
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানায় হামলা-ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধের ঘটনায় উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের প্রভাবে বন্ধ রয়েছে শত শত কারখানা। ব্যাহত হচ্ছে পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন। ফলে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছানো নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল বুধবার মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় আগামী ডিসেম্বর থেকে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি কার্যকরের বিষয়ে শ্রমিক প্রতিনিধিদের দাবির সঙ্গে একমত হয়েছে মালিকপক্ষ। তবে মজুরি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, সাভারের হেমায়েতপুর ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে শ্রমিকদের কাজে ফেরানো সম্ভব না হলে ক্ষতির পরিধি আরও বাড়বে। এর প্রভাব শুধু পোশাক কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে দেশের ৪৬৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল। এর মধ্যে গাজীপুরে ১৯৯টি, আশুলিয়ায় ১৯১টি, মিরপুরে ৫৯টি এবং নারায়ণগঞ্জে ২০টি কারখানা রয়েছে।
শুধু পোশাক শিল্প নয়, চলমান অস্থিরতায় অন্যান্য শিল্প খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিজিএমইএর সহসভাপতি ও এমিটি ডিজাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, শ্রমিক বিক্ষোভের সময় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে অনেক কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। আন্দোলনের প্রভাবে পোশাক খাতে উৎপাদন ২৫ শতাংশের বেশি কমেছে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রপ্তানির ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাতে প্রতি মাসে গড়ে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। সে হিসাবে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি রপ্তানি আয় ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এভাবে অস্থিরতা চলতে থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা কমে যেতে পারে। ক্রেতারা বিকল্প উৎপাদনকারী দেশে ক্রয়াদেশ সরিয়ে নিলে বাংলাদেশের রপ্তানি আদেশ কমার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বৈশ্বিক নানা সংকটের কারণে দেশের শিল্প খাত আগে থেকেই চাপে রয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে বাংলাদেশ এমনিতেই সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।
তিনি বলেন, মজুরি বোর্ড নিয়ম অনুযায়ী কাজ করছে এবং মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে হামলা, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলার কারণ স্পষ্ট নয়। এর পেছনে তৃতীয় কোনো পক্ষের ইন্ধন থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। অতীতেও রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণে শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি দেশের সম্পদ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে পোশাক শিল্পের বাইরেও বিভিন্ন খাতে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. ফজলুল হক। তিনি বলেন, সম্প্রতি দুটি চামড়া কারখানাসহ আরও কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্য জাহাজীকরণের সময়সূচি থাকে, কিন্তু চলমান পরিস্থিতিতে তা ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি ক্রেতারা নিয়মিত কারখানা পরিদর্শনে আসেন। বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তারাও কারখানা পরিদর্শনে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ অবস্থা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার দাবি করলেও সার্বিক পরিস্থিতিতে তাদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি আরও বলেন, দেশের শীর্ষ রপ্তানি খাতে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর প্রভাব শুধু কারখানার আর্থিক ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, রপ্তানি আয় ও বিদেশি ক্রেতাদের আস্থার ওপরও পড়বে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত পরিস্থিতির উত্তরণ প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে আরও বিস্তৃত হতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, শ্রমিক বিক্ষোভ দীর্ঘায়িত হলে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত বা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। এতে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে শ্রমিকরা কর্মদিবস ও আয় হারাবেন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, সহিংসতার কারণে কারখানা, যানবাহন ও মানুষের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এর নেতিবাচক প্রভাব কর্মসংস্থানেও পড়তে পারে। তাই সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সংযম, শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়মিত সংলাপ ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

