৫০ হাজার টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ থেকে রক্তাক্ত সংঘর্ষ” চার দিনেও মামলা নেই—চৌদ্দগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

0
14

কুমিল্লা প্রতিনিধি:
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ৫০ হাজার টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক পরিবারের ওপর হামলা, নারী নির্যাতন, অস্ত্র দিয়ে আঘাত, নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া, বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর এবং হত্যার হুমকির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও নিয়মিত মামলা না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, ঘটনাটি নিছক পারিবারিক বা প্রতিবেশী বিরোধ নয়; ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবির ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বিরোধের সূত্রপাত এবং পরবর্তীতে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে চাঁদাবাজির মূল বিষয়টি এজাহারে যথাযথভাবে প্রতিফলিত না করে ঘটনাটিকে অপেক্ষাকৃত সাধারণ মারামারি ও লুটপাটের ঘটনায় সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।


এ অবস্থায় চৌদ্দগ্রাম থানার পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী পক্ষ।
ঘটনার শুরু যেভাবে
চৌদ্দগ্রাম থানার গুণবতী ইউনিয়নের আকদিয়া গ্রামের বাসিন্দা মফিজুর রহমানের অভিযোগ, তিনি কুমিল্লা শহরে চাকরি করেন এবং মাস শেষে বাড়িতে আসেন। তার বাড়ির পাশের বাসিন্দাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিবেশীর দুটি বড় গাছের ডাল তার টিনের বসতঘরের ওপর চলে আসায় তিনি গাছের ডাল কাটার অনুরোধ করেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানানো হলে অভিযুক্তরা তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে থাকে।
তবে ভুক্তভোগী পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এর সঙ্গে পরবর্তীতে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবির বিষয়টি যুক্ত হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে তাদের দাবি।
একদিনে একাধিক দফা হামলার অভিযোগ


অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গত ২ অক্টোবর সকাল ৯টার দিকে মফিজুর রহমান বাড়িতে প্রবেশ করার সময় কয়েকজন অভিযুক্ত তাকে অনুসরণ করে বাড়িতে যায়। সেখানে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।
একই দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে বাড়ির পাশের চায়ের দোকানে যাওয়ার পথে তাকে আটকিয়ে কয়েকজন কিল-ঘুষি ও লাথি মারতে থাকে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তার চিৎকারে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে এলে তাদেরও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। এমনকি তার স্ত্রী ও বৃদ্ধা মাকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত এবং মারধর করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পরবর্তীতে কয়েকজন অজ্ঞাতনামা যুবক ঘটনাস্থলে এসে হামলাকারীদের সঙ্গে যোগ দেয়। তাদের হাতে লোহার রড, এসএস পাইপ, বাঁশ ও গাছের লাঠি ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
এক পর্যায়ে এসএস পাইপ দিয়ে মাথায় আঘাত করা হলে মফিজুর রহমানের কপাল ফেটে রক্তাক্ত জখম হয় বলে অভিযোগ। আরেকটি আঘাত ঠেকাতে গিয়ে তার ডান হাতে গুরুতর আঘাত লাগে এবং হাড় ভেঙে যাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তাকে লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয় এবং হাতে কামড় দিয়ে জখম করা হয়।
নারী ও বৃদ্ধার ওপর হামলার অভিযোগ
ঘটনার সময় মফিজুর রহমানের স্ত্রী ও বৃদ্ধা মাকেও মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে একজন নারী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মফিজুর রহমানের স্ত্রীর চুলের মুঠি ধরে মারধর এবং তার মাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে আঘাত করার অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে এটি কেবল সাধারণ মারামারির ঘটনা নয়; নারী ও বয়স্ক ব্যক্তির ওপর সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ হিসেবেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে।
নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগপত্রে মফিজুর রহমানের কাছ থেকে তার বেতনের ২৫ হাজার ৫০০ টাকা এবং একটি স্যামসাং মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে একদল লোক তার বাড়িতে প্রবেশ করে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ। ভাঙচুরে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে বাদীপক্ষের দাবি।
এ সময় ঘরে রাখা জমি বন্ধকের এক লাখ ৭০ হাজার টাকা, একটি মোবাইল ফোন এবং তার স্ত্রীর গলায় থাকা প্রায় ১২ আনা ওজনের স্বর্ণের চেইন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—৫০ হাজার টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ কোথায়?


ঘটনার শুরু নিয়ে ভুক্তভোগী পক্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি।
তাদের দাবি, চাঁদাবাজির ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বিরোধের সূত্রপাত। অথচ পরবর্তী অভিযোগে চাঁদাবাজির বিষয়টি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে—
মূল ঘটনা যদি চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে, তাহলে সেই অভিযোগ বাদ বা পরিবর্তিত হলো কীভাবে?
কোনো পক্ষের চাপ, প্রভাব কিংবা অন্য কোনো কারণে অভিযোগের প্রকৃতি পরিবর্তন করা হয়েছে কি না—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী পক্ষ।
চার দিনেও মামলা না হওয়া কেন?
ঘটনার পর চার দিন পার হয়ে গেলেও নিয়মিত মামলা না হওয়ায় আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একজন অভিযোগকারী যদি হামলা, অস্ত্র দিয়ে আঘাত, নারী নির্যাতন, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়া, বাড়ি ভাঙচুর এবং হত্যার হুমকির মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ করেন, তাহলে পুলিশ কেন দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নিল না—এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
বিশেষ করে অভিযোগে যখন বলা হয়েছে, মামলা করলে বাদী ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয়েছে, তখন ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হলো অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। কোনো অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা তা তদন্তের বিষয়।
কিন্তু অভিযোগ পাওয়ার পর দীর্ঘসূত্রতা, মামলা না হওয়া কিংবা অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ার অভিযোগ সত্য হলে তা অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে।
এ কারণে স্থানীয়দের প্রশ্ন—
চৌদ্দগ্রাম থানায় অভিযোগটি কীভাবে গ্রহণ করা হয়েছে?
কেন এখনো নিয়মিত মামলা হয়নি?
৫০ হাজার টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ কেন গুরুত্ব পায়নি?
অভিযোগে উল্লেখিত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের শনাক্ত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো পুলিশি তদন্ত বা অভিযান হয়েছে কি না?
ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা প্রয়োজন
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কিশোর বয়সকে অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যদি কেউ সংঘবদ্ধ হামলা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র প্রদর্শন কিংবা মানুষের জানমালের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তবে একই সঙ্গে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করে সুনির্দিষ্ট তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, চিকিৎসা প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের তথ্য, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজির হস্তক্ষেপ কামনা
এই ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগের সুষ্ঠু প্রতিকার না হলে বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
তাই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা যাচাই, কিশোর গ্যাংয়ের কথিত সম্পৃক্ততা তদন্ত, হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারের উদ্যোগ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পক্ষের প্রত্যাশা—থানা পর্যায়ের তদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। এতে অভিযোগের সত্যতা যেমন বেরিয়ে আসবে, তেমনি প্রকৃত অপরাধী ও ঘটনার নেপথ্যের কারণও স্পষ্ট হবে।
পুলিশের বক্তব্যই এখন গুরুত্বপূর্ণ
এ ঘটনায় চৌদ্দগ্রাম থানার পুলিশের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগটি কবে গ্রহণ করা হয়েছে, মামলা না হওয়ার কারণ কী, চাঁদাবাজির অভিযোগ কেন এজাহারে প্রতিফলিত হয়নি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের জবাব পুলিশের কাছ থেকেই আসা উচিত।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। তবে ৫০ হাজার টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ, সংঘবদ্ধ হামলা, কিশোর গ্যাংয়ের কথিত সম্পৃক্ততা, অস্ত্র দিয়ে আঘাত, নারী ও বৃদ্ধার ওপর হামলা, বাড়িতে ভাঙচুর এবং বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগের পরও চার দিনেও মামলা না হওয়া নিঃসন্দেহে তদন্তের দাবি রাখে।
আইনের শাসনের স্বার্থে এখন প্রয়োজন—অভিযোগ নয়, সত্য উদঘাটন; প্রভাব নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত; এবং অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here