শিবপুরে শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা দেওয়ার অভিযোগ | চাঁদাবাজি, মানবপাচার ও মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার দাবি
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নে দেড় দশক ধরে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শওকত এবং তাঁর সহোদর মাহবুবর রহমান পটল ওরফে ইমনের বিরুদ্ধে। তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদার টাকা না পেলে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাশকতা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে মামলায় জড়ানোর অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। দৈনিক সাতনদীর বিশেষ অনুসন্ধানে এসব অভিযোগ উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, শিবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শওকত ও তাঁর ভাই পটল দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি-জামায়াতের সক্রিয় নেতাকর্মীদের কাছে আতঙ্কের কারণ ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে আদম পাচার, মাদক ব্যবসা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জিম্মি করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দাবি করে তা পরিশোধের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হতো। নির্ধারিত সময়ে টাকা দিতে না পারলে তাঁদের বিরুদ্ধে নাশকতা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে মামলা দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলার কারণে অনেক নেতাকর্মীকে দীর্ঘ সময় বাড়িঘর ছেড়ে থাকতে হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তাঁরা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শওকত-পটল এলাকা ছেড়ে চলে যান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। একই সময়ে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা বিএনপি-জামায়াতের অনেক নেতাকর্মীও নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির বিবরণ পাওয়া গেছে।
শিবপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মাসুম বিল্লাহ জানান, তাঁর বিরুদ্ধে নাশকতা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও বিস্ফোরক আইনে মোট ২০টি মামলা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। এসব মামলার কারণে বছরের পর বছর স্বজনদের ছেড়ে থাকতে হয়েছে তাঁকে। ওই সময়ে অন্যত্র একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে পরিবারের ভরণপোষণ চালাতেন তিনি। মাসুম বিল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলাই ইতিমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শিবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তাজুমুজ্জামান তাজুর বিরুদ্ধেও পাঁচটি নাশকতার মামলা হয়েছিল। চাঁদার টাকা না পেলে শওকত-পটল সহোদর বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা সাজাতেন বলে দাবি করেন তিনি। এ কাজে স্থানীয় থানা পুলিশের একটি অংশকে ব্যবহার করা হতো বলেও অভিযোগ তাঁর।
মাসুম বিল্লাহর অভিযোগ, যাঁরা তাঁদের দাবিকৃত টাকা দিতে পারতেন, তাঁরা তুলনামূলক নিরাপদে থাকতেন। আর টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের নাশকতার মামলা দেওয়া হতো। এভাবে দীর্ঘদিন অনেক নেতাকর্মীকে বাড়িছাড়া থাকতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
শিবপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তাজুমুজ্জামান তাজু জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচটি নাশকতার মামলা হয়েছিল। প্রতিটি মামলায় তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন নেওয়ার পর নিম্ন আদালতে হাজির হয়ে জামিনে থাকতেন বলে জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দায়ের করা মামলাগুলো ইতিমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তাজু বলেন, ওই সময় পুলিশের তৎপরতার কারণে তিনি বাড়িতে স্বাভাবিকভাবে রাত কাটাতে পারতেন না। বর্তমানে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্যে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এডিশনাল পিপি) অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান ভুট্টো অভিযোগ করেন, মাহবুবর রহমান পটল ওরফে ইমন ২০২৩ সালে ঘোনা গ্রামের কওসার, শাহাদাত, রাশিকুর, শংকরসহ ছয়জনকে সিঙ্গাপুরে পাঠানোর কথা বলে মোট ১৮ লাখ টাকা নেন।
তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ছয়জনকে সিঙ্গাপুরে পাঠানোর কথা বলে ঢাকায় নিয়ে একটি হোটেলে রাখা হয়। পরে পটল মোবাইল ফোন বন্ধ করে চলে যান। পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগীরা ঢাকার ইমরান নামের এক ব্যক্তির সহযোগিতায় সিঙ্গাপুরে যান। তাঁদের বিদেশযাত্রার ব্যবস্থা করতে অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান ভুট্টোও জমি বিক্রি করে সহযোগিতা করেছিলেন বলে তিনি জানান।
অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান ভুট্টোর দাবি, কিছুদিন পর আত্মগোপনে থাকা পটল জাপানে চলে যান। প্রায় তিন বছর পর জাপান থেকে ফিরে এসে তিনি মাদক ব্যবসায় জড়ান বলে অভিযোগ করেন ভুট্টো। একপর্যায়ে পটলকে আটকানোর সুযোগ পেয়ে তাঁর কাছ থেকে টাকা ফেরত চাইলে ১৮ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ৭৫ হাজার টাকা দিয়ে তিনি সেখান থেকে রেহাই পান বলে দাবি করেন এই আইনজীবী।
তিনি আরও জানান, পরবর্তী সময়ে পটল ফোন করে সাতক্ষীরায় থাকা তাঁর একটি কাপড়ের ব্যাগ পরিবহনের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠানোর অনুরোধ করেন। এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় তিনি ব্যাগটি ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। পরে ওই আত্মীয়ের কাছ থেকে জানতে পারেন, ব্যাগটিতে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ছিল বলে দাবি করেন অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান ভুট্টো।
শওকত ও পটলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তাঁরা।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, প্রত্যাহারের আদেশ এবং অন্যান্য প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে আইনগত সিদ্ধান্ত বা আদালতের চূড়ান্ত রায় সম্পর্কে এই প্রতিবেদনে নিশ্চিত কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
শিবপুরে শওকত-পটলকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর অন্যান্য দিক নিয়ে পরবর্তী প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।