বিদেশ থেকে দেশে ফিরে মাসিক ৫০ হাজার টাকা বেতনে অপরাধ পরিচালনার অভিযোগ, কারাবন্দি ডেভিড ইমনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে চাঁদাবাজির দায়িত্ব পালনের তথ্য; নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ডিবির বিশেষ অভিযান
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামে আলোচিত বড় সাজ্জাদ ও তার সহযোগীদের চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে। এবার চট্টগ্রামের বাইরে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মো. সাব্বির হোসেন সানি (৩৪)। চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) বিশেষ অভিযানে গত ৩০ অক্টোবর ২০২৬ রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পুলিশের দাবি, সানি শুধু বড় সাজ্জাদের একজন সহযোগীই নন, বরং তার নির্দেশনায় চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্বও পালন করতেন। বিশেষ করে কারাগারে থাকা ডেভিড ইমনের পরিবর্তে চাঁদাবাজি কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
গোয়েন্দা নজরদারিতে অবস্থান শনাক্ত, সিদ্ধিরগঞ্জে বিশেষ অভিযান
জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সানির অবস্থান শনাক্ত করতে দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান, তথ্য সংগ্রহ ও নিবিড় নজরদারি চালানো হয়। একপর্যায়ে তার অবস্থান নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় নিশ্চিত হওয়ার পর সেখানে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল।
৩০ অক্টোবর রাতে পরিচালিত এ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্য জেলায় অবস্থান করেও শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দা নজরদারি এড়াতে পারেননি তিনি। গ্রেপ্তার সানি মো. মালেকের ছেলে। তার স্থায়ী ঠিকানা সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ থানার সাতবসু এলাকায়। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ থানাধীন হামজারবাগ এলাকায় বসবাস করতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
বিদেশে অবস্থান, বড় সাজ্জাদের নির্দেশে দেশে প্রত্যাবর্তন
প্রাথমিক অনুসন্ধানে পুলিশ জানতে পেরেছে, সানি আগে বিদেশে অবস্থান করতেন। বড় সাজ্জাদের নির্দেশনায় গত বছর তিনি বাংলাদেশে ফিরে চট্টগ্রামে আসেন। দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি বড় সাজ্জাদ ও বোরহানের হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে জেলা পুলিশের দাবি। পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মারামারি এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠে এসেছে। বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে তিনি চক্রটির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রাখতেন বলেও জানানো হয়েছে।
মাসিক ৫০ হাজার টাকা বেতন, ডেভিড ইমনের পরিবর্তে দায়িত্ব
এই ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, বড় সাজ্জাদের কাছ থেকে সানি মাসিক ৫০ হাজার টাকা বেতন পেতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। জেলা পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকা ডেভিড ইমনের পরিবর্তে চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব সানির ওপর অর্পণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, বড় সাজ্জাদ ও তার সহযোগীদের নির্দেশনায় অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
এ তথ্যের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে আলোচিত অপরাধী চক্রটির কথিত সাংগঠনিক কাঠামো, দায়িত্ব বণ্টন এবং অর্থের বিনিময়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। তবে এই বেতন ও দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে আরও যাচাই করা প্রয়োজন।
চাঁদা না দিলে বাসা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলার অভিযোগ
জেলা পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে চক্রটির চাঁদাবাজির একটি ভয়ংকর কৌশলের তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশ জানায়, চক্রটির সদস্যরা নিজেদের প্রভাব ও ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের চেষ্টা করতেন। নির্ধারিত অর্থ দিতে কেউ অস্বীকৃতি জানালে কিংবা চাঁদার টাকা আদায় করতে ব্যর্থ হলে সানির নির্দেশে স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাসা অথবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হতো বলে পুলিশ জানিয়েছে।
চাঁদা দাবি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অডিও রেকর্ড ডিবির হাতে
সানির বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ ও হাটহাজারী থানায় পৃথক দুটি মামলা চলমান রয়েছে। এর বাইরে সম্প্রতি চাঁদা দাবি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের একটি ঘটনার অডিও রেকর্ড জেলা গোয়েন্দা শাখার হাতে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাপ্ত অডিও রেকর্ডসহ অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অডিওতে কারা কথা বলেছেন, চাঁদা দাবির সঙ্গে কারা জড়িত এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের আওতায় রয়েছে।
একই সঙ্গে সানির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগীদের পরিচয়, অর্থ আদায়ের পদ্ধতি, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশদাতা এবং এই চক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক শনাক্তে বিস্তারিত তদন্ত চলছে।
চট্টগ্রামের বাইরে আত্মগোপন, তবুও গোয়েন্দা নজরদারির বাইরে নয়
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বড় সাজ্জাদ ও ডেভিড ইমনের নির্দেশনায় চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত অপরাধী চক্রের সদস্যরা জেলা পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান ও গ্রেপ্তার তৎপরতার মুখে অন্য জেলায় আত্মগোপন করছে। কিন্তু অবস্থান পরিবর্তন করে অন্য জেলায় চলে গেলেও তাদের শনাক্ত করার জন্য জেলা গোয়েন্দা শাখার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে সানির গ্রেপ্তার তারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তদন্তের পরিধিতে আরও কারা?
সানির গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে বড় সাজ্জাদ ও ডেভিড ইমনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত কথিত অপরাধী নেটওয়ার্কের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। বিশেষ করে মাসিক বেতনের বিনিময়ে দায়িত্ব পালন, কারাবন্দি সহযোগীর পরিবর্তে নতুন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া, স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে অর্থ আদায় এবং চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সশস্ত্র হামলার অভিযোগগুলো তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখন তদন্তে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। সানির মাধ্যমে কারা চাঁদাবাজির অর্থ সংগ্রহ করতেন? তার স্থানীয় সহযোগীরা কারা? চট্টগ্রামের কোন কোন এলাকায় এই চক্রের কার্যক্রম বিস্তৃত ছিল? বড় সাজ্জাদ ও বোরহানের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও নির্দেশনা আদান-প্রদানের মাধ্যম কী ছিল? কারাবন্দি ডেভিড ইমনের পরিবর্তে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি কতটা বিস্তৃত অপরাধী নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত বহন করে? এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগীদের শনাক্ত করা এবং অপরাধের নির্দেশদাতা থেকে অর্থ সংগ্রহকারী পর্যন্ত পুরো নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে সানির গ্রেপ্তারের পর তদন্তে নতুন কী তথ্য উঠে আসে, তার ওপর নির্ভর করছে এই অপরাধী চক্রের আরও সদস্যকে আইনের আওতায় আনার পরবর্তী অগ্রগতি।