জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে বাজারে বাড়ছে পণ্যের দাম, দুশ্চিন্তায় মানুষ

0
53

দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে এমনিতেই চাপে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ। এর মধ্যে এক ধাক্কায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোয় বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আটা, তেল, সবজি, চাল, ডিমসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের মাসিক বাজেট সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমেছে। এর আগে জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। মে মাসে এ হার ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৪২ ও ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার কয়েক মাস ধরে কমলেও গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে বিভিন্ন পণ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও জানান তিনি। তবে রাজধানীর বাজারের চিত্রে এরই মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানির দাম বাড়ার পর পণ্য পরিবহনে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। সেই অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বেগুন বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা কেজিতে। আগে ৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া অনেক সবজি এখন ১০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের দামও বেড়ে কেজিতে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা হয়েছে। চালের বাজারেও বেড়েছে দাম। বিশেষ করে মাঝারি মানের চালের কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। খোলা আটা-ময়দার দাম বেড়েছে কেজিতে প্রায় ৫ টাকা। খোলা সয়াবিন ও পাম তেলও বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ডিমের দামও বেড়েছে। ১৪৫ টাকা দরের এক ডজন ফার্মের বাদামি ডিম এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকায়। এছাড়া বেসরকারি কোম্পানিগুলো তরল দুধের দাম লিটারে ১০ টাকা বাড়িয়েছে। ফলে এক লিটার দুধের দাম দাঁড়িয়েছে ১১০ টাকা। সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদনেও সপ্তাহের ব্যবধানে বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়ার তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে খোলা পাম ও পাম সুপার তেল, এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল, খোলা আটা-ময়দা, মাঝারি মানের চাল, বড় দানার মসুর ডাল, বেগুন, কাঁচামরিচ ও ডিম। বাজারে নতুন করে দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। বেসরকারি চাকরিজীবী মো. মোস্তাক আহমেদ বলেন, চাল, ডাল, তেল ও মসলার দাম বেড়ে যাওয়ায় মাসিক বাজেটে চাপ তৈরি হয়েছে। মাছ-মাংস আগেই কমিয়ে দিয়েছেন। এখন ডিম ও দুধের দামও বাড়ায় সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কদমতলীর দিনমজুর মোতাহার মিয়াও বলেন, দাম বাড়তে থাকায় একের পর এক প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কমাতে হচ্ছে। আয় দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাতে আগেই পণ্যের দাম বাড়াচ্ছিলেন। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে তারা নতুন একটি অজুহাত পেয়েছেন। বাজারে নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরামর্শ দেন তিনি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দুর্বল অর্থনীতি ও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে জ্বালানির দাম একবারে এতটা বাড়ানোয় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। তার মতে, জ্বালানি আমদানির কর সাময়িকভাবে কমানো, অপচয় ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহন ভাড়া ও বাজার তদারকি জোরদারের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি একটি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ধীরে ধীরে অন্যান্য পণ্য ও সেবায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হলেও বিদ্যমান কর্মসূচি ও বরাদ্দ যেন প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here