-মো. কামাল উদ্দিনঃ
মানুষকে চেনা যায় না শুধু তার পোশাকে, পদবিতে কিংবা পরিচয়ের খাতায়। মানুষকে চিনতে হলে কখনো কখনো তার পাশে বসতে হয়, তার কথার ভেতরের নীরবতা শুনতে হয়, তার চোখের ভাষা পড়তে হয়। তখনই বোঝা যায়—বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে মানুষটি আসলে কেমন।
পুলিশের পোশাকের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে দায়িত্ব, কর্তৃত্ব, শৃঙ্খলা আর কঠোরতা। কিন্তু সেই পোশাক খুলে যখন একজন পুলিশ কর্মকর্তা বন্ধুর পাশে বসেন, এক কাপ চায়ে দীর্ঘ আড্ডায় হারিয়ে যান, সাহিত্য নিয়ে কথা বলেন, মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে ভাবেন—তখন আবিষ্কার করা যায় সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষকে।
পুলিশ পরিদর্শক জাহিদুল কবির আমার কাছে ঠিক তেমনই একজন মানুষ।
তাঁকে আমি আজকের অবস্থান থেকে চিনি না। তাঁর পুলিশি জীবনের শুরু থেকেই তাঁকে দেখেছি, চিনেছি এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পেশাগত পথচলার অনেকটা পথ কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।
চকবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে দেখেছি তাঁকে। এরপর চান্দগাঁও থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে বায়েজিদ থানার দায়িত্বও সামলেছেন। কর্মজীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে বর্তমানে তিনি বাকলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
থানা বদলেছে, দায়িত্বের পরিধি বদলেছে, চারপাশের মানুষ বদলেছে—কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়ের জায়গাটিতে একটি বিষয় কখনো বদলায়নি; সেটি হলো তাঁর সহজ-সরল মানবিক আচরণ।
একটি রাতের চা-আড্ডা
কিছু কিছু রাত থাকে, যেগুলো ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখ হয়ে থাকে না—স্মৃতির ভেতর আলাদা একটি ঘর বানিয়ে নেয়।
বাকলিয়া থানায় সেদিনের রাতটিও আমার কাছে তেমনই একটি রাত।
ব্যস্ত থানার পরিবেশ। চারপাশে দায়িত্বের ব্যস্ততা। কোথাও ফোনের শব্দ, কোথাও পুলিশের আনাগোনা, কোথাও মানুষের অভিযোগ-অভিমান। অথচ সেই ব্যস্ততার মধ্যেই তাঁর টেবিলের পাশে বসে এক কাপ চা হাতে শুরু হলো আমাদের দীর্ঘ আড্ডা।
কথা শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। কিন্তু কখন যে কথার স্রোত সাহিত্য থেকে সমাজে, সমাজ থেকে অপরাধে, অপরাধ থেকে আইন-আদালতে, আর সেখান থেকে মানুষের মনোজগতে গিয়ে পৌঁছাল—টেরই পেলাম না।
আমি তখন আবারও উপলব্ধি করলাম—এই মানুষটিকে শুধু পুলিশ অফিসার হিসেবে দেখলে তাঁকে পুরোপুরি দেখা হয় না।
তিনি পুলিশের দায়িত্ব বোঝেন, কিন্তু মানুষের মনও বোঝার চেষ্টা করেন।
তিনি অপরাধ দেখেন, কিন্তু অপরাধের পেছনের গল্পটিও জানতে চান।
তিনি আইন প্রয়োগ করেন, কিন্তু আইনের পাশাপাশি মানবিকতার জায়গাটিও ভুলে যেতে চান না।
পুলিশের পোশাকের ভেতরে একজন পাঠক
আমার লেখালেখির কথা তিনি প্রায়ই বলেন। আমার লেখা পড়েন। কখনো প্রশংসা করেন, কখনো প্রশ্ন করেন। সেদিনও কথার এক ফাঁকে হেসে বললেন—
“কামাল ভাই, আপনি এত লেখেন কীভাবে? কখন লেখেন?”
আমি হাসলাম।
বললাম—“এটা আমার কাছে লেখালেখি নয়, এক ধরনের সাধনা।”
তিনি চুপ করে শুনলেন।
তাঁর চোখে তখন যে কৌতূহল দেখেছিলাম, সেটি কোনো পুলিশ কর্মকর্তার কৌতূহল নয়—একজন পাঠকের কৌতূহল।
তখন মনে হলো, কঠিন পুলিশিংয়ের ভেতরেও এই মানুষটি কোথাও না কোথাও শব্দের কাছে আশ্রয় খোঁজেন।
সাহিত্য হয়তো তাঁর পেশা নয়; কিন্তু সাহিত্যের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আছে। আর মানুষের জীবন, অপরাধ, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসঙ্গতি নিয়ে তাঁর যে চিন্তা—সেটি একজন লেখকের চিন্তার সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।
একটি কথার মধ্যে লুকিয়ে থাকা স্বপ্ন
সেদিনের আড্ডার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি এসেছিল হঠাৎ।
তিনি আমাকে বললেন—
“কামাল ভাই, আমি আপনাকে নিয়ে একটি গবেষণামূলক লেখা লিখতে চাই। তবে পুলিশের ভাষায় নয়—একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে। অপরাধ ও অপরাধী, আইন ও আদালত, মানবাধিকার আর সমাজের অসঙ্গতিগুলোকে নিয়ে লিখতে চাই। এমনভাবে লিখতে চাই, যাতে সেটা শুধু লেখা না হয়ে মানুষের জন্য একটা মেসেজ হয়।”
কথাটি শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিজের দায়িত্বের অভিজ্ঞতাকে শুধু চাকরির ফাইলে আটকে রাখতে চান না—কলমের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চান—এটি আমার কাছে নিঃসন্দেহে আনন্দের বিষয়।
আমি তাঁকে বলেছিলাম—
“আপনি লিখুন। আপনার দেখা সমাজের গল্প অন্যদের দেখা গল্পের মতো হবে না।”
কারণ একজন পুলিশ কর্মকর্তা মানুষের জীবনের যে অন্ধকার দিকটি কাছ থেকে দেখেন, একজন সাধারণ মানুষ হয়তো তার সামান্য অংশও দেখতে পান না।
কঠোরতার ভেতরে কোমলতা
জাহিদুল কবিরের আরেকটি দিক আমাকে সবসময় ভাবায়।
পুলিশের দায়িত্বে তাঁকে কঠোর হতে হয়। অপরাধের সঙ্গে আপস করার সুযোগ নেই। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আবেগকে দূরে রাখতে হয়। একজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্বই প্রথম কথা।
কিন্তু সেই কঠোরতার ভেতরেও আমি দেখেছি একজন সহজ মানুষকে।
মানুষের কথা মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করেন তিনি। সমাজের দুর্বল মানুষের কথা ভাবেন। অপরাধ দমনকে শুধু শাস্তির বিষয় হিসেবে না দেখে অপরাধ প্রতিরোধ ও সংশোধনের দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন।
এই জায়গাটিই হয়তো তাঁর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে সুন্দর দিক।
কারণ কঠোর হওয়া সহজ; কঠোর দায়িত্ব পালন করেও মানবিক থাকা কঠিন।
পেকুয়ার মাটির মানুষ
কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার পেকুয়ার সন্তান জাহিদুল কবির।
গ্রামের মাটি, মানুষের সহজ সম্পর্ক, শৈশবের স্মৃতি—এসব মানুষের চরিত্রে কোথাও না কোথাও থেকে যায়। আমার মনে হয়, তাঁর ভেতরের এই সরলতার শিকড়ও সেই মাটির কাছেই।
পুলিশের দীর্ঘ চাকরি, শহুরে ব্যস্ততা, অপরাধের কঠিন বাস্তবতা—সবকিছুর মধ্যেও তাঁর কথাবার্তায় সেই সহজ মানুষটির ছায়া পাওয়া যায়।
সম্ভবত এ কারণেই তিনি মানুষের গল্প শুনতে পারেন।
সম্ভবত এ কারণেই সাহিত্য তাঁকে টানে।
সম্ভবত এ কারণেই একজন অপরাধীর মধ্যেও তিনি শুধু অপরাধীকে নয়, তার পেছনে থাকা মানুষটিকেও দেখতে চান।
আমার চোখে জাহিদুল কবির
আমি তাঁকে নিয়ে লিখতে বসে তাঁর পদবি দিয়ে শুরু করতে চাইনি।
কারণ তিনি আমার কাছে শুধু একজন অফিসার ইনচার্জ নন।
তিনি একজন পরিচিত মানুষ। একজন আড্ডার সঙ্গী। একজন সাহিত্যপ্রেমী পাঠক। একজন চিন্তাশীল পুলিশ কর্মকর্তা। একজন দায়িত্বশীল পেশাজীবী।
চকবাজার থেকে চান্দগাঁও, চান্দগাঁও থেকে বায়েজিদ, আর এখন বাকলিয়া—তাঁর এই পথচলার প্রতিটি অধ্যায়ে আমি একজন পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি একজন মানুষের বিবর্তনও দেখতে পাই।
তাঁর কর্মজীবনের মূল্যায়ন করার মতো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থানে আমি নেই। কিন্তু একজন দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষ হিসেবে এতটুকু বলতে পারি—দায়িত্ব, সততা, ন্যায়বোধ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে মানবিকতাকে ধরে রাখার চেষ্টা তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
একদিন হয়তো তিনি লিখবেন
আমি বিশ্বাস করি, একদিন জাহিদুল কবির সত্যিই লিখবেন।
লিখবেন থানার ভেতরের গল্প।
লিখবেন অপরাধীর চোখে দেখা সমাজের গল্প।
লিখবেন অসহায় মানুষের কান্নার গল্প।
লিখবেন আইন ও মানুষের দূরত্বের গল্প।
লিখবেন পুলিশের দায়িত্বের গল্প।
আর হয়তো লিখবেন এমন কিছু মানুষের গল্প, যাদের জীবন আমরা প্রতিদিন পাশ কাটিয়ে চলে যাই।
সেদিন তাঁর লেখা শুধু সাহিত্য হবে না; হয়ে উঠতে পারে তাঁর দেখা সময়ের একটি মূল্যবান দলিল।
কারণ যে মানুষ অপরাধকে খুব কাছ থেকে দেখেছে, সে যদি মানুষের গল্প লিখে—সেই গল্পের গভীরতা অন্যরকম হবেই।
শেষ কথাটি
জাহিদুল কবিরকে আমি যখন পুলিশের পোশাকে দেখি, তখন দেখি একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তাকে।
আর যখন চায়ের কাপ হাতে তাঁর পাশে বসি, তখন দেখি অন্য একজন জাহিদুলকে।
সেখানে কোনো ইউনিফর্ম নেই, কোনো পদমর্যাদার দূরত্ব নেই—আছে শুধু একজন মানুষ, যিনি সাহিত্য নিয়ে কথা বলেন, সমাজ নিয়ে ভাবেন, মানুষের কথা শুনতে চান এবং নিজের দেখা জীবনকে একদিন হয়তো শব্দে বন্দী করতে চান।
এই দুই জাহিদুলকে মিলিয়েই আমার কাছে তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয়।
আইনের কাছে তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা;
সহকর্মীদের কাছে একজন দায়িত্বশীল অফিসার;
আর আমার কাছে—ইউনিফর্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একজন সাহিত্যপ্রেমী, মানবিক ও সহজ-সরল মানুষ।
সময়ের সঙ্গে মানুষের পদ বদলায়, কর্মস্থল বদলায়, দায়িত্ব বদলায়। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের আচরণ দিয়ে স্মৃতিতে থেকে যান।
জাহিদুল কবিরও তেমন একজন।
চকবাজারের দিন থেকে চান্দগাঁও, বায়েজিদ পেরিয়ে আজকের বাকলিয়া—থানার ঠিকানা বদলেছে; কিন্তু মানুষটি আমার স্মৃতিতে একই রয়ে গেছেন।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর হাতে আইন; আর একজন মানুষ হিসেবে তাঁর হৃদয়ে মানুষের জন্য জায়গা—এই দুইয়ের সমন্বয়ই হয়তো তাঁর সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়।
আর সেই কারণেই তাঁকে নিয়ে আমার এই স্মৃতিচারণ—একজন পুলিশ অফিসারকে নিয়ে নয়, একজন মানুষের গল্প।