
চারটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক, ‘লাভ বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা—এক সংগ্রামী সাংবাদিকের জীবন, দর্শন ও মানবিক দায়বদ্ধতার অনন্য উপাখ্যান
-মো. কামাল উদ্দিন
পৃথিবীর ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের পরিচয় কোনো পদ-পদবি, ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁদের জীবন হয়ে ওঠে একটি দর্শন, তাঁদের কর্ম হয়ে ওঠে একটি সময়ের দলিল, আর তাঁদের সংগ্রাম পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যায় সাহস ও অনুপ্রেরণার উত্তরাধিকার। তাঁরা জানেন, সত্যের পথ কখনো মসৃণ হয় না। এই পথে রয়েছে বাধা, প্রতিকূলতা, হুমকি, অপপ্রচার, ষড়যন্ত্র এবং কখনো কখনো নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ অন্ধকার। তবু তাঁরা থেমে যান না। কারণ তাঁদের কাছে সত্য কোনো আপসের বিষয় নয়, সত্যই তাঁদের শক্তি, সত্যই তাঁদের আত্মপরিচয়।
সাংবাদিকতা এমনই একটি পেশা, যেখানে কলমের সামান্য একটি আঁচড় ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে, একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সমাজের অন্ধকার উন্মোচন করতে পারে, আর একটি সাহসী উচ্চারণ নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারে। প্রকৃত সাংবাদিক কখনো কেবল ঘটনার বিবরণ দেন না; তিনি ঘটনার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সত্য অনুসন্ধান করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন এবং জনস্বার্থের পক্ষে বিবেকের দায়িত্ব পালন করেন।
বিশ্ব সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন সাহসী ব্যক্তিত্বের দৃষ্টান্ত কম নয়। ফিলিপাইনের মারিয়া রেসা (Maria Ressa) ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। নানা আইনি জটিলতা ও চাপের মুখেও তিনি সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। ২০২১ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন। ক্যামেরুনের পিউস এনজাওয়ে, বেলারুশের স্বেতলানা কালিনকিনা এবং পাকিস্তানের আহফাজ-উর-রহমানের মতো সাংবাদিকেরাও নিজ নিজ দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের প্রশ্নে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন।
তাঁদের জীবন আমাদের শেখায়, সাংবাদিকতার প্রকৃত মর্যাদা অর্থ, ক্ষমতা কিংবা প্রভাবের মধ্যে নয়; বরং সত্য প্রকাশের সাহস, নৈতিক দৃঢ়তা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্যে নিহিত।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনেও এমন একজন ব্যতিক্রমী ও প্রতিবাদী ব্যক্তিত্বের নাম মিজানুর রহমান চৌধুরী। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি সংবাদপত্র প্রকাশনা, সম্পাদকীয় দায়িত্ব, সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অবস্থানের মধ্য দিয়ে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছেন। তাঁর সাংবাদিকতা কেবল পেশাগত কর্মকাণ্ড নয়; বরং এটি তাঁর চিন্তা, বিশ্বাস, আদর্শ ও জীবনদর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
চারটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক: এক ব্যক্তিত্বে বহুমাত্রিক সাংবাদিকতার পরিচয়
মিজানুর রহমান চৌধুরী চারটি সংবাদপত্রের সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পত্রিকাগুলো হলো—
1. দৈনিক আমাদের বাংলা। ২. দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম। ৩. দৈনিক সৈনিক। ৪. দি ডেইলি টুরিস্ট (The Daily Tourist)।
চারটি সংবাদপত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা শুধু প্রকাশনা পরিচালনার পরিচয় বহন করে না; বরং সংবাদমাধ্যমের জগতে তাঁর দীর্ঘদিনের শ্রম, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং সংবাদপত্র পরিচালনার প্রতি গভীর আগ্রহেরও পরিচায়ক। একটি সংবাদপত্র পরিচালনা করাই যেখানে কঠিন দায়িত্ব, সেখানে একাধিক সংবাদপত্রের সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন নিঃসন্দেহে একটি বড় কর্মপরিসরের পরিচয় বহন করে।
একজন সম্পাদককে প্রতিদিন অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোন সংবাদ প্রকাশিত হবে, কোন বিষয়টি জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ, কোন অনিয়মের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান প্রয়োজন, কোথায় মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয় দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। সম্পাদকীয় দায়িত্ব কেবল সংবাদ নির্বাচন নয়; এটি একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক অবস্থান নির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
মিজানুর রহমান চৌধুরীর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে এই সম্পাদকীয় দায়িত্ব ও প্রকাশনা কার্যক্রম তাঁর পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সাংবাদিকতা তাঁর কাছে পেশা নয়, বিবেকের দায়
মিজানুর রহমান চৌধুরীর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর প্রতিবাদী মনোভাব। তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রভাবশালী মহল কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার কাছে নিজের অবস্থান বিসর্জন দিতে চাননি। তাঁর বক্তব্য ও লেখালেখিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন এবং মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলার প্রবণতা বরাবরই লক্ষণীয়।
তিনি মনে করেন, সাংবাদিকতার প্রধান দায়িত্ব ক্ষমতাবানদের সন্তুষ্ট করা নয়; বরং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জনস্বার্থের প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে আসা। সাংবাদিকের কলম যদি ভয় কিংবা লোভের কাছে বন্দি হয়ে পড়ে, তাহলে সংবাদমাধ্যম তার মূল দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়, আবার কারও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যমও নয়। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো তথ্যের সত্যতা, বস্তুনিষ্ঠতা, পেশাগত সততা ও জনস্বার্থ। এই নৈতিক ভিত্তিকে ধারণ করেই একজন সাংবাদিক মানুষের আস্থা অর্জন করেন।
মিজানুর রহমান চৌধুরীর সাংবাদিকতা ও প্রতিবাদী অবস্থান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, চিন্তাভাবনা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের বিশ্বাস ধরে রাখার মানসিকতার কথা বিশেষভাবে বলতে হয়।
‘লাভ বাংলাদেশ’: সাংবাদিকতার বাইরে মানুষের জন্য আরেকটি পরিচয়
মিজানুর রহমান চৌধুরীর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো ‘লাভ বাংলাদেশ’ নামের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর ভূমিকা। সাংবাদিকতার বাইরেও সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার একটি বৃহত্তর চিন্তা তাঁর মধ্যে রয়েছে—এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তার প্রকাশ ঘটেছে।
একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় শুধু তাঁর পেশাগত অর্জনে নয়, মানুষের প্রতি তাঁর আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডেও প্রতিফলিত হয়। সংবাদপত্রের পাতায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাস্তব জীবনে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও সমান তাৎপর্যপূর্ণ।
মিজানুর রহমান চৌধুরীর জীবনদর্শনের সঙ্গে এই মানবিক চিন্তার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর দীর্ঘ পথচলায় ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তাঁর পরিচিতজনদের কাছে বিশেষভাবে আলোচিত।
প্রায় তিন দশকের পরিচয়ে যাঁকে দেখেছি কাছ থেকে
আমি মিজানুর রহমান চৌধুরীকে আজ থেকে প্রায় তিন দশক ধরে চিনি। দীর্ঘ সময়ের এই পরিচয় আমাকে তাঁর চিন্তা, ব্যক্তিত্ব, সাহসী উচ্চারণ এবং সাংবাদিকতার প্রতি নিষ্ঠা পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিয়েছে।
সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, সাংবাদিকতার ধরন বদলেছে, প্রযুক্তির বিপ্লবে সংবাদমাধ্যমের জগৎও আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষের চিন্তা ও আদর্শের মূল জায়গাটি সহজে বদলায় না। মিজানুর রহমান চৌধুরীকে আমি সেই ধরনের একজন মানুষ হিসেবেই দেখেছি।
তাঁর মধ্যে রয়েছে নিজের বিশ্বাস প্রকাশের দৃঢ়তা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার মানসিকতা এবং মানুষের প্রতি এক ধরনের আন্তরিক দায়বদ্ধতা। তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়ের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের অবস্থান ধরে রাখার প্রবণতা তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
আমি তাঁকে শুধু একজন সম্পাদক হিসেবে মূল্যায়ন করি না; বরং একজন সংগ্রামী সাংবাদিক, সংগঠক এবং প্রতিবাদী চিন্তার মানুষ হিসেবে দেখি।
আজকের সাংবাদিকতা ও মিজানুর রহমান চৌধুরীর প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার সংবাদ পরিবেশনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে ভুয়া তথ্য, অপতথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা, ব্যক্তিস্বার্থ এবং সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের প্রবণতাও বেড়েছে।
কোথাও সংবাদকে ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে জিম্মি করা হচ্ছে, কোথাও ক্ষমতাবানদের তোষামোদকে সাংবাদিকতা বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধকে সংবাদ পরিবেশনের আড়ালে প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা দেখা যায়।
এমন বাস্তবতায় প্রকৃত সাংবাদিকদের দায়িত্ব অনেক বেশি। সাংবাদিকতার পরিচয় কেবল একটি পরিচয়পত্র কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন তথ্য যাচাই, পেশাগত প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা।
মিজানুর রহমান চৌধুরী এই বাস্তবতায় প্রতিবাদী সাংবাদিকতার একজন আলোচিত প্রতিনিধি। তাঁর লেখনী ও বক্তব্যে সাংবাদিকতার নামে অনিয়ম, স্বার্থান্বেষী তৎপরতা এবং প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর রয়েছে। আমি মনে করি, তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও কর্মজীবনের ইতিবাচক দিকগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা উচিত।
তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন
একজন সাংবাদিকের জীবন শুধু সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত প্রতিবেদন দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তাঁর সময়, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট, সম্পাদকীয় অবস্থান, পেশাগত চ্যালেঞ্জ, সাংগঠনিক ভূমিকা এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়েই তাঁর কর্মজীবনের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব।
মিজানুর রহমান চৌধুরীর সাংবাদিকতা জীবনের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে চারটি সংবাদপত্রের সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব, ‘লাভ বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা, প্রতিবাদী সাংবাদিকতার দর্শন এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি তথ্যনির্ভর জীবনী কিংবা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা যেতে পারে।
তাঁর কর্মজীবনের দলিল, প্রকাশিত প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, সাক্ষাৎকার এবং সমসাময়িক ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাংবাদিক ও গবেষকদের জন্য তা মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
যে মানুষটি অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আজ তাঁর পাশে দাঁড়ানোর সময়
লেখাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও হৃদয়স্পর্শী অধ্যায়টি হলো তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, মিজানুর রহমান চৌধুরী বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ। তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন। তাঁকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। চিকিৎসার ব্যয় বহনের মতো পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সঞ্চয় তাঁর নেই বলে জানা যায়।
যে মানুষটি দীর্ঘদিন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায়, দরিদ্র, দুঃখী ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আজ তাঁর নিজের জীবন রক্ষার জন্য অন্যের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়েছে। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি নিজের স্বার্থের চেয়ে মানুষের কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়েছেন—আজ সেই মানুষটির চিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তবান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং মানবিক সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
এখানে একটি গভীর মানবিক প্রশ্ন সামনে আসে—যে মানুষটি সারাজীবন মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন, তাঁর নিজের জীবন ও চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা কতটা দায়িত্বশীল?
আমি মনে করি, তাঁর চিকিৎসা কেবল পরিবারের ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সাংবাদিক সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব, মানবিক সমাজের নৈতিক দায় এবং রাষ্ট্রের বিবেচনার বিষয়।
রাষ্ট্রের প্রতি জরুরি আবেদন
বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর এবং দেশের গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমার আন্তরিক আবেদন—মিজানুর রহমান চৌধুরীর চিকিৎসার বিষয়টি মানবিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করুন।
তাঁর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ এবং সার্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।
একই সঙ্গে দেশের সাংবাদিক সংগঠন, সংবাদপত্রের সম্পাদক ও প্রকাশক, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিও আহ্বান জানাই—আপনারা যার যার অবস্থান থেকে তাঁর পাশে দাঁড়ান।
প্রয়োজনে একটি স্বচ্ছ চিকিৎসা সহায়তা তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যাতে দেশ-বিদেশের মানুষ সরাসরি তাঁর চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে পারেন। চিকিৎসার ব্যয় ও অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা হলে মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।
একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর চেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব আর কী হতে পারে?
শেষ কথা: একজন সাংবাদিকের জন্য সবচেয়ে বড় সম্মান তাঁর দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো
মিজানুর রহমান চৌধুরীকে নিয়ে আমার এই লেখা কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশংসাবাণী নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিচয়, অভিজ্ঞতা, শ্রদ্ধা এবং একজন অসুস্থ মানুষের জীবন রক্ষার মানবিক আবেদন।
আমি বিশ্বাস করি, মানুষের জীবনের মূল্য তাঁর সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একজন মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় তাঁর কর্ম, চিন্তা, মানবিকতা এবং সমাজের প্রতি অবদানের মধ্য দিয়ে।
মিজানুর রহমান চৌধুরীর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন, চারটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ‘লাভ বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মপরিচয়ের যে বিস্তার ঘটেছে, তা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাঁর জীবন ও কর্মের ইতিবাচক দিকগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে নতুন প্রজন্মের শেখার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
আজ তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন চিকিৎসা, ভালোবাসা এবং মানুষের সহযোগিতা। সুস্থ হয়ে তিনি আবার মানুষের মাঝে ফিরে আসুন, আবার কথা বলুন, আবার লিখুন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
যে কলম সারাজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেছে, সেই কলমের মানুষটি যেন অর্থের অভাবে চিকিৎসাবঞ্চিত না হন। যে কণ্ঠ সারাজীবন মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলেছে, সেই কণ্ঠ যেন অসহায়তার নীরবতায় হারিয়ে না যায়।
মিজানুর রহমান চৌধুরীর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।
সত্যের পক্ষে যিনি সারাজীবন লড়েছেন, আজ তাঁর জীবনের পক্ষে দাঁড়ানোর দায়িত্ব আমাদের সবার।
রাষ্ট্র এগিয়ে আসুক, সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হোক, মানবিক মানুষগুলো পাশে দাঁড়াক। একজন সংগ্রামী সাংবাদিকের জীবন রক্ষায় আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগই হোক আজকের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
— মো. কামাল উদ্দিন
লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক

