-মো. কামাল উদ্দিন:
আজ ২৯ অক্টোবর ২০২৬। সাংবাদিক ওসমান জাহাঙ্গীরের ৬২তম জন্মদিন। ১৯৬৪ সালের এই দিনে মহেশখালীর সাগরবেষ্টিত দ্বীপভূমিতে তাঁর জন্ম। জীবনের বাষট্টিটি বছর পেরিয়ে তিনি আজ পদার্পণ করছেন ৬৩তম বছরে। জন্মদিনের এই বিশেষ মুহূর্তে তাঁকে ঘিরে ফিরে দেখা যায় সাগর, চর, পাহাড়, সাংবাদিকতা, জীবনসংগ্রাম ও দর্শনের এক দীর্ঘ পথপরিক্রমা।
কিছু মানুষের জীবন কেবল সময়ের স্রোতে ভেসে চলার নাম নয়; তাঁদের জীবন হয়ে ওঠে আদর্শ, সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও সত্যের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের এক জীবন্ত দলিল। সাংবাদিক ওসমান জাহাঙ্গীর তেমনই এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবনকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় সাগরবিধৌত মহেশখালীর দ্বীপভূমি, চট্টগ্রামের পাহাড়ঘেরা জনপদ এবং বাংলাদেশের সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথপরিক্রমার দিকে।
সাগরের বুক থেকে জীবনের বিস্তৃত দিগন্তে
১৯৬৪ সালের ২৯ অক্টোবর মহেশখালীর এক ছোট্ট দ্বীপে তাঁর জন্ম। সাগরের গর্জন, ঢেউয়ের ছন্দ, চরাঞ্চলের জীবনসংগ্রাম আর প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য যেন তাঁর ব্যক্তিত্বের ভেতর নির্মাণ করেছে এক স্বতন্ত্র জীবনবোধ। শৈশবের সেই পরিবেশ থেকে সাংবাদিকতার বিস্তৃত অঙ্গনে তাঁর যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; এটি প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে নিজের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আত্মমর্যাদাকে সমুন্নত রাখার এক দীর্ঘ অধ্যায়।
সাগর মানুষকে শেখায় প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়তে, চর শেখায় পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে, আর পাহাড় শেখায় দৃঢ়তা ও স্থিরতার মূল্য। প্রকৃতির এই তিন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ওসমান জাহাঙ্গীরের জীবনকে রূপক অর্থে মিলিয়ে দেখলে তাঁর পথচলার একটি স্বতন্ত্র প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। জীবনের নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও নিজের চিন্তা ও বিশ্বাসকে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় তাঁর জীবনযাত্রাকে দিয়েছে বিশেষ তাৎপর্য।
প্রতিকূলতার মধ্যেও অবিচল থাকার গল্প
জীবনের পথ কখনো মসৃণ ছিল না। সময়ের নানা বাঁক, বাস্তবতার কঠিন অভিঘাত, ব্যক্তিগত শোক এবং প্রিয়তমা জীবনসঙ্গীর অকালপ্রয়াণ তাঁর জীবনকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তবু বেদনার কাছে আত্মসমর্পণ করে থেমে যাওয়াকে তিনি জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে গ্রহণ করেননি। বরং হারানোর শূন্যতা, অভিজ্ঞতার তিক্ততা এবং সময়ের নির্মমতার মধ্য দিয়ে নিজের চিন্তা ও চেতনাকে আরও গভীর করার চেষ্টা করেছেন।
মানুষের জীবনে কিছু শোক থাকে, যা সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না; বরং নীরবে জীবনের অংশ হয়ে থাকে। সেই বেদনা নিয়েই মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে হয়, দায়িত্ব পালন করতে হয় এবং নতুন করে বাঁচার অর্থ খুঁজতে হয়। ওসমান জাহাঙ্গীরের জীবনও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রকৃত শক্তি কেবল অর্জনে নয়, বরং হারানোর পরও নিজের আদর্শে অবিচল থাকার ক্ষমতায়।
সাংবাদিকতা যখন পেশার চেয়ে বড় অঙ্গীকার
চট্টগ্রামের সাংবাদিকতা ও আলোকচিত্রের জগতে ওসমান জাহাঙ্গীরের পরিচয় বহুমাত্রিক। তিনি শুধু সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের মানুষ নন; দৃশ্যের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে অনুসন্ধান করা, সময়ের সাক্ষ্যকে ছবিতে ধারণ করা এবং সমাজের নানা অসংগতিকে উপলব্ধি করার মধ্যেও তিনি খুঁজে পান নিজের সৃজনশীল অস্তিত্ব।
ক্যামেরার লেন্সে তিনি যেমন সময়কে বন্দি করেন, তেমনি চিন্তার গভীরে অনুসন্ধান করেন সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। একটি ছবি কখনো হাজারো শব্দের চেয়েও গভীর বক্তব্য তুলে ধরতে পারে। আবার একটি সত্যনিষ্ঠ সংবাদ মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে পারে, সমাজের অসংগতি সামনে আনতে পারে এবং দায়িত্বশীল মহলকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে।
তাঁর কাছে সাংবাদিকতা নিছক জীবিকা কিংবা পেশাগত পরিচয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সত্য অনুসন্ধানের দায়িত্ব, জনস্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার এবং ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন তোলার নৈতিক সাহস। কারণ, সাংবাদিকতার প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই, যখন সংবাদ কেবল ঘটনার বিবরণ হয়ে থাকে না, বরং মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে কথা বলে।
একজন সাংবাদিকের হাতে কলম ও ক্যামেরা কেবল কাজের উপকরণ নয়; এগুলো সময়কে বুঝতে, বাস্তবতাকে তুলে ধরতে এবং মানুষের অভিজ্ঞতাকে ইতিহাসের অংশ করে রাখতে সহায়তা করে। এই উপলব্ধি থেকেই সাংবাদিকতার নৈতিকতা, স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি বারবার সামনে আসে।
জীবনদর্শন ও রাষ্ট্রদর্শনে এক চিন্তাশীল দৃষ্টিভঙ্গি
গত বছর তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত হয়েছিল ‘জীবনদর্শন ও রাষ্ট্রদর্শন’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা। জন্মদিনের আনুষ্ঠানিক আনন্দকে চিন্তা ও মননের পরিসরে উন্নীত করার এই আয়োজন ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে তাঁর আলোচনায় উঠে এসেছিল প্লেটো ও এরিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তা, ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থার ধারণা এবং নবীগণের শিক্ষায় প্রতিফলিত ন্যায়, নৈতিকতা ও জবাবদিহির চিরন্তন মূল্যবোধ।
তাঁর রাষ্ট্রভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে ন্যায়, সত্য, নৈতিকতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। তিনি রাষ্ট্রকে কেবল ক্ষমতা প্রয়োগের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেন না; বরং রাষ্ট্রের বৈধতা, শাসনের নৈতিক ভিত্তি এবং মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নকে গুরুত্ব দেন। তাঁর চিন্তার ধর্মীয় ভিত্তিও রয়েছে। সেই বিশ্বাসের আলোকে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় সত্য, ন্যায় ও নৈতিক দায়িত্ববোধের অপরিহার্যতার কথা তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রদর্শনের এই আলোচনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র কার জন্য, আর শাসনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যই বা কী? ক্ষমতা কি কেবল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উপায়, নাকি মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব? ন্যায়বিচার, সততা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণ যদি রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে উন্নয়নের বাহ্যিক চাকচিক্যও মানুষের প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে না।
ওসমান জাহাঙ্গীরের জীবনদর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনায় এ ধরনের প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য কেবল অবকাঠামো, প্রশাসনিক কাঠামো কিংবা ক্ষমতার বিস্তারে পরিমাপ করা যায় না। রাষ্ট্র কতটা মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারছে, কতটা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারছে এবং কতটা নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করতে পারছে, তার মধ্যেই রাষ্ট্রের মানবিক সার্থকতা নিহিত।
কলম, ক্যামেরা ও বিবেকের শক্তি
ছবির কারিগর, চিন্তার অনুসন্ধানী এবং কলমের একনিষ্ঠ সাধক হিসেবে তাঁর জীবন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি তুলে ধরে—প্রযুক্তি দৃশ্যকে ধারণ করতে পারে, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিই দৃশ্যের অর্থ নির্মাণ করে। ক্যামেরা কোনো মুহূর্তকে সংরক্ষণ করে, আর বিবেক সেই মুহূর্তের তাৎপর্য অনুধাবন করতে শেখায়।
একইভাবে, কলমের শক্তি কেবল শব্দের বিন্যাসে নয়; তার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে সত্য উচ্চারণের সাহস, যুক্তির দৃঢ়তা এবং মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলার ক্ষমতায়। অস্ত্র দিয়ে ভয় সৃষ্টি করা যায়, কিন্তু যুক্তি ও সত্য দিয়ে মানুষের চিন্তার জগতে পরিবর্তনের সূচনা করা সম্ভব। এ কারণেই সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সমাজের বিবেক হিসেবে বিবেচিত হয়।
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে তথ্যের প্রবাহ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিভ্রান্তি, অপতথ্য ও অসত্যের ঝুঁকি। এই বাস্তবতায় সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তি নতুন করে স্মরণ করা জরুরি। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব কেবল তথ্য পৌঁছে দেওয়া নয়; তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরা এবং ব্যক্তিগত পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে থেকে জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়াও তাঁর পেশাগত দায়িত্বের অংশ।
এই প্রেক্ষাপটে ওসমান জাহাঙ্গীরের জীবন ও চিন্তার মূল্যায়ন প্রাসঙ্গিক। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত সাফল্য কেবল কত সংবাদ প্রকাশিত হলো, কত ছবি ধারণ করা হলো কিংবা কত মানুষের কাছে তাঁর পরিচিতি পৌঁছাল, তার ওপর নির্ভর করে না। তাঁর সাফল্যের গভীরতর মাপকাঠি হলো—তিনি কতটা সত্যনিষ্ঠ থাকতে পেরেছেন, কতটা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং সময়ের কাছে কতটা দায়বদ্ধ থেকেছেন।
বাষট্টি বছরের প্রাপ্তি, অভিজ্ঞতা ও আগামী দিনের প্রত্যাশা
জীবনের বাষট্টিটি বছর একজন মানুষের সামনে খুলে দেয় অসংখ্য স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও আত্মসমীক্ষার দরজা। পেছনে ফিরে তাকালে যেমন দেখা যায় পথচলার অর্জন, তেমনি চোখে পড়ে অপূর্ণতা, হারানো সময় এবং অনিবার্য কিছু বেদনা। কিন্তু জীবনের সৌন্দর্য এখানেই যে, প্রতিটি নতুন দিন মানুষকে আবারও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়।
আজকের এই জন্মদিনে ওসমান জাহাঙ্গীরের প্রতি প্রত্যাশা, তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হোক, চিন্তার পরিসর আরও বিস্তৃত হোক এবং তাঁর সৃজনশীলতা নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক, আলোকচিত্রী ও চিন্তাশীল মানুষদের অনুপ্রাণিত করুক। তাঁর অর্জিত অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও জীবনবোধ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠুক—এটাই হোক জন্মদিনের অন্যতম প্রত্যাশা।
জন্মদিন কেবল কেক কাটা, শুভেচ্ছা বিনিময় কিংবা বয়সের হিসাব মেলানোর উপলক্ষ নয়। এটি আত্মসমীক্ষার দিন, অতীতের অর্জন ও সীমাবদ্ধতাকে মূল্যায়নের দিন এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন অঙ্গীকার গ্রহণের দিন। জীবনের প্রতিটি অতিবাহিত বছর মানুষের অভিজ্ঞতার ভান্ডারে নতুন কিছু যোগ করে। আর সেই অভিজ্ঞতা যখন মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তখন ব্যক্তিজীবন অতিক্রম করে বৃহত্তর সমাজের সম্পদে পরিণত হয়।
আলোকযাত্রা অব্যাহত থাকুক
সাগরের ঢেউ থেমে থাকে না, চর বদলায়, পাহাড়ের গায়ে সময়ের ছাপ পড়ে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যেও কিছু মূল্যবোধ স্থায়ী হয়ে থাকে—সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা, ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা। ওসমান জাহাঙ্গীরের বাষট্টি বছরের জীবনযাত্রা সেই মূল্যবোধগুলোকে নতুন করে স্মরণ করার একটি উপলক্ষ।
জীবন কখনো সরলরেখায় এগোয় না। কখনো আসে প্রাপ্তির আনন্দ, কখনো হারানোর বেদনা; কখনো সামনে খুলে যায় সম্ভাবনার নতুন দরজা, আবার কখনো বাস্তবতার কঠিন দেয়াল মানুষকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। কিন্তু যাঁরা নিজের বিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও বিবেককে সঙ্গী করে পথ চলেন, তাঁদের কাছে প্রতিটি অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠতে পারে নতুন উপলব্ধির উৎস।
আজ ২৯ অক্টোবর ২০২৬, সাংবাদিক ওসমান জাহাঙ্গীরের ৬২তম জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে তাঁর প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা ও শুভকামনা।
আপনার আগামী দিনগুলো হোক সুস্থতা, প্রশান্তি, সৃজনশীলতা ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ। আপনার ক্যামেরায় ধরা পড়ুক সময়ের অনুচ্চারিত সত্য, আপনার কলমে উচ্চারিত হোক মানুষের ন্যায্য অধিকারের কথা, আর আপনার জীবন হয়ে উঠুক আগামী দিনের জন্য আরও অর্থবহ ও প্রেরণাদায়ী।
শুভ ৬২তম জন্মদিন, সাংবাদিক ওসমান জাহাঙ্গীর।
সাগর, চর ও পাহাড় পেরিয়ে আপনার এই আলোকযাত্রা অব্যাহত থাকুক—সত্যের অনুসন্ধানে, বিবেকের নির্দেশনায়, ন্যায়ের প্রত্যয়ে এবং মানুষের কল্যাণের পথে।