদন্ত আর ধ্বংস—দুটিকে যেন এক করে না ফেলা হয়।
আমি কি এস আলমের সবকিছুর পক্ষে ছিলাম?
না।
আজও নই।
এটি স্পষ্ট করে বলা দরকার।
আমি কোনো ব্যক্তির অন্যায়, অনিয়ম, ঋণখেলাপি, অর্থপাচার কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের পক্ষে নই। কোনো প্রতিষ্ঠানই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
বরং আমি মনে করি—অভিযোগ যত বড়, তদন্ত তত স্বচ্ছ হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কিংবা আদালত—যে প্রতিষ্ঠানই কোনো অভিযোগের তদন্ত করুক, তাদের স্বাধীনভাবে সত্য উদঘাটন করতে হবে।
২০২৪ সালেই এস আলম-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট সংক্রান্ত লেনদেন পরীক্ষা করতে এনবিআর অডিট কমিটি গঠন করে। ১৮টি প্রতিষ্ঠানের পাঁচ বছরের আর্থিক লেনদেন ও ক্রয়-বিক্রয় নথি পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
একই সময়ে এস আলম গ্রুপের সম্পদ ও বিদেশে অর্থ স্থানান্তর নিয়ে আদালতেও বিষয়টি ওঠে। হাইকোর্ট দুদকের কাছে এ বিষয়ে তথ্য চেয়েছিল এবং সম্পদ হস্তান্তর ও বিক্রয়সংক্রান্ত বিষয়েও তদন্তের নির্দেশনা আসে।
তাই আজ কেউ যদি বলেন, “এস আলমের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই ছিল না”—সেটি তথ্যসম্মত হবে না।
আবার কেউ যদি বলেন, “অভিযোগ উঠেছে মানেই সব অপরাধ প্রমাণিত”—সেটিও ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অভিযোগ আর অপরাধ এক জিনিস নয়। তদন্ত আর রায়ও এক জিনিস নয়।
এই জায়গাটিই আমি ২০২৪ সালেও বলতে চেয়েছিলাম।
বিদেশে বিনিয়োগ মানেই কি অর্থপাচার?
এই প্রশ্নটিও তখন অত্যন্ত আলোচিত ছিল।
বিদেশে কোনো বাংলাদেশি ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে বিনিয়োগ করলে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থপাচার বলা যায় না। আবার বিদেশে সম্পদ থাকলেই সেটি বৈধ—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
প্রমাণ, নথি, অর্থের উৎস, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের অনুমতি এবং সংশ্লিষ্ট আইনের আলোকে প্রতিটি বিষয় পরীক্ষা করতে হয়।
২০২৪ সালে সিঙ্গাপুরের Financial Intelligence Unit এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেশি-বিদেশি সম্পদ সম্পর্কে বাংলাদেশের Financial Intelligence Unit-এর কাছে তথ্য চেয়েছিল—এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।
সুতরাং আমার অবস্থান ছিল খুব পরিষ্কার—
যা বৈধ, তা বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি পাক; যা অবৈধ, তা আইনের আওতায় আসুক। কিন্তু অনুমানকে যেন প্রমাণের বিকল্প বানানো না হয়।
চট্টগ্রামের মানুষ হিসেবে আমার কষ্টটা এখানেই
এস আলম গ্রুপের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামের।
এই শহরের মাটি থেকে উঠে আসা একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন একজন চট্টগ্রামবাসী হিসেবে আমার উদ্বেগ থাকতেই পারে।
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বন্দরনগরী। আমদানি-রপ্তানি, শিল্প, বাণিজ্য ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতির সঙ্গে এই নগরীর সম্পর্ক বহু পুরোনো।
এই শহর বহু উদ্যোক্তা সৃষ্টি করেছে।
কেউ ছোট থেকে বড় হয়েছেন। কেউ পরিবহন দিয়ে শুরু করেছেন, কেউ আমদানি-রপ্তানি দিয়ে, কেউ শিল্প দিয়ে।
এস আলম গ্রুপও দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন খাতে ব্যবসা বিস্তার করেছে। গ্রুপটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে ইস্পাত, সিমেন্ট, ভোজ্যতেল, পরিবহন, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আজ সেই শিল্পভিত্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আমার উদ্বেগের জায়গাটি তাই কেবল একটি কোম্পানি নয়—
চট্টগ্রামের শিল্পপরিবেশ।
কিন্তু আজ বাস্তবতা আরও কঠিন
২০২৪ সালের শেষদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
জানতা ব্যাংক এস আলম গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ১,৯৬৪ কোটি টাকার ঋণখেলাপির মামলা করে। আদালত সংশ্লিষ্ট শেয়ার হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না, তা তদন্তের বিষয়ও সামনে আসে।
এরপর দুদকও এস আলম-সংশ্লিষ্ট ঋণ অনিয়মের বিষয়ে মামলা করে।
অর্থাৎ ২০২৪ সালের আমার লেখার সময় যে প্রশ্নগুলো ছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলো আরও বড় আইনি ও আর্থিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
কিন্তু এখানেই আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন—
আইনের বিচার চলবে, কিন্তু শিল্প কি চলবে না?
প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে আলাদা করে দেখার সময় এসেছে
আমার মনে হয় এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই জায়গাটিতে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করা।
যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকে, তদন্ত হোক।
যদি কোনো কোম্পানি ঋণখেলাপি হয়, আইন অনুযায়ী ঋণ উদ্ধার করা হোক।
যদি সম্পদ অবৈধভাবে অর্জিত হয়ে থাকে, আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
কিন্তু পাশাপাশি যেসব কারখানা উৎপাদন করতে পারে, যেসব শ্রমিক কাজ করতে পারে, যেসব শিল্পসম্পদ দেশের অর্থনীতিতে ব্যবহারযোগ্য—সেগুলোকে কি পুনর্গঠন করে সচল রাখা যায় না?
ধ্বংসের চেয়ে পুনর্গঠন কি রাষ্ট্রের জন্য বেশি লাভজনক নয়?
এই প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক।
কারণ কারখানা বন্ধ হলে শুধু মালিকের ক্ষতি হয় না
একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গেটে তালা পড়লে তার শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত যায়।
শ্রমিকের ঘরে যায়।
তার সন্তানের স্কুলে যায়।
বাজারের দোকানে যায়।
পরিবহন ব্যবসায়ীর ঘরে যায়।
সরবরাহকারীর প্রতিষ্ঠানে যায়।
ব্যাংকের হিসাবেও যায়।
একটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হলে তার সঙ্গে সম্পর্কিত বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাও সংকটে পড়তে পারে।
তাই আমার ২০২৪ সালের আহ্বান ছিল—
ব্যক্তির বিচার করুন, কিন্তু শিল্পকে বাঁচানোর পথ খুঁজুন।
তখন আমি একা ছিলাম—আজ কি সময় বদলেছে?
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় এখানেই।
আমি যখন লিখেছিলাম, তখন অনেকেই নীরব ছিলেন।
কেউ হয়তো ভয় পেয়েছেন।
কেউ হয়তো রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে কথা বলেননি।
কেউ হয়তো ভেবেছেন—এস আলমের পক্ষে কথা বলা মানেই কোনো বিশেষ পক্ষের পক্ষে দাঁড়ানো।
আর আমি তখন বলেছিলাম—
না, আমি কোনো ব্যক্তির পক্ষে দাঁড়াচ্ছি না; আমি দাঁড়াচ্ছি একটি প্রশ্নের পক্ষে।
আমি দাঁড়াচ্ছি শ্রমিকের পক্ষে।
আমি দাঁড়াচ্ছি চট্টগ্রামের শিল্পের পক্ষে।
আমি দাঁড়াচ্ছি ন্যায়বিচারের পক্ষে।
আমি দাঁড়াচ্ছি সত্য জানার অধিকার নিয়ে।
আজ যদি কেউ একই কথা বলেন, আমি তাকে স্বাগত জানাব।
কিন্তু ইতিহাসের পাতায় একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—
সময় অনুকূলে থাকলে সত্য বলা সহজ; প্রতিকূল সময়ে সত্য বলার সাহসই সাংবাদিকতার আসল পরীক্ষা।
আমার কলমের দায়
আমি সাংবাদিকতা করেছি শুধু সংবাদ প্রকাশের জন্য নয়; মানুষের কথা বলার জন্যও।
আমি বিশ্বাস করি, সাংবাদিকের কাজ কারও অন্ধ সমর্থক হওয়া নয়, আবার কারও অন্ধ বিরোধী হওয়াও নয়।
সাংবাদিকের কাজ প্রশ্ন করা।
ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করা।
রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করা।
ব্যবসায়ীকে প্রশ্ন করা।
আবার জনমতকেও প্রশ্ন করা।
কারণ গণমাধ্যম যদি কেবল জনপ্রিয় কথাই বলে, তাহলে সমাজে নতুন কোনো সত্য জন্ম নেয় না।
২০২৪ সালে আমার লেখাটি হয়তো অনেকের ভালো লাগেনি।
হয়তো কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন।
হয়তো কেউ মনে করেছিলেন, আমি কেন এমন সময়ে এস আলমের পক্ষে কথা বলছি?
কিন্তু আজ আমি স্পষ্ট করে বলতে পারি—
আমি তখনও বলেছিলাম, অপরাধ হলে বিচার হোক; কিন্তু শিল্প ও কর্মসংস্থান ধ্বংস হোক—এটি আমি চাইনি।
আজও চাই না।
আজকের আবেদন
আজ আমার আবেদন কোনো ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়।
আমার আবেদন—
চট্টগ্রামের শিল্পের জন্য।
আমার আবেদন—
শ্রমিকের রুটি-রুজির জন্য।
আমার আবেদন—
দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য।
এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ আছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। সত্য প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। রাষ্ট্রের পাওনা রাষ্ট্র উদ্ধার করুক। ব্যাংকের অর্থ ফেরত আনার কার্যকর ব্যবস্থা হোক।
কিন্তু একই সঙ্গে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিকভাবে পুনর্গঠনযোগ্য, সেগুলোকে ধ্বংস না করে স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, স্বাধীন অডিট, কঠোর ব্যাংকিং নজরদারি, দায় নির্ধারণ এবং প্রয়োজন হলে নতুন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সচল রাখার পথ খুঁজে দেখা হোক।
কারণ একটি কারখানা গড়ে তুলতে বছরের পর বছর লাগে।
একটি দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে সময় লাগে।
একটি বাজার তৈরি করতে দশকের পর দশক লাগে।
কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিতে কখনো কখনো কয়েকটি ভুল সিদ্ধান্তই যথেষ্ট।
আজ ফেসবুক আমার ২০২৪ সালের লেখাটি ফিরিয়ে দিয়েছে।
স্ক্রিনে পুরোনো অক্ষরগুলো দেখে মনে হলো—
কিছু লেখা পুরোনো হয়, কিন্তু কিছু প্রশ্ন পুরোনো হয় না।
তখন আমি লিখেছিলাম—এস আলম গ্রুপ যেন ডুবে যাওয়া টাইটানিকের মতো। আজ সেই উপমাটি আরও গভীর মনে হচ্ছে।
তবে আজ আমি সেই কথাটিকে নতুনভাবে বলতে চাই—
টাইটানিক ডুবে যাওয়ার আগে যদি সতর্কতার সংকেত শোনা যেত, যদি সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত, তাহলে হয়তো ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত।
আমরাও কি আমাদের শিল্প ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে সেই ভুল করতে চাই?
অভিযোগের বিচার হোক—অবশ্যই।
অপরাধের শাস্তি হোক—অবশ্যই।
রাষ্ট্রের অর্থ উদ্ধার হোক—অবশ্যই।
কিন্তু একই সঙ্গে—
চট্টগ্রামের শিল্প বাঁচুক।
শ্রমিকের কর্মসংস্থান বাঁচুক।
ব্যবসার পরিবেশ বাঁচুক।
দেশের অর্থনীতি বাঁচুক।
আর আমার ২০২৪ সালের সেই লেখার সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য থাকুক এই কথাটি—
“আমি তখনও কারও অন্যায়ের পক্ষে ছিলাম না; আমি ছিলাম ধ্বংসের পরিবর্তে ন্যায়বিচার, পুনর্গঠন ও জনস্বার্থের পক্ষে।”
আজ যারা কথা বলছেন, তাদের আমি স্বাগত জানাই।
তবে সময়ের কাছে আমার ছোট্ট প্রশ্ন—
যে কথা আজ বলা হচ্ছে, সেই কথা যখন বলা কঠিন ছিল, তখন আমরা কোথায় ছিলাম?
আমি অন্তত আমার উত্তর দিতে পারি—
আমি আমার কলম নিয়ে তখনও ছিলাম। আজও আছি।
সাংবাদিক, লেখক, গবেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক
মহাসচিব, বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম